মালিকানা হারানো চট্টগ্রাম বাধা ডিঙিয়ে বিপিএলের সাফল্যের সোপানে
- ফাইনালে চলে এলেন। পুরো সফরটা কেমন গেল?
- শেখ মাহেদী: আলহামদুলিল্লাহ ভালো, সবকিছুই ঠিকঠাক আছে।
চট্টগ্রাম রয়্যালসের অধিনায়ক শেখ মাহেদীর এক লাইনের উত্তর আসলে তাদের বিপিএলের সফরের পুরো চিত্রকে ফুটিয়ে তুলতে যথেষ্ট নয়। বিপিএলের দ্বাদশ আসর শুরুর ২৪ ঘণ্টা আগে চট্টগ্রাম ফ্রাঞ্চাইজির সঙ্গে যা ঘটেছে তা কল্পনাকেও হার মানাবে।
হুট করেই দলের মালিকানা ছেড়ে দেওয়া, কোচ ও ম্যানেজমেন্টের ঠিক-ঠিকানা না থাকা, বিদেশি খেলোয়াড় চূড়ান্ত না করা, লজিস্টিক কোনো সুযোগ-সুবিধা না থাকা এবং সর্বশেষ, খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক নিয়ে অনিশ্চয়তায় চট্টগ্রামের বিপিএলে মাঠে নামাই ছিল তীব্র ঝুঁকির মধ্যে। অথচ সেই দলটাই প্রথম দল হিসেবে বিপিএলের ফাইনালের মঞ্চে। বিসিবি দলটির দায়িত্ব নেওয়ার পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
রাউন্ড রবিন লিগে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর প্রথম কোয়ালিফায়ারে টুর্নামেন্টের সেরা দল রাজশাহীকে হারিয়ে ফাইনাল নিশ্চিত করেছে শেখ মাহেদী, নাঈম শেখ ও শরিফুল ইসলামদের চট্টগ্রাম। যেখানে পৌঁছতে তাদেরকে কঠিন পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। অবিশ্বাস্য বাধা ডিঙিয়ে মাঠের ২২ গজে নিজেদের প্রমাণ করতে হয়েছে।
কেমন ছিল সেসব অভিজ্ঞাতা? কিভাবে পারলেন প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করার? চট্টগ্রামকে ফাইনালে উঠানোর নায়ক মাহেদী আরেক প্রশ্নের উত্তরে কথার ঝাঁপি খুলে দেন,
‘‘অবিশ্বাস্য না (ফাইনালে উঠা) । যুদ্ধক্ষেত্রে আপনি যখন নামবেন, আপনার যেইগুলা জিনিস আছে, আপনি সেগুলা দিয়েই তো উজার করে লড়বেন। দলগতভাবে আমরা যেভাবে খেলেছি, আমাদের হয়তোবা কোনো বড় নাম নেই। ভালো বিদেশিও নেই। স্থানীয় ক্রিকেটারদের মধ্যেও তেমন বড় নাম নেই। কিন্তু আমাদের ছেলেরা সবাই যেভাবে পারফর্ম করেছে, একটা দল না হয়ে খেললে এই ফল আসলে আসতো না।’’
বিসিবি চট্টগ্রাম ফ্রাঞ্চাইজির দায়িত্ব নেওয়ায় দুইটি দিক সামনে আসে।
এক, পারিশ্রমিক জটিলতা কেটে যাওয়া।
দুই, কমিটি টিমের খেতাব পাওয়া।
মাহেদী ফাইনালে উঠার রাতে এসব নিয়েও কথা বলেছেন, ‘‘অবশ্যই (বিসিবি দায়িত্ব নেওয়ায় চাপ কমে গিয়েছিল কিনা) । আর্থিক চাপ তো অবশ্যই থাকে। বিসিবি দায়িত্ব নেওয়ার পরে আসলে সবাই একটু স্বাধীনভাবে খেলতে পেরেছে। কারো ভেতর কোনো চিন্তা ছিল না। এজন্য খেলোয়াড়রা আরও বেশি পারফর্ম করেছে।’’
‘‘এটা (কমিটি টিমের খেতাব) খারাপ লাগে না। যেহেতু আমরা ফাইনালে উঠছি, কমিটি টিম হিসেবে সেটা প্রমাণ করে দিয়েছি।’’
বিসিবি দলটির দায়িত্ব গ্রহণের পর টিম ডিরেক্টর ও মেন্টর হিসেবে হাবিবুল বাশার সুমনকে নিয়োগ দেয়। প্রধান কোচ করা হয় মিজানুর রহমান বাবুলকে। ম্যানেজারের দায়িত্ব পান নাফিস ইকবাল। দলটির জাতীয় দলের ক্রিকেটার শরিফুল, মাহেদী, নাঈম শেখরা নিজেদের পছন্দ বিসিবিকে জানালে তারাও তা মেনে নেয়।
যাদের হাত ধরে এতোদূর আসা, শিরোপা থেকে চট্টগ্রাম এক পা দূরে… সেই ম্যানেজমেন্টদেরও কৃতিত্ব দিলেন মাহেদী, ‘‘যখনই কোচিং স্টাফগুলা এসেছে, আমাদের খেলোয়াড়রা সবাই আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠে। কারণ আমাদের সবার সিদ্ধান্তে এই কোচিং স্টাফগুলা এসেছিলেন। মিজানুর রহমান বাবুল স্যার তিনটা ফাইনালে ছিলেন। এটা তার জন্য বিশাল অর্জন। আমি তো বলবো আমরা অনেক লাকি যে ওনার মতো কোচ আমরা পেয়েছি। ম্যানেজার নাফিস ইকবাল ভাই আউটস্ট্যান্ডিং অ্যাফোর্ট দিয়েছে। হাবিবুল বাশার ভাইয়ের সিদ্ধান্তগুলো ভালো ছিল। অল্প সময়ের ভিতরে যে বিদেশিগুলো সংগ্রহ করছে, তাকেও ক্রেডিট দিতে হয়। আমার মনে হয় আমরা কোচিং স্টাফ, খেলোয়াড় সবাই মিলে খেলেছি। না হলে হয়তোবা আমরা ফাইনালে উঠতে পারতাম না।’’
সঙ্গে খেলোয়াড়দের দৃঢ়চেতা মনোবল, জয়ের তীব্র ক্ষুধা ও পারফর্ম করার জেদ দলকে এতোদূর নিয়ে এসেছে বলে মনে করেন মাহেদী, ‘‘আমাদের কঠিন পরিস্থিতি ছিল আসলে। আমরা খেলোয়াড়রা অনেক অনুপ্রাণিত ছিলাম আসলে। খেলোয়াড়রা শক্ত ছিল। এজন্য তাদেরকেই ক্রেডিট দিতে হবে। মানসিকভাবে শক্ত না হলে আপনি মাঠে নেমে পারফর্ম করতে পারতেন না।’’
শিরোপা থেকে মাহেদী ও চট্টগ্রাম এক পা দূরে। বিপিএলে এর আগে চট্টগ্রাম কখনো শিরোপা জেতেনি। গত আসরেও চট্টগ্রামের একটি ফ্রাঞ্চাইজি ফাইনাল খেলেছিল। শিরোপার দেখা পায়নি। মাহেদী, শরিফুলদের হাত ধরে ১৩ বছরের অপেক্ষা ফুরাবে চট্টগ্রামের।
মালিকানা হারানো দলটা এখন বিপিএলের সাফল্যের সোপানে। ২২ গজে তাদের আরেকটি দিন গড়ে দিতে পারে ব্যবধান। সেই অপেক্ষার প্রহর গুনছে মাহেদীরা।
ঢাকা/ইয়াসিন