ঢাকা     সোমবার   ১৬ মার্চ ২০২৬ ||  চৈত্র ৩ ১৪৩২ || ২৬ রমজান ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

চরম নাটকীয়তা আর রুদ্ধশ্বাস জয়ে সিরিজ বাংলাদেশের

ক্রীড়া প্রতিবেদক || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২২:৫৪, ১৫ মার্চ ২০২৬   আপডেট: ২৩:৩৬, ১৫ মার্চ ২০২৬
চরম নাটকীয়তা আর রুদ্ধশ্বাস জয়ে সিরিজ বাংলাদেশের

তানজিদ হাসানের সেঞ্চুরির জবাবটা সমান তালে দিলেন সালমান আগাও। ১-১ সমতায় থাকা সিরিজে কেউ কাউকে এক চুলও ছাড় দেয়নি। নখ কামড়ানো উত্তেজনা আর রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ে শেষ ওভার, এমনকি শেষ বল পর্যন্ত বোঝা যাচ্ছিল না—ম্যাচের ভাগ্য কোন দিকে যাবে! পেন্ডুলামের মতো দুলতে থাকা সেই ম্যাচের শেষ পর্যন্ত ফয়সালা হলো দারুণ নাটকীয়তায়, চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল উত্তেজনার রেণু, আর আবেগের স্রোতে ভাসল মাঠ।   

চরম উত্তেজনায় ভরা এক ম্যাচে ১১ রানে জয় তুলে নিয়ে তিন ম‌্যাচের দ্বিপক্ষীয় সিরিজ নিজেদের করে নিয়েছে বাংলাদেশ। শেষ দিকে চাপের মুহূর্তেও দারুণ স্নায়ু নিয়ন্ত্রণ দেখিয়ে ম্যাচ নিজেদের দিকে টেনে নেয় বাংলাদেশ। ব্যাটে-বলে সমান লড়াইয়ের পর শেষ হাসি হাসে স্বাগতিকরাই। আগে ব্যাটিংয়ে নেমে বাংলাদেশ ৫ উইকেটে ২৯০ রান করে। জবাব দিতে নেমে পাকিস্তান সবকটি উইকেট হারায় ২৭৯ রানে। 

আরো পড়ুন:

২০১৫ সালের পর আবার ঘরের মাঠে পাকিস্তানকে ওয়ানডে সিরিজে আতিথেয়তা দেয় বাংলাদেশ। সেবার মাশরাফি বিন মুর্তজার নেতৃত্বে বাংলাদেশ তিন ম‌্যাচের সিরিজে হোয়াইটওয়াশ করেছিল পাকিস্তানকে। এবার মিরাজের দল ২-১ ব‌্যবধানে জিতে নিল সিরিজ।

লড়াইয়ে দুই দল ছিল সমানে সমান। কেউ কাউকে ছাড় দেয়নি। উইকেট পড়েছে, রান হয়েছে। জুটি হয়েছে, সেই জুটিও ভেঙেছে। ব‌্যাটসম‌্যান-বোলাররা প্রত‌্যেকেই শতভাগ নিবেদন দিয়ে মাঠে নিজেদের সেরাটা দিয়েছেন। তানজিদ দিনের শুরুতে ১০৭ রানের ইনিংস খেলেন। সেঞ্চুরির জবাব সালমান দিয়েছেন ১০৬ রান করে। 

কিন্তু পার্থক‌্য গড়ে দিয়েছেন বাংলাদেশের পেসার তাসকিন আহমেদ। ৫৬৯ রানের ম্যাচে তাসকিন বল হাতে পেয়েছেন চার উইকেট। শুরুতে দুই উইকেট নেওয়ার পর ম্যাচের শেষ প্রান্তে সালমান আগার উইকেট নিয়ে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেন এই পেসার। তাতে জয়ের হাসি হাসতে পারে বাংলাদেশ।  

টস হেরে ব‌্যাটিং করতে নেমে বাংলাদেশের শুরুটা ছিল দারুণ। উদ্বোধনী জুটিতে সাইফ হাসান ও তানজিদ হাসান গড়েন ১০৫ রানের জুটি। তানজিদ উইকেটে ছিলেন বেশ সাবলীল, তবে সাইফের ব্যাটিং ছিল ঠিক উল্টো চিত্র। তানজিদ উইকেটের চারপাশে শট খেলে আত্মবিশ্বাস ছড়াচ্ছিলেন, আর সাইফ রান পেতে বেশ ভুগছিলেন। দু-একটি শটে রান পেলেও বেশিরভাগ সময়ই নিজের ছায়া হয়ে ছিলেন তিনি।

তানজিদ ৪৭ বলে তুলে নেন ফিফটি। এরপর ধারাবাহিক আক্রমণে এগিয়ে যান সেঞ্চুরির পথে। অন্যদিকে সাইফ খোলস ছেড়ে বাড়তি কিছু করার চেষ্টায় নিজের উইকেট বিলিয়ে দেন। শাহীন শাহ আফ্রিদির বলে এগিয়ে এসে বড় শট খেলতে গিয়ে বোল্ড হন ৩৬ রানে। ৫৫ বলে ৩টি বাউন্ডারিতে সাজানো ছিল তার ইনিংস।

তিন নম্বরে নেমে নাজমুল হোসেন শান্ত দ্রুত রান তোলার চেষ্টা করেন। তিনটি বাউন্ডারিতে আত্মবিশ্বাসী শুরু করলেও ইনিংসটা বড় করতে পারেননি। ৩৪ বলে ৩টি বাউন্ডারিতে ২৭ রান করে হারিস রউফের বলে এলবিডব্লিউ হন তিনি।

এরপর অপেক্ষা ছিল তানজিদের সেঞ্চুরির। এর আগে তার ক্যারিয়ার সেরা ছিল ৮৪ রান। এবার সেই আক্ষেপ ঘুচিয়ে তুলে নেন নিজের প্রথম আন্তর্জাতিক সেঞ্চুরি। সালমান আগার বলে লং অফ দিয়ে ছক্কা হাঁকিয়ে পৌঁছে যান শতকে। ৬টি চার ও ৭টি ছক্কায় ১০৭ বলে করেন ১০৭ রান। সেঞ্চুরি পূর্ণ করে দুই হাত তুলে দর্শকদের অভিবাদন জানান, এরপর সিজদাহতে নত হন। সতীর্থ লিটন দাস এসে তাকে আলিঙ্গনে ভাসান। তবে শতক পেলেও ইনিংসটা আর বড় করতে পারেননি। আবরারের লোপ্পা বলে মনোযোগ হারিয়ে ব্যাট এগিয়ে দিলে কাভারে ক্যাচ দেন ১০৭ রানে।

বাংলাদেশের স্কোর কতদূর যাবে, তা নির্ভর করছিল লিটন দাস ও তাওহীদ হৃদয়ের জুটির ওপর। দুজনই রান পেলেও রান তোলার গতি খুব একটা বাড়াতে পারেননি। তাদের জুটিতে আসে ৬১ বলে ৬৮ রান। ৪৭তম ওভারে ভাঙে এই জুটি। হারিস রউফ জোড়া আঘাতে চাপে ফেলে দেন বাংলাদেশকে। ৫১ বলে একটি করে চার ও ছক্কায় ৪১ রান করা লিটন রউফের বলে গাজীর হাতে ক্যাচ দেন। পরের বলেই রিশাদকে বোল্ড করেন ডানহাতি এই পেসার।

শেষ দিকে বাংলাদেশের ব্যাটিং ছিল একেবারেই ছন্নছাড়া। যেখানে তিনশ বা তার বেশি রান করার সুযোগ ছিল, সেখানে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি দল। শেষ ১০ ওভারে আসে মাত্র ৭৭ রান। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, শেষ ৫ ওভারে স্কোরবোর্ডে যোগ হয় মাত্র ৩৯ রান। এই সময়ে আসে কেবল দুটি চার, দুটিই তাওহীদ হৃদয়ের ব্যাট থেকে।

তাওহীদ ৪৪ বলে ৪টি বাউন্ডারিতে করেন ৪৮ রান। আর ৮ বলে ৫ রানে তার সঙ্গে অপরাজিত থাকেন আফিফ হোসেন।

বল হাতে পাকিস্তানের সেরা ছিলেন হারিস রউফ। ৫২ রানে ৩টি উইকেট নেন এই পেসার।

বোলিংয়েও দুর্দান্ত সূচনা করে বাংলাদেশ। শুরুর তিন ওভারেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেয় তাসকিন আহমেদ ও নাহিদ রানা। নতুন বলে প্রথম ওভারেই আঘাত হানেন তাসকিন। তার সুইং করা ডেলিভারিতে ব্যাট সরাতে না পেরে শাহিবজাদা ফারহান উইকেটের পেছনে ক্যাচ দেন।

পরের ওভারে নাহিদ ছক্কা হজম করার পরই বাউন্সারে ফিরতি জবাব দেন। পুল করতে গিয়ে উইকেটের পেছনে ক্যাচ তুলেন মাজ সাদাকাত। তৃতীয় ওভারে আবার আক্রমণে ফিরে তাসকিন ভেতরে ঢুকে আসা ডেলিভারিতে মোহাম্মদ রিজওয়ানকে বোল্ড করে দেন। এতে শুরুতেই চাপে পড়ে পাকিস্তান।

সেখান থেকে কিছুটা প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেন গাজি ঘোরি ও আব্দুল সামাদ। দুই অভিষিক্ত ব্যাটসম্যান দলকে টেনে নেন ৬৭ রান পর্যন্ত। নাহিদ রানা নিজের দ্বিতীয় স্পেলে ফিরে ভাঙেন এই জুটি। ২৯ রান করে সাজঘরে ফেরেন গাজি। অন্য প্রান্তে মোস্তাফিজুর রহমানও চুপ থাকেননি। ৩৪ রান করা আব্দুল সামাদকে উইকেটের পেছনে লিটন দাসের গ্লাভসবন্দী করান তিনি।

এরপর দেয়াল হয়ে দাঁড়ান সালমান আগা ও সাদ মাসুদ। তাদের ৮২ বলে ৭৯ রানের জুটি আবারও ম্যাচে ফেরার আশা জাগায় পাকিস্তানের। এই জুটি বাংলাদেশের বোলারদের জন্য মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠছিল। স্ট্রাইক রোটেশনের পাশাপাশি নিয়মিত বাউন্ডারি হাঁকাচ্ছিলেন সালমান ও সাদ। তবে বাংলাদেশের জন্য স্বস্তি এনে দেন মোস্তাফিজুরই। বাঁহাতি এই পেসারের বল জোরে মারতে গিয়ে বোল্ড হন সাদ মাসুদ। ৪৪ বলে ৫টি বাউন্ডারিতে ৩৮ রান করে থামেন তিনি।

১৬১ রানে ৬ উইকেট হারানো পাকিস্তান কার্যত ম‌্যাচ থেকে ছিটকে যায় ওখানেই। তবুও সালমান হাল ছাড়েন না। ফাহিম আশরাফকে নিয়ে ৪৯ বলে ৪৮ রানের জুটি গড়ে বাংলাদেশকে আবার চাপে ফেলেন। লক্ষ‌্য নিয়ে আসেন একশর নিচে। কিন্তু তাদের আটকানোর উত্তর জানা ছিল বাংলাদেশের। তাসকিন নিজের শেষ স্পেল করতে এসেই ভাঙেন বিপজ্জনক জুটি। তার ভেতরে ঢোকোনো শর্ট অব লেন্থের বল ইনসাইড এজ হয়ে বোল্ড হন ৯ রান করা ফাহিম।

সঙ্গী হারালেও সালমান ছিলেন অন‌্যরকম। কোনোভাবেই হার মানবেন না। ৪৫তম ওভারে নাহিদ রানাকে ফাইন লেগ দিয়ে উড়িয়ে ক‌্যারিয়ারের তৃতীয় ওয়ানডে সেঞ্চুরি তুলে নেন ৮৯ বলে। তার সেঞ্চুরির জবাবে ম‌্যাচ ও রানের ব‌্যবধান কমে আসে।

শেষ ৫ ওভারে পাকিস্তানের প্রয়োজন ৪৫ রান। হাতে ৩ উইকেট। শাহীন শাহ আফ্রিদি ও সালমান পরের ১৫ বলে ১৫ রান তুলে নেন।  শেষ ১৫ বলে পাকিস্তানের প্রয়োজন ছিল ৩০ রান।

তাসকিন নিজের শেষ ওভারে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেন। তার স্লোয়ার বলে সালমান ক‌্যাচ তোলেন ডিপ মিড উইকেটে। সেখানে শান্ত ক‌্যাচ নিয়ে বাংলাদেশকে উল্লাসে ভাসান। ৯৮ বলে ১০৬ রান করেন ৯ চার ও ৪ ছক্কায়। ১০ ওভারে ১ মেডেনে ৪৯ রানে ৪ উইকেট নিয়ে তাসকিন নিজের বোলিং শেষ করেন। 

শেষ ২ ওভারে পাকিস্তানের লক্ষ‌্য দাঁড়ায় ২৮ রানে। মোস্তাফিজুরের করা ৪৯তম ওভারে পাকিস্তানের অধিনায়ক শাহীন দুটি ছক্কা মেরে বাংলাদেশকে স্রেফ এলোমেলো করে দেন। ছড়িয়ে দেন দুশ্চিন্তা। তার করা পঞ্চম বলে জোরে মেরেছিলেন শাহীন। বল সোজা মোস্তাফিজুরের হাঁটুতে আঘাত করে। তারপরও ঝুঁকি নিয়ে শেষ বল করে হারিস রউফের উইকেট তুলে নেন। তাতে কিছুটা স্বস্তি ফেরে স্বাগতিক শিবিরে। 

শেষ ওভারে ১৪ রান দরকার পাকিস্তানের। বোলিংয়ে লেগ স্পিনার রিশাদ। আগের ৬ ওভারে ৫৪ রান দেওয়া রিশাদকে নিয়ে দুশ্চিন্তা ছিল। তবুও শুরুটা ভালো করেন। গুগলিতে শাহীনকে শান্ত রাখেন। পরের বল শাহীন হাওয়ায় ক‌্যাচ উড়ালেও নিজের বোলিংয়ে উইকেট নিতে পারেননি এই লেগ স্পিনার।

তৃতীয় বলে আসে ২ রান। চতুর্থ বল ছিল ডট। পঞ্চম বলে আবার নাটকীয়তা ছড়ায়। আম্পায়ার রিশাদের লেগ স্টাম্পের বাইরের বল ওয়াইড দেন। কিন্তু রিভিউ নিয়ে বাংলাদেশ তা ফিরিয়ে নেয়। বাংলাদেশ তার এলবিডব্লিউর আবেদন করে। কিন্তু দেখা যায় বল শাহীনের ব‌্যাট ছুঁয়ে ড্রপ পড়ে লিটনের হাতে যায়। তাতে বাতিল হয় ওয়াইড। 

ওই বল ডট হওয়ায় বাংলাদেশের জয় প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায়। শেষ বলে ১২ রানের প্রয়োজনে শাহীন এগিয়ে এসে শট খেলতে চেয়ে স্টাম্পড হন। শাহীনের উইকেটে পাকিস্তান ২৯১ রানে অলআউট হয়।

বাংলাদেশের ম‌্যাচ জয়ের নায়ক হয়েছেন তানজিদ হাসান।  সিরিজ সেরা হয়েছেন যৌথভাবে তানজিদ হাসান ও নাহিদ রানা। তানজিদ সিরিজে ১৭৫ রান করেছেন। নাহিদ রানা পেয়েছেন ৮ উইকেট। 

প্রায় ৫ মাস পর ওয়ানডে ক্রিকেটে ফিরে বাংলাদেশ কেমন করে সেটাই ছিল দেখার। দারুণ জয়ে সিরিজ শুরুর পর দ্বিতীয় ম‌্যাচ বাজেভাবে হারলেও শেষটায় বাংলাদেশ লড়াই করেছে। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত স্নায়ু স্থির রেখেছে। তাতে ধরা দিয়েছে সিরিজের ট্রফি। কষ্টার্জিত জয়ের পর সিরিজ জেতার আনন্দ বেশ ভালোভাবেই উপভোগ করেছেন তারা। 

এই জয়ে র‌্যাংকিংয়ে একধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। ৭৯ রেটিং পয়েন্ট নিয়ে র‌্যাংকিংয়ে নয়ে এখন বাংলাদেশ।

ঢাকা/ইয়াসিন

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়