মানবিকের ছাত্রী পেল বাণিজ্য বিভাগের প্রবেশপত্র
কুষ্টিয়া প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম
জারিন তাসনিন সন্ধি
মোছা. জারিন তাসনিন সন্ধি মানবিক বিভাগের ছাত্রী। নবম ও দশম শ্রেণিতে পড়াশোনা করেছে মানবিক বিভাগের ভূগোল, অর্থনীতি, ইতিহাসসহ অন্যান্য বিষয়ের পাঠ্যবই। অথচ, এসএসসি পরীক্ষার মাত্র এক দিন আগে বাণিজ্য বিভাগের প্রবেশপত্র পেয়েছে সে। এতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর উত্তর চাঁদপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থী।
রবিবার (১৯ এপ্রিল) দুপুরে বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তাকে এসএসসি পরীক্ষার প্রবেশপত্র দিলে বিষয়টি ধরা পড়ে।
সন্ধি কুমারখালী উপজেলার যদুবয়রা ইউনিয়নের জোতমোড়া গ্রামের বাদল বিশ্বাসের নাতনি। তার বয়স যখন মাত্র দুই বছর, তখন হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে বাবা সাগর হোসেন মারা যান। গত বছর মা যুথী খাতুনও মারা যান।
সন্ধি জোতমোড়া নিম্ন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় থেকে অষ্টম শ্রেণি পাস করে। এর পর ওই বিদ্যালয়ে নবম ও দশম শ্রেণিতে মানবিক বিভাগে পড়ে। বেশ কয়েক বছর ধরে এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পার্শ্ববর্তী উত্তর চাঁদপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। সে হিসেবে সন্ধি উত্তর চাঁদপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেবে।
রবিবার দুপুরে জোতমোড়া নিম্ন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের এসএসসি পরীক্ষার প্রবেশপত্র দেন। সে সময় মানবিকের ছাত্রী সন্ধিকে বাণিজ্য বিভাগের প্রবেশপত্র দেওয়া হয়। এতে ওই এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, নানাবাড়ির টিনশেড ঘরে বিছানায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কয়েকটি বই। এসএসসি পরীক্ষার্থী সন্ধি চোখে-মুখে হতাশা নিয়ে অর্থনীতি বিষয়ের পাঠ্যবইয়ের পৃষ্ঠা উল্টাচ্ছে।
সন্ধি বলে, “২১ এপ্রিল এসএসসি পরীক্ষা। এতদিন মানবিকে পড়াশোনা করেছি। দশম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করেছি। অথচ, বিদ্যালয় থেকে বাণিজ্য বিভাগের প্রবেশপত্র দিয়েছে। প্রবেশপত্র দেখেই মাথা ঘুরে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে প্রধান শিক্ষককে ফেরত দিয়েছি। স্যার বলছেন, আমি নাকি স্কুলেই আসি না। কোনোদিন ক্লাস করিনি।”
সে আরো বলে, “মানবিকের সব বিষয়ে ভালোভাবে পড়াশোনা শেষ করেছি। এখন ব্যবসায় শিক্ষার বই পড়া সম্ভব না। মানবিকের প্রবেশপত্র না দিলে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়া হবে না।”
তার ভাষ্য, সে নবম শ্রেণিতে বাণিজ্য বিভাগে মাসখানেক পড়াশোনা করেছিল। পরে বিভাগ পরিবর্তন করে মানবিকে পড়েছে। কিন্তু, শিক্ষকরা কাগজপত্র পরিবর্তন না করায় এখন এমন সমস্যা হয়েছে। প্রবেশপত্রটি বিদ্যালয়ে জমা দেওয়ায় সে রোল ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর বলতে পারেনি।
সন্ধির নানা বাদল বিশ্বাস বলেন, “এতদিন পড়ল এক বই। এখন হঠাৎ করে আরেক বই দিলে কি পড়াশোনা হবে? শিক্ষকরা তো শিক্ষার্থীদের জীবন নষ্ট করতে বসেছে। দ্রুত প্রবেশপত্র পরিবর্তনের দাবি জানাই।”
এ বিষয়ে জানতে মোবাইল ফোনে উত্তর চাঁদপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।
তিনি বলেন, “যে অনুযায়ী সে রেজিস্ট্রেশন করেছে, সে অনুযায়ী তার প্রবেশপত্র এসেছে। কেউ যদি কমার্সে (বাণিজ্য) ভর্তি হয়ে মানবিকে পড়াশোনা করে, সেই দায়-দায়িত্ব আমার নাকি। এই দায়িত্ব শিক্ষার্থীর। আমার কোনো দায়িত্ব না।”
মোহাম্মদ আলী বলেন, “এ বছর বিদ্যালয় থেকে নিয়মিত ও অনিয়মিতসহ মোট ৫১ জন এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। বোর্ডের সাথে যোগাযোগ করে দেখি, কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যায় কি না।”
জোতমোড়া নিম্ন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, “সন্ধি প্রথমে কমার্সে ক্লাস করেছে। নবম শ্রেণিতে রেজিস্ট্রেশনে সই করেছে। অথচ, এখন সে বলছে, প্রবেশপত্র ভুল এসেছে। বিষয়টি নিয়ে শিক্ষা কর্মকর্তা ও বোর্ডের সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে। দেখা যাক, কিছু করা যায় কি না।”
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নাজমুল হক বলেছেন, “সোমবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত কার্যালয়ে ছিলাম। প্রধান শিক্ষক কিছুই জানায়নি। বিষয়টি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) সঙ্গে আলোচনা করা হচ্ছে।”
ইউএনও ফারজানা আখতার বলেছেন, “বিষয়টি মাত্র জানলাম। ঊর্ধ্বতন ও যথাযথ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ঢাকা/কাঞ্চন/রফিক
২৪ ঘণ্টায় হামে মৃত্যু ৩, আক্রান্ত ১১৭০