ঢাকা     বুধবার   ১৯ জানুয়ারি ২০২২ ||  মাঘ ৫ ১৪২৮ ||  ১৪ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

নীল সমুদ্রের বুকে ছড়িয়ে আছে সবুজ পাহাড়

ফেরদৌস জামান || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৭:৩৮, ২৯ নভেম্বর ২০২১   আপডেট: ১৭:৪১, ২৯ নভেম্বর ২০২১
নীল সমুদ্রের বুকে ছড়িয়ে আছে সবুজ পাহাড়

(বিজন দ্বীপের স্বরলিপি: ১৭তম পর্ব)

রাতে প্রশান্তির ঘুম শেষে পরদিন ভোরে জেগে উঠলাম। নিচে নেমে দেখি দরজা খোলা হয়নি। আমার উপস্থিতি টের পেয়ে ঘুম থেকে উঠে একজন দরজা খুলে দিলেন। নিরব শহরের কালো পথের উপর ক্ষুদ্র পাতাগুলো পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে ঝরে পড়ছে। পড়ছে আর পড়ছে, যেন অনন্তকাল ধরে শুধু পড়ছেই!

প্রধান রাস্তার ওপাড় থেকে সমুদ্রের দিকে এগিয়ে গেছে জেটির মতো  দীর্ঘ পথ। সকালটাকে সুন্দর করে তোলার জন্য এর চেয়ে উপযুক্ত জায়গা আর হতেই পারে না। এমন সুন্দর পরিবেশে মনের অজান্তে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ভাঁজতে থাকলাম প্রিয় গানের কয়েকটা লাইন। কখন যে শহরজুড়ে কোলাহল বাড়তে শুরু করেছে বুঝতে পারিনি। ফিরে এলাম হোটেলে। উপরে গিয়ে প্রস্তুত হয়ে আবারও নেমে এলাম। আজ শেষ দিন, তাই ঠিক করেছি সারা দিনের জন্য একটা মোটর সাইকেল ভাড়া করে শুধু টো টো করে ঘুরে বেড়াব।

ঘড়ির কাটায় ঠিক সাড়ে নয়টা, নাস্তা খেতে সমস্ত অতিথি নিচে এসে জড়ো হয়েছে। অর্ডার করার বিশ মিনিট পর নাস্তা পরিবেশিত হলো। কফির পেয়ালায় তৃপ্তির শেষ চুমুক দিয়েই বের হলাম। যেহেতু পথেই পড়বে তাই সর্বপ্রথম কাজ ট্যুর এজেন্সির কার্যালয়ে একটা ঢুঁ দেওয়া; এত সুন্দর একটা ভ্রমণ উপহার দেওয়ার জন্য তাদের ধন্যবাদ জানাতে চাই। তারপর হ্যানয় ফেরার বাস টিকিটটাও কেটে ফেরতে হবে। 

ভদ্রলোক প্রথমে চিনতে পারলেন না। বিস্তারিত বলা শুরু করতেই চিনে ফেললেন। তার সঙ্গে দেখা করার কারণটা জানালে তিনি যারপর নেই খুশি, ব্যবসা জীবনে এই প্রথম কোনো গ্রাহক ধন্যবাদ জানাতে তার দোরগোড়ায় উপস্থিত। বসতে বলে সঙ্গে সঙ্গে পানীয় প্রস্তাব করলেন। মাত্র কয়েক মিনিট আগে কফি পান করেছি বলার পরও কাজ হলো না। তার কথা, আমার প্রস্তাব গ্রহণ করতেই হবে, এটা আমার অনুরোধ। না না করতে করতেই ফ্রিজ খুলে ক্যান বের করে পট্ ফসসসস শব্দে ক্লিপটা খুলে হাতে তুলে দিলেন। সামনে ল্যাপটপ চালুই আছে, বসে বসে অনলাইন রিভিউ দেখছেন। ট্রিপ অ্যাডভাইজার নামক ওয়েব সাইটে আগের রাতেই নৌ-ভ্রমণের উপর একটা রিভিউ দিয়েছিলাম। শুধু খেয়াল করলাম ল্যাপটপের পর্দায় তার সচল চোখ দুটো ডান-বাম করছে, সাথে মুখজুড়ে ভেসে উঠছে আনন্দের প্রতিচ্ছবি। 

পড়া শেষে চেয়ার থেকে দাঁড়িয়ে দুই হাতে আমার ডান হাত চেপে ধরে উল্টো আমাকে একের পর এক ধন্যবাদ জানাতে থাকলেন এবং আনন্দের ঠেলায় আরও একটা পানীয়ের প্রস্তাব করে বসলেন। সেটা সম্ভব নয়, কারণ আশপাশটা ঘুরে দেখতে এখনই বেরিয়ে পড়তে হবে। আমার এই জবাবের পরিপ্রেক্ষিতে তার কথা- কোনো সমস্যা নেই, আমার নিজের মোটর সাইকেল আছে। আমি নিজেই তোমাকে নিয়ে বের হবো। স্ত্রীকে ফোন করে স্কুল ছুটি হলেই বাচ্চাদেরসহ চলে আসতে বললেন। ফোন রেখে বললেন, আজকের ঘোরাঘুরির পর তোমার লাঞ্চের দাওয়াত। আমার স্ত্রী আসছে, সে নিজে রান্না করবে। প্রথমে হতভম্ব হয়ে গেলাম! তারপর মনে মনে ভাবলাম, আমার এই ভ্রমণে কি থেকে কি হচ্ছে তার তো কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না! 

তার নাম হাং। হোটেল ব্যবসার পাশাপাশি ট্রাভেল এজেন্সিও আছে। চারতলা ভবনে উপরের তিনতলা হোটেল এবং নিচে কার্যালয় ও রেস্টুরেন্ট। বয়স পয়তাল্লিশের মতো হবে কিন্তু স্বভাবে একেবারে চব্বিশ পঁচিশ। টুর অ্যান্ড ট্রাভেল এজেন্সির ব্যবসার পাশাপাশি কয়েক বছর হলো হোটেল ব্যবসায় নেমেছে। এরই মধ্যে তার স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে হাজির। কার্যালয়ের সামনে দাঁড় করানো মোটর সাইকেলগুলো সবই তার, পর্যটকদের কাছে ভাড়া দেওয়ার জন্য। এর মাঝ থেকে একটা স্কুটি মোটর সাইকেল নিয়ে দুজন বেরিয়ে পড়লাম। উঁচু-নিচু সড়কের ছোট্ট ক্যাট বা শহর। ঘণ্টা দেড়েকের ভ্রমণে একটা গলিও বোধহয় বাদ থাকল না। কোথায় তার জন্ম, কোথায় তার নানার বাড়ি, ফুফুর বাড়ি, চাচার দোকান ইত্যাদি। মাঝে কয়েক জায়গায় দাঁড়িয়ে পরিচিতদের সঙ্গে কথাবার্তার ফাঁকে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিতেও ভুললেন না। যেন ছুটিতে এক বন্ধু আর এক বন্ধুর বাড়ি বেড়াতে গিয়েছে আর তাকে নিয়ে সে এলাকা ঘুরে দেখাচ্ছে। সমস্ত কিছু মিলিয়ে এটা আমার কাছে এক নতুন অভিজ্ঞতা।

ফিরে দেখি তার স্ত্রী রান্নার কজে লেগে পড়েছেন। আমার খুব ইচ্ছা হলো ভেতরে ঢুকে দেখি কী রান্না হচ্ছে? অনুমতি নিয়ে রান্ন ঘরে প্রবেশ করে দেখি দুই চুলায় দুটি প্যান। একটাতে মাংসের পাতলা করে কাটা টুকরো ভাজা হচ্ছে, অন্যটাতে ভাজা হচ্ছে সামুদ্রীক মাছের শুধু লেজের অংশ। লেজগুলো কোনো মিশ্রণের পড়তে ঢাকা, তার মাঝ থেকে শুধু লেজের প্রান্তগুলো বেরিয়ে আছে। স্কুটি নিয়ে ভোঁ ভোঁ করে শুধু ঘুরেছি, আইসক্রীম ছাড়া অন্য কিছুই খাওয়া হয়নি। তার একমাত্র কারণ দুপুরের মজাদার খাবারগুলো পূর্ণ মাত্রায় উপভোগ করা। 

খাবার আসরে অতিথি হয়ে এসেছেন হাং-এর ফুফাতো ভাই। পেশায় তিনি পুলিশ কর্মকর্তা। কিছুক্ষণ পর টেবিলে একে একে সব খাবার সাজিয়ে আমাদের ডাকা হলো। প্রতিটি চেয়ারের সামনে কড়ির বাটি এবং তার উপর একজোড়া করে চপস্টিক রাখা। ছোট বাটিতে সাদা ভাত, শাকপাতা সিদ্ধ, লকলকে কাঁচা শাকপাতা, চিংড়ি ভাজা, সুরুয়ার মাঝে চাপিলা ধরনের এক প্রকার মাছ, দুই প্রকার সস এবং রান্না হতে দেখা মাছ ও মাংসের অপর দুই পদ। সমস্ত খাবারের ঠিক মাঝখানে একটা বাটিতে গাঁজন প্রক্রিয়ায় প্রস্তুত করা এক ধরনের পানীয়। পানীয় বাটির চারধারে ক্ষুদ্রাকৃতির কয়েকটা কাঁচের গ্লাস।

আনুষ্ঠানিকভাবে খাবার শুরু হলো। তারা দ্রুত খাবার খায় না, বরং অনেকটা সময় নিয়ে এবং গল্পে গল্পে খাবার খেতে অভ্যস্ত। চপস্টিক দিয়ে খাবার খাওয়ার অভ্যাসটা রপ্ত থাকায় তাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে খেতে আমার বেগ পোহাতে হলো না। খাবার শেষে বিদায়ের সময় কথা দিতে হলো, পরে কখনও এলে শহরের অদূরে তাদের বাংলো ধরনের বাড়ি আছে, সেখানে অতিথি হয়ে উঠতে হবে। সামান্য একটা ধন্যবাদ দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দিনটি আমার এত আন্তরিক সমাদরের মধ্য দিয়ে পেরিয়ে যাবে ভাবতে পারিনি। হোটেলে ফিরে কয়েক ঘণ্টা ধরে ঘটে যাওয়া ঘটনার টাটকা স্মৃতিগুলো নিজের রোমন্থন করতে করতে কখন যে গভীর ঘুমে তলিয়ে গিয়েছিলাম বুঝতে পারিনি।

সন্ধ্যার পর বরাবরের মতো জমজমাট হয়ে উঠেছে সবকিছু। শহরের হস্তশিল্পের বাজারটা বিলক্ষণ চোখের আড়ালে থেকে গেছে। ফুটপাত থেকে কিছুটা উঁচুতে চার কোণা একটা উঠানের তিন দিকে শুধু দোকান আর দোকান। প্রতিটি দোকান থরে থরে সাজানো যত সব সামুদ্রীক পণ্য। হরেক রকমের পণ্যের মধ্যে মুক্তার অলঙ্কারের আধিক্য ও প্রাধান্য লক্ষণীয়। সমস্ত পণ্যের মূল্য হাতের নাগালের মধ্যে, তবে মুক্তাগুলোর প্রায় সবই কৃত্রিম। মুক্তা সম্বন্ধে পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকলে ঠকার আশঙ্কা শতভাগ। যাচাইয়ের সব থেকে সহজ পথ হলো পণ্যের অতি সস্তা মূল্য। একটা মালার দাম যা হাঁকা হয় তাতে খুব বেশি হলে মুক্তার কয়েকটা দানা পাওয়ার আশা করা যেতে পারে। তার চেয়ে আমি বরং একটা শঙ্খ কেনায় মনোযোগী হলাম। বিক্রেতার কাছে জানতে পারলাম শঙ্খটির বয়স আনুমানিক আড়াইশ বছর। আমার কাছে বয়সের চেয়ে তার সৌন্দর্যটাই মূখ্য হয়ে উঠল। ঝকঝকে শঙ্খের শরীর থেকে কয়েকটা শাখা বেরিয়ে পড়েছে। ওজনেও দেড় কেজির কম নয়। ক্যাট বা’র স্মৃতিস্বরূপ অনেক কিছুর সঙ্গে দৃশ্যমান এই একটি মাত্র জিনিসের লোভ শেষ পর্যন্ত সামলাতে পারলাম না। (চলবে) 

পড়ুন ১৬তম পর্ব: মাঙ্কি আইল্যান্ডের বানরও বিয়ার পান করে  

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়