ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৯ ভাদ্র ১৪২৪, ২৪ আগস্ট ২০১৭
Risingbd
শোকাবহ অগাস্ট
সর্বশেষ:

তরুণদের নির্মাতা হওয়ার স্বপ্ন দেখাতেন তারেক মাসুদ

রুহুল আমিন : রাইজিংবিডি ডট কম
প্রকাশ: ২০১৭-০৮-১৩ ৮:১৩:১২ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৮-১৩ ১:০৭:১১ পিএম
তারেক মাসুদ

রুহুল আমিন  : তারেক মাসুদ। বাংলাদেশে বিকল্প ধারার চলচ্চিত্রকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অগ্রপথিক। চলচ্চিত্র শিল্পকে মানুষের কাছে, বিশেষ করে তরুণদের কাছে জনপ্রিয় করে তোলা, চলচ্চিত্রকার হয়ে উঠার স্বপ্নকে উসকে দেওয়ায় যিনি ছিলেন পুরোধা ব্যক্তিত্ব।

আজ ১৩ আগস্ট তারেক মাসুদের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১১ সালের এই দিনে মানিকগঞ্জের ঘিওরে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন তিনি। বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করি বিকল্প ধারার এই চলচ্চিত্র মায়েস্ত্রোকে।

১৯৫৭ সালে ফরিদপুরের ভাঙ্গার নূরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তারেক মাসুদ। পুরো নাম আবু তারেক মাসুদ। তবে সবাই তারেক মাসুদ নামেই চেনেন। তার মায়ের নাম নুরুন নাহার মাসুদ ও বাবার নাম মশিউর রহমান মাসুদ। তারেক মাসুদ ছিলেন একজন স্বাধীন চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার, লেখক ও গীতিকার।

তারেক মাসুদ চলচ্চিত্র নির্মাণের পাশাপাশি নির্মাতা তৈরিতেও ভূমিকা রেখেছেন। তারেক মাসুদকে দেখেই তরুণরা স্বাধীন নির্মাতা হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল। তরুণদের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন নির্মাতা হওয়ার। বর্তমান সময়ে যে কয়জন স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা আছেন তারা কোনো না কোনোভাবে তারেক মাসুদের কাছে ঋণী। তারেক মাসুদ নির্মিত চলচ্চিত্র প্রজেকশনের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রদর্শন করেছেন। কথা বলেছেন দর্শকদের সঙ্গে। চলচ্চিত্র প্রদর্শন করিয়ে দর্শকদের ভাবতে প্ররোচণা দিতেন।

ফরিদপুরের ভাঙ্গা ঈদগাঁ মাদ্রাসায় প্রথম পড়াশোনা শুরু করেন । পরবর্তীতে ঢাকার লালবাগের একটি মাদ্রাসা থেকে মৌলানা পাস করেন তিনি। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তার মাদ্রাসা শিক্ষার সমাপ্তি ঘটে । যুদ্ধের পর তিনি সাধারণ শিক্ষার জগতে প্রবেশ করেন । ফরিদপুরের ভাঙ্গা পাইলট উচ্চবিদ্যালয় থেকে প্রাইভেট পরীক্ষার মাধ্যমে প্রথম বিভাগে এসএসসি পাস করেন । আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজে ছয় মাস পড়াশোনার পর বদলি হয়ে নটর ডেম কলেজ থেকে মানবিক বিভাগ থেকে এইচএসসি পাস করেন । পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে মাস্টার্স করেন তারেক মাসুদ।

নির্মাতা হিসেবে তারেক মাসুদের যাত্রা ১৯৮২ সালের শেষ দিকে। তা ছিল একটি প্রামাণ্যচিত্র। ১৯৮৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ওই  প্রামাণ্যচিত্রটি  প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের জীবনের ওপর নির্মিত হয়। এর আগে অবশ্য ১৯৮৭ সালে সোনার বেড়ি নামে বাংলাদেশের নির্যাতিত নারীদের ওপর তিনি ২৫ মিনিট দৈর্ঘ্যের একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন। সে হিসেবে সোনার বেড়ি তার প্রথম কাজ। এরপর তিনি বেশ কিছু প্রামাণ্যচিত্র, অ্যানিমেশন, স্বল্পদৈর্ঘ্য ও পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন।

মাটির ময়না তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। ২০০২ সালে সিনেমাটি মুক্তি পায়। মাটির ময়নার জন্য তিনি ২০০২-এর কান চলচ্চিত্র উৎসবে ডিরেক্টর ফোর্টনাইট সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেন।  এ ছাড়া এটি বাংলাদেশের প্রথম চলচ্চিত্র হিসেবে, সেরা বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্রের জন্য একাডেমি পুরস্কারে মনোনীত হয়েছিল। তার সর্বশেষ পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র রানওয়ে মুক্তি পায় ২০১০ সালে। তারেক মাসুদের উল্লেখযোগ্য আরো কয়েকটি চলচ্চিত্র হলো অন্তর্যাত্রা (২০০৬), নরসুন্দর (২০০৯)।  আর ১৯৯৫ সালে স্ত্রী ক্যাথরিনের সঙ্গে যৌথভাবে নির্মাণ করেন তথ্যচিত্র মুক্তির গান।

তারেক মাসুদ বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই চলচ্চিত্র আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। দেশে-বিদেশে চলচ্চিত্র বিষয়ক অসংখ্য কর্মশালা এবং কোর্সে অংশ নেন তিনি। বাংলাদেশের বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সংগঠন শর্ট ফিল্ম ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য তিনি। ১৯৮৮ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত প্রথম আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসবের কো-অর্ডিনেটর হিসেবে কাজ করেন। এ ছাড়া তিনি যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং এশিয়ার বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে যোগ দেওয়ার পাশাপাশি কয়েকটি সাময়িকী ও পত্রিকায় চলচ্চিত্র বিষয়ে লেখালেখি করতেন।

তারেক মাসুদের স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ একজন মার্কিন নাগরিক। ক্যাথরিন এবং তারেক মিলে ঢাকায় একটি চলচ্চিত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন যার নাম অডিওভিশন। এই দম্পতির ‘বিংহাম পুত্রা মাসুদ নিশাদ’ নামে এক পুত্রসন্তান রয়েছে।

তারেক মাসুদের স্বপ্নের চলচ্চিত্র ছিল ‘কাগজের ফুল’। তিনি নিজেই বলতেন এটি তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে। খুব আগ্রহ ছিল তার এই সিনেমার ব্যাপারে। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য তিনি তার আকাঙ্ক্ষার সিনেমাটি শেষ করে যেতে পারেননি। যা বাংলাদেশের শৈল্পিক, চিন্তাশীল ও বক্তব্যধর্মী চলচ্চিত্র ধারার জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।

বিকল্প ধারার এই কাণ্ডারি পুরুষ ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট তার স্বপ্নের কাগজের ফুল সিনেমার শুটিং স্পট নির্বাচন করে ফেরার পথে মানিকগঞ্জের ঘিওরে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন।  সেদিন তারেক মাসুদের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের সহকর্মী টেলিভিশন সাংবাদিকতার পথিকৃৎ ও বিশিষ্ট চিত্রগ্রাহক মিশুক মুনীরও নিহত হন। এ ছাড়া ইউনিটের আরো তিনজন মারা যায়।

তারেক মাসুদ অল্প কয়টি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। যে কয়টাই নির্মাণ করেছেন সেখানে নিজের বক্তব্যকে তুলে ধরেছেন নির্ভয়ে। দৃষ্টি শক্তিকে নিয়ে গেছেন মানব মনের অতল তলে। দেখাতে চেয়েছেন গভীরের যাতনা, মর্মবেদনা, ক্রন্দন। আর এর মধ্য দিয়ে  সৃষ্টি করতে চেয়েছেন বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের নিজস্ব ভাষা। যার জন্য আমরা এখনো সংগ্রাম করে যাচ্ছি। একটি শিক্ষিত চলচ্চিত্র দর্শক গড়ে ওঠার আগে, নিজের ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চলচ্চিত্র দাঁড়ানোর আগে তারেক মাসুদের বিদায় আমাদের চলচ্চিত্রের জন্য হৃদয় বিদারক ঘটনা। ২০১২ সালে তাকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদক প্রদান করা হয়।

 

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৩ আগস্ট ২০১৭/রুহুল/শান্ত

Walton Laptop