ঢাকা, শনিবার, ৪ ভাদ্র ১৪২৪, ১৯ আগস্ট ২০১৭
Risingbd
শোকাবহ অগাস্ট
সর্বশেষ:

মাত্রা মেপে ঈশানচন্দ্র লিখে গেছেন গীতিকাব্য

হাসান মাহামুদ : রাইজিংবিডি ডট কম
প্রকাশ: ২০১৭-০৬-১৬ ১০:২৬:৩০ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৬-১৬ ১০:২৬:৩০ এএম

হাসান মাহামুদ : ২০১৫ সালের জুলাইয়ে কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার একটি নিবন্ধের শিরোনাম ছিল, ‘ঐতিহাসিক এই জনপদে গুণিজনের স্মৃতিরক্ষায় উদ্যোগের অভাব রয়েছে।’

এই নিবন্ধে মূলত তুলে আনা হয়েছিল ওই অঞ্চল এবং অবিভক্ত বাংলায় যেসব মনীষী সমষ্টির জন্য রেখে গেছেন অনেক কিছু। সমাজ-সভ্যতা যাদের অবদানের কাছে ঋণী।

নিবন্ধে বলা হয়, ‘ঊনবিংশ শতকের শেষ পর্যন্ত গুপ্তিপাড়া সংস্কৃত শিক্ষার পীঠস্থান হিসেবে বিবেচিত হত। আবার এখানকার শিক্ষাব্রতীরা ইংরেজি শিক্ষা বিস্তারে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন। এখানকার বিজ্ঞান, সঙ্গীতচর্চা, আধ্যাত্মিকতা, কাব্য, সাহিত্য এবং জ্ঞানের উন্মেষে নিয়োজিত বহু মানুষের স্মৃতি রক্ষায় কেউ উদ্যোগী হয়নি। পণ্ডিত বাণেশ্বর বিদ্যালঙ্কার, সঙ্গীতগুরু কালী মির্জা বা বৈজ্ঞানিক-চিকিৎসক ইন্দুমাধব মল্লিকের স্মৃতি সংরক্ষিত হয়নি। ভুলতে বসেছি ইংরেজির শিক্ষক ঈশানচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, মহেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রব্রাজিকা ভারতীপ্রাণা, কবিয়াল ভোলা ময়রা, বিপ্লবী ভূপতি মজুমদারের মতো গুণীজনকে …বিদ্বজ্জনদের স্মৃতিরক্ষার্থে সংগ্রহশালা নির্মাণ জরুরি। …এ জন্য দরকার সমবেত উদ্যোগ।’

অর্থ্যাৎ এই অঞ্চলে অনেক গুণীজন অবহেলিত হয়েছেন, এখনো অবহেলিতই রয়ে গেছেন। তেমনি একজন অবিভক্ত বাংলায় ইংরেজি শিক্ষার অগ্রদূত, বহু ভাষাবিদ পণ্ডিত ঈশানচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। এই মনীষীর স্মৃতিরক্ষায় উদ্যোগের যথেষ্ঠ অভাব রয়েছে। বলতে গেলে, কখনো উদ্যোগ নেয়ার তথ্য কোথাও পাওয়া যায়নি। অবাক করা বিষয় হচ্ছে, বিশিষ্ট কবি এবং এই সমাজসেবকের কোনো তথ্য উইকিপিডিয়াতে নেই।

ঈশানচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পর্কে খোঁজ করে যতদূর জানা গেছে, পশ্চিমবঙ্গ থেকে ১৯৯০ সালের আগে প্রকাশিত ‘জীবনী-কোষ’ গ্রন্থে এবং কলকাতার বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষদ থেকে ১৯৬০ সালের আগে প্রকাশিত ‘সাহিত্য-সাধক-চরিতমালা’ গ্রন্থে তার সম্পর্কে কিছু তথ্য দেয়া আছে। 

জীবনী-কোষ গ্রন্থে ঈশানচন্দ্রের অতি সামান্য পরিচিতি তুলে ধরা হয়। সেখানে লেখা হয়, ‘১৯৪২ খ্রীষ্টাব্দে তাঁহার জন্ম হয়। হিন্দু কলেজে শিক্ষা লাভ করিয়া শিক্ষা বিভাগে কার্য্যগ্রহণ করেন এবং বিশেষ সুখ্যাতির সহিত বিভিন্ন কলেজে অধ্যাপনা করিয়া প্রসিদ্ধি লাভ করেন। কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোয়পাধ্যায় অনুজ। তিনি নিজেও সুকবি ছিলেন। ১২৬২ বঙ্গাব্দে তাঁহার জন্ম হয়। ‘যোগেষ’ নামক কাব্য এবং ‘সুধাময়ী’ নামক উপন্যাস তাঁহার কাব্য প্রতিভার উকৃষ্ট ফল। তিনি হুগলীতে আইন ব্যবসায়ী ছিলেন। তাঁহারই চেষ্টায় বাঁশবেড়িয়া হইতে পূর্ণিমা নামক মাসিক পত্র ১৩০১ বঙ্গাব্দ হইতে প্রকাশিত হইতে আরম্ভ করে। মৃত্যুকাল পর্যন্ত তিনি উহার একজন নিয়মিত লেখক ও সহায়ক ছিলেন।

ঈশানচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ঊনবিংশ শতাব্দির বিশিষ্ট কবিদের একজন ছিলেন। বাংলা সাহিত্যে তার অবদান অপরীসীম। তিনি কাজ করে গেছেন ইংরেজি শিক্ষার প্রসারে। ছিলেনও ইংরেজির শিক্ষক। কিন্তু অবলীলায় লিখে গেছেন বাংলা কবিতা। সমগ্র বাংলা কবিতার নির্যাস তুলে এনে তার ছন্দ মূল্যায়ন করেছেন তিনি।

সাহিত্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার বিচরণ ছিল। তবে কবি হিসেবেই তিনি খ্যাতিমান। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ভাবপ্রবণ কবি। কবিতা লিখেছেন কাঠামো মেনে, মেপে। 

কবিতার আধুনিক সময়ের আগ পর্যন্ত কবিতায় ছন্দ বলতে যে ধরনের ছন্দকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হতো কিংবা যে ধরনের ছন্দের বেশি প্রয়োগ হতো কবিতায়, তা আজ সেভাবে প্রয়োগ হচ্ছে না। কবিতায় সেই ধরাবাঁধা নিয়মের যে ছন্দ, সে ছন্দ থেকে কবিরা কবিতাকে মুক্তি দেয়ার পথ খুঁজেছেন মাত্র। কিন্তু ঈশানচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় এক্ষেত্রে ছিলেন যুগপৎ। মাত্রার কবিতার বাইরেও ঈশানচন্দ্র লিখেছেন অসংখ্য গীতি কাব্য।

গীতি কাব্য একজন কবির একান্ত ব্যক্তি-অনুভূতির সহজ, সাবলীল গতি ও ভঙ্গীমায় সঙ্গীত-মুখর জীবনের আত্ম-প্রতিফলন। এটি গীতি কবিতা নামেই সাহিত্যামোদী ব্যক্তিবর্গের কাছে সমধিক পরিচিত। গীতি কাব্য অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ বলে সাধারণতঃ দীর্ঘকায় হয় না। কারণ, কোন অনুভূতিই দীর্ঘকাল স্থায়ী নয়। কিন্তু কোন কবি যদি গীতি কবিতায় তাঁর ব্যক্তি-অনুভূতিকে একান্ত আন্তরিকতার সাথে অনায়াসে দীর্ঘকারে বর্ণনা করতে পারেন, তবে তার মূল রস ক্ষুণ্ন হয় না। কবির আন্তরিকতাই শ্রেষ্ঠ গীতি কবিতা বা গীতি কাব্যের একমাত্র কষ্টি-পাথর।

ঈশানচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ‘মহাশ্বেতা’ কাব্যে লিখেছেন-

 

একটি মধুর ছবি, অতীত কালের পটে,

রয়েছে অঙ্কিত আজো উজ্জ্বল রেখায়।

তপস্বিনী মহাশ্বেতা, নিবিড় কানন কোলে,

জ্যোত্স্নার ছায়া যথা বনরাজিগায় ।।

নিবিড় তনুয়া কিবা, বরাঙ্গের স্ফুট বিভা,

নয়নে বদনে ঘন মাখানো মাধুরী।

কল্পনায় সে প্রতিমা, ধেয়ান করিলে তবু,

উঠে ভাবুকের চিতে কি সুখলহরী।।

এটি একটি সার্থক অক্ষরবৃত্ত ছন্দের কবিতা। আবার এটি সার্থক গীতিকাব্যও। এই দুইয়ের অপূর্ব মিলন রেখে কাব্য রচনার বিরল প্রতিভা ছিল ঈশানচন্দ্রের। তিনি লিখেছেন-

হৃদয়-মন্দিরে প্রাণ,

দেবীর চরণ তলে

ছিল ঘুমাইয়া।

বিজন-মন্দিরে সেই

প্রাণীমাত্র নাহি ছিল

দিতে জাগাইয়া।।

অতীত পূজার বেলা,

অনশনে ক্লান্ত প্রাণ

ঘুমে অচেতন

ধূলায় পড়েছে ঢলি,

পাষাণে ললাট পড়ি

স্বেদ ঝরে ঘন।।

তার কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘চিত্তমুকুর’ (১৮৭৮), ‘বাসন্তী’ (১৮৮০), ‘যোগেশ’ (১৮৮১) প্রভৃতি। তার যোগেশ কাব্য সমকালীন বাঙালী তরুণের দ্বিধাদ্বন্দ্বের কাব্যরূপ।

এর বাইরে যে কাজটির জন্য তিনি ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন, তা হলো এই অঞ্চলে এক সময় ইংরেজি বিষয়টিকে চরম ঘৃণা করা হতো। কিন্তু আর্থ-সামাজিক সব বিষয়ে ইংরেজি শিক্ষার জন্য এগিয়ে আসেন ঈশানচন্দ্র। অত্যন্ত নিষ্ঠা ও দরদ দিয়ে যত্ন নিয়ে করতেন সাহিত্য বিচার। একই সঙ্গে ঈশানচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন একাগ্রচিত্ত, কল্যাণব্রতী এবং নিষ্ঠাবান মানুষ। তার ছিল পরিশীলিত মনন। শিক্ষার স্বার্থরক্ষায় এবং কর্মের উদ্যমে তিনি অতুলনীয়। এই অঞ্চলে ইংরেজি শিক্ষার প্রসারে তিনি অনবদ্য অবদান রেখেছেন।

ঈশানচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ১৮৮৭ সালের আজকের দিনে (১৬ জুন) মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পর থেকে এতো বছরেও দুই বাংলার কোথাও তার সব স্মৃতি সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। তিনি যেহেতু পশ্চিমবঙ্গে জন্ম নিয়েছেন, সেহেতু এই গুণীজনকে প্রাপ্য মর্যাদা দেয়া সর্বপ্রথম তাদের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। তবে বাংলা ভাষার কবি হিসেবেও আমরাও তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি, সম্মান করি।

লেখক : সাংবাদিক।

ইমেইল : hasanf14@gmail.com

(মতামত লেখকের নিজস্ব)।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৬ জুন ২০১৭/হাসান/শাহনেওয়াজ

Walton Laptop