ঢাকা, শনিবার, ৮ আশ্বিন ১৪২৪, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

ক্রসড্যাম বদলে দেবে বহু মানুষের ভাগ্য

রফিকুল ইসলাম মন্টু : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৯-১১ ৩:৪৮:৪০ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৯-১১ ৫:১৪:০১ পিএম

বাংলাদেশের সমুদ্র তীরবর্তী উপকূলীয় এলাকায় রয়েছে অফুরন্ত সম্ভাবনা। সমুদ্র-নদী থেকে আহরিত মৎস্য সম্পদে জীবিকা চলে লাখো মানুষের। লবণ চাষ, শুঁটকি উৎপাদন, কাঁকড়া চাষ, চিংড়ি চাষে বহু মানুষ বেঁচে আছে। দ্বীপের পলি মাটিতে কৃষি আবাদ বহু মানুষের ভাগ্য বদলে দিয়েছে। সয়াবিনের মতো অর্থকরী ফসল উৎপাদনেও বিপ্লব ঘটেছে উপকূলে। সমুদ্রসৈকতের খনিজ বালু এই জনপদের আরেক সম্ভাবনা। পর্যটন খাতেও উপকূলজুড়ে রয়েছে অফুরন্ত সম্ভাবনা। এসব সম্ভাবনা ও সম্ভাবনা বিকাশের অন্তরায় নিয়ে উপকূলের প্রান্তিক জনপদ ঘুরে তুলে ধরেছেন রফিকুল ইসলাম মন্টু। আজ প্রকাশিত হলো এই ধারাবাহিকের তৃতীয় পর্ব।

‘রাক্ষুসি নদী এখন বেশ শান্ত। ভাসিয়ে নেয় না বাড়িঘর। চাষাবাদে আগের চেয়ে বেশ সুবিধা। মাছ ধরতেও সমস্যা নেই। ক্রসবাঁধ মোদের ভাগ্য বদলে দিয়েছে।’ নোয়াখালী-ফেনী জেলার সীমান্তে মুছাপুর ক্রসড্যামের ওপর দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলছিলেন ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার দক্ষিণ চর দরবেশ গ্রামের বাসিন্দা আবদুল্লাহ (৬৪)। পাশ থেকে দিনমজুর গোলাম হোসেন (৩৫) যোগ করেন, ‘আগে বাড়িঘর নদীতে ভেঙে নিয়ে যেত। এখন চর পড়ছে। যেখানে অন্তত ১০০ হাত পানি ছিল, সেখানে এখন বিশাল চর। আমরা ভালো আছি। কাজ করে খেতে পারছি।’

নোয়াখালী-ফেনী জেলার সীমান্তে ফেনী নদীর ওপরে ক্রসড্যামের বয়স বেশি হয়নি। ২-৩ বছরেই এর আশপাশে গড়ে উঠেছে বিশাল চর। ভয়াল বিক্ষুব্ধ নদী এখন বেশ শান্ত। বহু মানুষ এই নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন। বাঁধ হওয়ায় এলাকাটি পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ফলে বাঁধের দু’পাশেই গড়ে উঠেছে অনেকগুলো দোকানপাট। কর্মহীন অনেকের জীবিকা হয়েছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়। দুর্যোগকালে এক সময় এই এলাকার মানুষ বেশ ভয়ে থাকলেও এখন তাদের ভয় কেটে গেছে।

ক্রসড্যাম (আড়াআড়ি বাঁধ) এভাবেই এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশ বদলে দিয়েছে। এক ভূ-খণ্ডের সঙ্গে আরেক ভূ-খণ্ডের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটায় মানুষের জীবনযাপনও অনেকটা সহজতর হয়েছে। শুধু ফেনী-নোয়াখালীর এই এলাকায় নয়, উপকূলের কিছু এলাকায় ক্রসড্যামের মাধ্যমে জনজীবন এগিয়ে দেওয়ার বিপুল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের অভাব, যথাযথভাবে জরিপের অভাবসহ বিভিন্ন কারণে এই কাজ ততটা এগোচ্ছে না। আবার অনেক স্থানে ক্রসড্যামের দাবি ঝুলে আছে বছরের পর বছর। কোনো কোনো স্থানে প্রকল্প গ্রহণের পরও তা বাস্তবায়িত হয়নি।

 


সূত্র বলছে, পটুয়াখালীর দ্বীপ ইউনিয়ন চরমোন্তাজকে মূল ভূ-খণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত পৃথক দু’টি ক্রসড্যামের প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। একটি ছিল ভোলার চর মাইনকার সঙ্গে সংযোগের প্রকল্প, অপরটি চরমোন্তাজের আওতাধীন আন্ডারচরের সঙ্গে সংযোগ। চর মাইনকার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে দুটি নদীতে ক্রসড্যাম দেওয়ার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু একটি নদীতে ক্রসড্যাম হলেও অপরটিতে হয়নি। ফলে কর্মসূচির লক্ষ্য বাস্তবায়িত হয়নি। চরমোন্তাজকে আন্ডারচরের সঙ্গে সংযোগ করার জন্য যে ক্রসড্যামের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল, তার ভিত্তিপ্রস্তুর স্থাপন পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। অথচ এলাকার মানুষ জানিয়েছেন, চরমোন্তাজের সঙ্গে আন্ডারচরের সংযোগ স্থাপিত হলে এই এলাকার চিত্রটাই বদলে যেত।

চট্টগ্রামের প্রাচীন দ্বীপ সন্দ্বীপের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলার সময় প্রশ্নটি তারা বারবারই করছিলেন- ‘ক্রসড্যামের দাবি কী চাপা পড়েই থাকবে? দ্বীপ রক্ষায়, এখানকার মানুষের জীবন বাঁচাতে আর সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলতে ক্রসড্যামের দাবি উঠেছে। এক চরের সঙ্গে আরেক চরের বাঁধ দিয়ে পলি জমিয়ে জাগিয়ে তোলা যায় বিপুল পরিমাণ ভুমি, রক্ষা পেতে পারে ভাঙন, পুনর্বাসিত হতে পারে হাজারো মানুষ।

সন্দ্বীপের হারামিয়া এলাকার বাসিন্দা নেয়ামত উল্লাহ বলছিলেন, সন্দ্বীপ-উড়িরচর ক্রসড্যাম বাস্তবায়িত হলে সন্দ্বীপের মানুষ উপকৃত হবে। এ ড্যাম বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে আমরা যেমন আমাদের লালিত স্বপ্নপূরণের দিকে এগোতে পারি, তেমনি এলাকাটি অর্থনৈতিকভাবেও সাবলম্বী হয়ে উঠবে। এর মাধ্যমে দ্বীপের সঙ্গে মূল ভূ-খণ্ডের সংযোগ স্থাপিত হবে। এই সংযোগ বদলে দেবে মানুষের ভাগ্য।

নদীর বুকে জেগে ওঠা চর আবার ভেঙে যাওয়ার দৃশ্য আঙুল তুলে দেখাতে দেখাতে গুপ্তছড়া গ্রামের বাসিন্দা মোতালেব হোসেন বলছিলেন, চর জাগে, আবার সে চর হারিয়ে যায়। আমরা তো যুগ যুগ ধরে এভাবে আছি। নতুন চর আমাদের স্বপ্ন জাগায়, সে স্বপ্ন আবার ভেঙে যায়। ক্রসড্যাম হলে নতুন চরের সম্ভাবনা আরও বেড়ে যাবে। পূরণ হবে এখানকার মানুষের স্বপ্ন।

সূত্র বলছে, বিগত ৬০ বছরে এখানকার ২৪টি ইউনিয়নের মধ্যে আটটিই হারিয়ে নদীতে বিলীন হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে এখানকার মানুষদের মাঝে এখনও আতঙ্ক ছড়ায়। পনেরোটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত সন্দ্বীপ উপজেলায় সাড়ে তিন লাখ লোকের বসবাস। এই দ্বীপ থেকে জেলা সদর চট্টগ্রাম কিংবা অন্যান্য স্থানে যখন ইচ্ছা তখন যাওয়া যায় না। নৌপথই একমাত্র উপায়। নৌপথে চলাচল করতে যেমন হয়রানির শিকার হতে হয়, তেমনি পোহাতে হয় চরম দুর্ভোগ।

এই দুরবস্থা থেকে সন্দ্বীপকে রক্ষা করতেই সন্দ্বীপ-উড়িরচর ক্রসড্যাম নির্মাণের দাবি ওঠে। এ ড্যাম নির্মাণ করা হলে সম্ভাবনাময় এ দ্বীপ শুধু ভাঙন থেকে রক্ষা পাবে না, বিপুল পরিমাণ ভূমিও উদ্ধার হবে। ভাঙন রোধ আর বিপুল পরিমাণ ভূমি উদ্ধারের লক্ষ্য সামনে রেখে প্রস্তাবিত ক্রসড্যাম নির্মাণের কাজ গত চার দশকেও শুরু হয়নি। কবে নাগাদ এ কাজ শুরু হবে কিংবা তা আদৌ হবে কিনা, এ নিয়ে এলাকার মানুষের মধ্যে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে।

চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র বলছে, এই ক্রসড্যাম নির্মাণের জন্য ৬৮৩ কোটি টাকার একটি প্রকল্প ইতোপূর্বে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ দলের জরিপ চলছে। তাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৯৭০ সালে সাধারণ নির্বাচনের প্রচারকালে সন্দ্বীপ সফর করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ওই সময়ই দ্বীপটি রক্ষায় ক্রসড্যাম নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তার অবর্তমানে সেই কাজ সম্পন্ন হয়নি। সেই থেকে ক্রসড্যামের আশায় বুক বাঁধছেন এখানকার মানুষ।

সূত্র বলছে, ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু সরকার ও নেদারল্যান্ডস সরকারের মধ্যে সন্দ্বীপ-নোয়াখালী ক্রসড্যাম নির্মাণের সম্ভাব্যতা সমীক্ষার জন্য একটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী নানা কার্যক্রম শেষে ১৯৮৬ সালে সন্দ্বীপ-উড়িরচর-নোয়াখালী ক্রসড্যাম প্রকল্প বাস্তবায়নের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। ওই সময়ের পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার ৪২নং ক্রমিকে প্রকল্পটি তালিকাভুক্ত হয়। সে অনুযায়ী ১৯৮৮ সালে প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়ে ১৯৯২ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পরবর্তী সরকারগুলোর অনাগ্রহের কারণে এটি আর সফলতার মুখ দেখেনি।

চার দশক পর গত মহাজোট সরকার উড়িরচর-চর ক্লার্ক ক্রসড্যাম নির্মাণে বরাদ্দ দেয়ার খবরে নতুন করে আশা জাগে এখানকার মানুষের মনে। ২০১১ সালের শেষ দিকে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রস্তাবিত ক্রসড্যাম এলাকা পরিদর্শনে যান। এরপর বঙ্গবন্ধুর প্রতিশ্রুত প্রকল্প হিসেবে সরকার এটি বাস্তবায়নের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়। প্রায় ৬৮৩ কোটি টাকা ডিপিপি চূড়ান্ত করে জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ডের বরাদ্দ চেয়ে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এখানেই চাপা পড়ে প্রকল্পের কাজ।

 


পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র বলছে, দক্ষিণের সমুদ্রতীরের ভূমি উদ্ধার, সন্দ্বীপের ভাঙন রোধ এবং দেশের মূল ভূ-খণ্ডের সঙ্গে দ্বীপটিকে যুক্ত করতে ১৯৬৬ সালে সরকার কোম্পানীগঞ্জ থেকে উড়ির চর হয়ে সন্দ্বীপ পর্যন্ত ক্রসড্যাম প্রকল্প গ্রহণ করে। প্রকল্পটি সন্দ্বীপ-নোয়াখালী-উড়িরচর ক্রসড্যাম প্রকল্প নামে পরিচিতি পায়। ওই সময় প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫০২ কোটি টাকা। তবে তখন উড়িরচর অনেক ছোট ছিল। দিনে দিনে পলি জমে জমে উড়িরচর বিশাল চরে পরিণত হয়েছে। কোম্পানীগঞ্জের সঙ্গে সন্দ্বীপের দূরত্বও কমে গেছে। এর ফলে প্রকল্প ব্যয় অনেক কমে যাবে।

এদিকে বিভিন্ন সময় ক্রসড্যাম নিয়ে পরিচালিত সমীক্ষা রিপোর্ট বলছে, এই ক্রসড্যাম নির্মিত হলে নোয়খালী জেলার চর ক্লার্ক, চর এলাহী ও কোম্পানীগঞ্জ এবং চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ-উড়িরচর একত্রিত হবে। ফলে চট্টগ্রাম জেলার উত্তর-পশ্চিম ও নোয়াখালী জেলার দক্ষিণ-পশ্চিম এলাকা পরস্পরের মধ্যে সংযুক্ত হওয়ায় স্থলপথের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের দ্বার খুলে যাবে।

ক্রসড্যামের দাবিতে সোচ্চার নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি উন্নয়নধারা ট্রাস্টের নির্বাহী পরিচালক আমিনুর রসুল বলেন, উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় ক্রসড্যামের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সমুদ্র তীরবর্তী এলাকায় ব্যাপক পরিবর্তন আসবে। কৃষিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সম্ভাবনা বিকশিত হবে। মানুষের জীবনমানের ব্যাপক উন্নয়ন ঘটবে। এর জন্য পর্যাপ্ত অর্থের যেমন প্রয়োজন রয়েছে, তেমনি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সদিচ্ছাও প্রয়োজন। ক্রসড্যামের বেশ কয়েকটি প্রকল্প ফাইলচাপা পড়ে আছে। এগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে।

উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপকালে ক্রসড্যামের বিষয়ে তারা বলেন, এটি উপকূলের অর্থনীতি ও জীবনযাত্রায় ব্যাপক সুপ্রভাব ফেলবে। কিন্তু এজন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ পাওয়া যায় না। তবে উপকূলের উন্নয়নে পানি উন্নয়ন বোর্ড এ ধরণের প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চায়।

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/১১ সেপ্টেম্বর ২০১৭/তারা

Walton Laptop