ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১১ ডিসেম্বর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

ক্যানসারের ঝুঁকি কমানোর উপায় (চতুর্থ পর্ব)

এস এম গল্প ইকবাল : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-১১-২৭ ৮:১৮:৪৩ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-১১-২৮ ৮:১৮:০২ এএম
প্রতীকী ছবি

এস এম গল্প ইকবাল : ক্যানসার একটি প্রাণঘাতী রোগ। সারা বিশ্বে রোগে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে, ক্যানসার। আমাদের ভুল জীবনযাপন, খাবার সম্পর্কে অসচেতনতা ও স্বাস্থ্যের প্রতি অবহেলা ক্যানসারের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে।

ক্যানসারের ঝুঁকি কমানোর ৩৬টি উপায় নিয়ে চার পর্বের প্রতিবেদনের আজ থাকছে শেষ পর্ব।

* বেশি সাপ্লিমেন্ট সেবন করবেন না
ভিটামিন ডি এবং ভিটামিন সি ক্যানসারের ঝুঁকি হ্রাস করতে পারে, তাই বলে ক্যানসার প্রতিরোধ করতে প্রতিদিন অনেগুলো ভিটামিন পিল সেবন করবেন না। কারণ সাপ্লিমেন্টের বিষয়টি জটিল, অত্যধিত সাপ্লিমেন্ট সেবনে ক্যানসার বিকশিত হতে পারে। আলবার্ট আইনস্টাইন কলেজ অব মেডিসিন/মন্টেফিয়োর হেলথ সিস্টেমের সিনিয়র এপিডেমিওলজিস্ট ডা. জিওফ্রে কাবাট বলেন, ‘এমন কোনো প্রমাণ নেই যে ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট ক্যানসারের ঝুঁকি হ্রাস করে। কিন্তু কিছু প্রমাণ রয়েছে যে ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট কিছু ক্যানসারের ঝুঁকি বৃদ্ধি করতে পারে।’ সর্বোত্তম উপদেশ? খাবার থেকে পুষ্টি গ্রহণ করুন, সাপ্লিমেন্ট থেকে নয়। ইউনিভার্সিটি অব পিটসবার্গ মেডিক্যাল সেন্টারের অনকোলজিস্ট এবং ক্যানসার সেন্টারের ওয়েলনেস অ্যান্ড ইন্টেগ্রেটিভ প্রোগ্রামের পরিচালক ডা. লেনি ফ্রান্সিস বলেন, ‘যদি আপনি সুষম খাবার খান, তাহলে অধিকাংশ প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও মিনারেল পাবেন।’

* সেলফোন কম ব্যবহার করুন
সেলফোনের রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি এনার্জি আসলেই ক্যানসার সৃষ্টি করতে পারে কিনা তা নির্ণয় করতে এখনো গবেষণা অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ক্যানসার ইনস্টিটিউট অনুসারে, অধিকাংশ বড় গবেষণায় এই দুইয়ের মধ্যে সংযোগ পাওয়া যায়নি, কিন্তু কিছু ছোট গবেষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে অত্যধিক সেলফোনের ব্যবহারে ক্যানসারের ঝুঁকি বৃদ্ধি পেতে পারে। এ কারণে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যানসার (আইএআরসি) সেলফোনকে মানুষের জন্য সম্ভাব্য কার্সিনোজেন (ক্যানসার সৃষ্টিকারী পদার্থ) হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। এ সম্পর্কে স্পষ্টভাবে বোধগম্য না হওয়া পর্যন্ত লোকজন স্পিকারের মাধ্যমে কথা বলে অথবা ব্লুটুথ বা ইয়ার বাডের মতো ইয়ারপিস ব্যবহার করে সেলফোন এক্সপোজার কমাতে পারে।

* ভ্যাপিং এড়িয়ে চলুন
ধূমপান ক্যানসার সৃষ্টি করে তা কে না জানে? কিন্তু আপনি হয়তো এখনো জানেন না যে ভ্যাপিং বা ই-সিগারেটও ক্যানসারের কারণ হতে পারে। পোর্টল্যান্ড স্টেট ইউনিভার্সিটির একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় পাওয়া গেছে, ই-সিগারেটে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় ক্যানসার-সৃষ্টিকারী কেমিক্যাল বেনজিন থাকে। অন্যান্য গবেষণায় ফরমালডিহাইডও পাওয়া গেছে। ইউনিভার্সিটি অব পিটসবার্গ মেডিক্যাল সেন্টারের ক্যানসার সেন্টারের সভাপতি ডা. স্ট্যানলি মার্কস বলেন, ‘স্বাস্থ্যের ওপর ভ্যাপিংয়ের প্রভাব ধূমপানের প্রায় অনুরূপ।’

* চুলে নিরাপদে রং করুন
ফিনল্যান্ডের একটি অ্যানালাইসিসে পাওয়া যায় যে, যেসব নারী চুলে রং করেছিল তাদের স্তন ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি ২৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল। এই অ্যানালাইসিস বলছে যে, হেয়ার ডাইয়ের কেমিক্যাল নিরাপদ নয়। ইউটিহেলথ অ্যান্ড মেমোরিয়াল হারম্যানের অন্তর্ভুক্ত ম্যাকগভার্ন মেডিক্যাল স্কুলের গাইনিকোলজিক অনকোলজির সহযোগী অধ্যাপক ডা. কনসেপসিয়ন ডায়াজ-অ্যারেস্টিয়া বলেন, ‘কিছু হেয়ার ডাই (বিশেষ করে সেমি-পারমানেন্ট ও পারমানেন্ট) চুলের গ্রন্থিকোষে প্রবেশ করে। কিছু হেয়ার ডাইয়ে অ্যারোমেটিক অ্যামাইন হিসেবে শ্রেণীভুক্ত কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়, যা ল্যাবরেটরির প্রাণীদের জন্য কার্সিনোজেনিক। উদ্ভিজ্জ হেয়ার ডাই তুলনামূলক ভালো অপশন হতে পারে।’

* এইচপিভি ভ্যাকসিন নিন
যদিও এইচপিভি ভ্যাকসিনের নিরাপত্তা নিয়ে অনেক তর্ক রয়েছে, কিন্তু বৈজ্ঞানিক প্রমাণ বলছে যে এটি সার্ভিক্যাল ক্যানসারের বিরুদ্ধে কার্যকর ও নিরাপদ। ডা. ডায়াজ-অ্যারেস্টিয়া বলেন, ‘নতুন ৯ভি গার্ডেসিল এইচপিভি ভ্যাকসিন সার্ভিক্যাল ক্যানসারের ঝুঁকি বিস্ময়করভাবে ৯০ শতাংশ কমিয়ে ফেলে। এর মানে হচ্ছে যদি ১১ থেকে ১৪ বছর বয়সের ছেলে ও মেয়েকে এই ভ্যাকসিন দেওয়া হয়, তাহলে বার্ষিক ১০,০০০ সার্ভিক্যাল ক্যানসারের ঘটনা কমে ১,০০০-এ এসে দাঁড়াবে। বিশ্বে ২০০,০০০ নারীর জীবন রক্ষা পাবে।’ তিনি যোগ করেন, ‘নারীদের প্যাপ স্ক্রিনিং এবং এইচপিভি টেস্ট করাও উচিৎ। কিন্তু বয়সের ওপর ভিত্তি করে এটি তিন থেকে চার বছর পরপর করা প্রয়োজন।’ এইচপিভি১৬ এইচপিভি ভ্যাকসিন সাধারণত ২৬ বছর বয়স পর্যন্ত সুপারিশকৃত। ডা. বার্ক বলেন, ‘যাদের বয়স ২৬ এর বেশি তারাও এই ভ্যাকসিন নিতে পারেন। ২৬ বছর বয়সের পরও এই ভ্যাকসিন গ্রহণে কার্যকারিতা পাওয়া যায়। তাই এইচপিভি এক্সপোজারের ঝুঁকি কমাতে ছাব্বিশোর্ধ্ব লোকেরাও এই ভ্যাকসিন গ্রহণ করতে পারেন।’ এই ভ্যাকসিন নেওয়ার পূর্বে আপনার চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন।

* বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ান
প্রত্যেক নারীরই ব্যক্তিগত পছন্দ রয়েছে যে তিনি কিভাবে তার বাচ্চাকে খাওয়াবেন, কিন্তু বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ানোর একটি উপকারিতা হচ্ছে- এটি স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি কমায়। ডা. ডায়াজ-অ্যারেস্টিয়া বলেন, ‘বাচ্চাকে এক থেকে দেড় বছর স্তন্য পান করানো স্তন ক্যানসারোর ঝুঁকি সামান্য হ্রাস করে। এই মেকানিজম এখনো স্পষ্টভাবে বোধগম্য নয়, তবে ধারণা করা হয় যে এটি নারীদের মাসিক চক্র অথবা ডিম্বস্ফোটনের সংখ্যা হ্রাস করে।’ কম মাসিক চক্রের মানে হচ্ছে হরমোন কম উৎপাদন হওয়া, যা ক্যানসারের ঝুঁকি হ্রাস করে। গবেষণায় পাওয়া গেছে যে, স্তন্যপান করানো স্তনের কোষকে পরিবর্তন করে, যা ক্যানসারের প্রবণতা হ্রাস করে।

* ম্যামোগ্রাম করুন
ম্যামোগ্রাম কোনো হালকা বিষয় নয়, এর গুরুত্ব রয়েছে। কতদিন পরপর ম্যামোগ্রাম করতে হবে তা সম্পর্কে কিছু সংস্থার ভিন্ন ভিন্ন সুপারিশ রয়েছে। ডা. ডায়াজ-অ্যারেস্ট্রিয়া বলেন, ‘ক্যানসার প্রতিরোধের জন্য বয়স ৪০ হলেই বার্ষিক ম্যামোগ্রাম করা উচিত। ম্যামোগ্রাফির মাধ্যমে স্তন ক্যানসার স্ক্রিনিং স্তন ক্যানসারকে খুব প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করে জীবন রক্ষা করতে পারে। ক্যানসার যত তাড়াতাড়ি শনাক্ত করা যাবে (লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার পূর্বে), ক্যানসার ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তত কমানো যাবে এবং অধিক কার্যকর চিকিৎসা করা যাবে।’ যদি আপনার পরিবারের কারোর মধ্যে স্তন ক্যানসার থাকে, তাহলে আপনার চিকিৎসক আপনাকে আরো আগে ম্যামোগ্রাম করতে পরামর্শ দিতে পারেন। আমেরিকান ক্যানসার সোসাইটির পরামর্শ হচ্ছে, রিস্ক ফ্যাক্টর ও ঘন স্তন টিস্যু আছে এমন নারীদের প্রতিবছর এমআরআই করা উচিত, কারণ তাদের ক্ষেত্রে ম্যামোগ্রাম দিয়ে ক্যানসার শনাক্ত কঠিন হতে পারে। আপনার ম্যামোগ্রামের জন্য সর্বোত্তম সময় জানতে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন।

* হরমোন সম্পর্কে সতর্ক থাকুন
যেহেতু হরমোন (যেমন- ইস্ট্রোজেন ও প্রজেস্টরন) আপনার ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে, তাই বার্থ কন্ট্রোল পিল, হরমোনাল আইইউডি অথবা হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি (এইচআরটি) শুরু করার পূর্বে এসবের সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনা করা উচিত। ডা. ডায়াজ-অ্যারেস্ট্রিয়া বলেন, ‘যেসব নারী বার্থ কন্ট্রোল পিল গ্রহণ করেন, তাদের স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি সামান্য বৃদ্ধি পায়, কিন্তু এটি সেবন বন্ধ করে দিলে এই ঝুঁকি স্বাভাবিক ঝুঁকিতে চলে আসে।’ কিন্তু গবেষণায় এটাও পাওয়া যায় যে, এই পিল এন্ডোমেট্রিয়াল ক্যানসার ও ওভারিয়ান ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে পারে। সাম্প্রতিক গবেষণা অনুসারে, মিরেনার মতো হরমোনাল আইইউডি স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। ডা. ডায়াজ-অ্যারেস্ট্রিয়া বলেন, ‘কিছু আইইউডিতে প্রজেস্টিন (মানুষের তৈরিকৃত প্রজেস্টেরন) থাকে। খুব অল্প পরিমাণ প্রজেস্টিন জরায়ুতে নির্গত হয়ে সারা শরীরে পরিবাহিত হয় এবং স্তন টিস্যুতে পৌঁছে।’ মেনোপজের পর হরমোন থেরাপি অথবা হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি কিছু ক্যানসারের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে, কিন্তু অন্যান্য ক্যানসারের ঝুঁকি কমায়। ডা. কাবাট বলেন, ‘স্তন ক্যানসার অথবা এন্ডোমেট্রিয়াল ক্যানসারের ওপর বিভিন্ন হরমোন থেরাপির (শুধু ইস্ট্রোজেন অথবা ইস্ট্রোজেন ও প্রজেস্টিন উভয়) ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া রয়েছে।’ আপনার জন্য কোন হরমোন অপশন সর্বোত্তম তা জানতে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।

তথ্যসূত্র : রিডার্স ডাইজেস্ট

পড়ুন : * ক্যানসারের ঝুঁকি কমানোর উপায় (প্রথম পর্ব)
* ক্যানসারের ঝুঁকি কমানোর উপায় (দ্বিতীয় পর্ব)
* ক্যানসারের ঝুঁকি কমানোর উপায় (তৃতীয় পর্ব)



রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৭ নভেম্বর ২০১৮/ফিরোজ

Walton Laptop
 
     
Marcel
Walton AC