আধুনিক বাংলা কবিতার বরপুত্রকে শ্রদ্ধাঞ্জলি
শাহ মতিন টিপু || রাইজিংবিডি.কম
শামসুর রাহমান
শাহ মতিন টিপু : আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি শামসুর রাহমানের অষ্টম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০০৬ সালের এই দিনে কিংবদন্তি কবি শামসুর রাহমান চলে যান না-ফেরার দেশে। তার স্মৃতির প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা। তিনি ছিলেন আধুনিক বাংলা কবিতার শক্তিমান কবি। তিনি কবিতাকে একালে জনপ্রিয় করে তোলেন। তাকে বলা হয়, আধুনিক বাংলা কবিতার ‘বরপুত্র’।
শামসুর রাহমানকে বিংশ শতাব্দীর তিরিশের দশকে পাঁচ মহান কবির পর (জীবনানন্দ দাস, বুদ্ধদেব বসু, সুধীন্দ্রনাধ দত্ত, অমীয় চক্রবর্তী এবং বিষ্ণু দে) আধুনিক বাংলা কবিতার প্রধান পুরুষ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মৃত্যুর পর এই ৮ বছরেও মানুষের মনে তার সমপর্যায়ের আসনটি কেউ দখল নিতে পারেনি। মৃত্যুর পরেও শামসুর রাহমান বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কবি।
শামসুর রাহমানের কবি প্রতিভা কতখানি তা অনুমানে ‘স্বাধীনতা তুমি’ এই একটি কবিতাই যথেষ্ট। স্বাধীনতা তুমি / রবিঠাকুরের অজর কবিতা, অবিনাশী গান।/ স্বাধীনতা তুমি/ কাজী নজরুল ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো / মহান পুরুষ, সৃষ্টিসুখের উল্লাসে কাঁপা- / স্বাধীনতা তুমি / শহীদ মিনারে অমর একুশে ফেব্রুয়ারির উজ্জ্বল সভা / স্বাধীনতা তুমি / পতাকা-শোভিত শ্লোগান-মুখর ঝাঁঝালো মিছিল।.. কবিতার প্রতি লাইনে লাইনে প্রাণে যে ঝংকার তোলে তার অন্য কোন তুলনা হয় না।
শামসুর রাহমান কেবল বাংলাদেশের প্রধান কবিই নন, তাকে স্বাধীনতার কবি, নাগরিক কবি, মুক্তিযুদ্ধের কবি, এমনই আরও নানাভূষণে অভিহিত করা যায়। বহুমাত্রিক লেখক হুমায়ুন আজাদ শামসুর রাহমানকে আখ্যা দিয়েছিলেন ‘নি:সঙ্গ শেরপা’ বলে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালেই শামসুর রাহমানের কবি খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। আধুনিক কবিতার সাথে তার পরিচয় ও আন্তর্জাতিক-আধুনিক চেতনার উন্মেষ ঘটে ১৯৪৯ সালে। এ সময় তার প্রথম কবিতা মুদ্রিত হয় সাপ্তাহিক সোনার বাংলা পত্রিকায়। প্রথম কাব্য গ্রন্থ প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে প্রকাশিত হয় ১৯৬০ সালে। তার লেখা ‘বর্ণমালা, আমার দুখিনী বর্ণমালা’, ‘আসাদের শার্ট ’, ‘স্বাধীনতা তুমি’, ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা’, এসব কবিতার মধ্যে তার বিদ্রোহী চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটে।
কবি শামসুর রাহমান পেশায় সাংবাদিক ছিলেন। সাংবাদিক হিসেবে ১৯৫৭ সালে কর্মজীবন শুরু করেন দৈনিক মর্ণিং নিউজ-এ। ১৯৫৭ সাল থেকে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত রেডিও পাকিস্তানের অনুষ্ঠান প্রযোজক ছিলেন। এরপর তিনি আবার ফিরে আসেন তার পুরানো কর্মস্থল দৈনিক মর্ণিং নিউজ-এ। তিনি সেখানে ১৯৬০ সাল থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত সহযোগী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৬৪ থেকে শুরু করে ১৯৭৭ এর জানুয়ারি পর্যন্ত ‘দৈনিক পাকিস্তান’ এর সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন (স্বাধীনতা উত্তর দৈনিক বাংলা)। ১৯৭৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি দৈনিক বাংলা ও সাপ্তাহিক বিচিত্রার সম্পাদক নিযুক্ত হন। ১৯৮৭ তে সামরিক সরকারের শাসনামলে তাকে পদত্যাগ বাধ্য করা হয়। পরে তিনি ‘অধুনা’ নামে মাসিক সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।
জন্ম ১৯২৯ সালের ২৩ অক্টোবর ঢাকার মাহুতটুলিতে নানাবাড়িতে। পৈতৃক বাড়ি নরসিংদী জেলার রায়পুরায় পাড়াতলী গ্রামে। বাবা মুখলেসুর রহমান চৌধুরী ও মা আমেনা বেগম। ১৩ ভাই বোনের মধ্যে শামসুর রাহমান ৪র্থ। কবির জীবনের পুরোটা সময় কেটেছে ঢাকা শহরে। শৈশব, বেড়ে ওঠা, পড়াশোনা এ ঢাকাতেই।
আমৃত্যু অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও জনমানুষের প্রতি অপরিসীম দরদ ছিল তার চেতনায় প্রবাহমান। শামসুর রাহমানের বিরুদ্ধে বারবার বিতর্ক তুলেছে কূপমন্ডুক মৌলবাদীরা। তাকে হত্যার জন্য বাসায় হামলা করেছে। এতকিছুর পরও কবি তার বিশ্বাসের জায়াগায় ছিলেন অনড়। ২০০৬ সালের ১৭ আগষ্ট বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। শেষ ইচ্ছানুযায়ী ঢাকাস্থ বনানী কবরস্থানে মায়ের কবরে তাকে সমাধিস্থ করা হয়।
প্রকাশিত কাব্য: প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে (১৯৬০), রৌদ্র করোটিতে (১৯৬৩), বিধ্বস্ত নিলীমা (১৯৬৭), নিরালোকে দিব্যরথ (১৯৬৮), নিজ বাসভূমে (১৯৭০), বন্দী শিবির থেকে (১৯৭২), দুঃসময়ে মুখোমুখি (১৯৭৩), ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাটা (১৯৭৪), আদিগন্ত নগ্ন পদধ্বনি (১৯৭৪), এক ধরনের অহংকার (১৯৭৫), আমি অনাহারী (১৯৭৬), শূন্যতায় তুমি শোকসভা (১৯৭৭), বাংলাদেশ স্বপ্ন দেখে (১৯৭৭), প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে (১৯৭৮), ইকারুসের আকাশ (১৯৮২), মাতাল ঋত্বিক (১৯৮২), উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে (১৯৮৩), কবিতার সঙ্গে গেরস্থালি (১৯৮৩), নায়কের ছায়া (১৯৮৩), আমার কোন তাড়া নেই (১৯৮৪), যে অন্ধ সুন্দরী কাঁদে (১৯৮৪), অস্ত্রে আমার বিশ্বাস নেই (১৯৮৫), হোমারের স্বপ্নময় হাত (১৯৮৫), শিরোনাম মনে পড়ে না (১৯৮৫), ইচ্ছে হয় একটু দাঁড়াই (১৯৮৫), ধুলায় গড়ায় শিরস্ত্রাণ (১৯৮৫), এক ফোঁটা কেমন অনল (১৯৮৬), টেবিলে আপেলগুলো হেসে উঠে (১৯৮৬), দেশদ্রোহী হতে ইচ্ছে করে (১৯৮৬), অবিরল জলভ্রমি (১৯৮৬), আমরা ক`জন সঙ্গী (১৯৮৬), ঝর্ণা আমার আঙুলে (১৯৮৭), স্বপ্নেরা ডুকরে উঠে বারবার (১৯৮৭), খুব বেশি ভালো থাকতে নেই (১৯৮৭), মঞ্চের মাঝখানে (১৯৮৮), বুক তার বাংলাদেশের হৃদয় (১৯৮৮), হৃদয়ে আমার পৃথিবীর আলো (১৯৮৯), সে এক পরবাসে (১৯৯০), গৃহযুদ্ধের আগে (১৯৯০), খন্ডিত গৌরব (১৯৯২), ধ্বংসের কিনারে বসে (১৯৯২), হরিণের হাড় (১৯৯৩), আকাশ আসবে নেমে (১৯৯৪), উজাড় বাগানে (১৯৯৫), এসো কোকিল এসো স্বর্ণচাঁপা (১৯৯৫), মানব হৃদয়ে নৈবদ্য সাজাই (১৯৯৬), তুমিই নিঃশ্বাস তুমিই হৃৎস্পন্দন (১৯৯৬), তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি (১৯৯৭), হেমন্ত সন্ধ্যায় কিছুকাল (১৯৯৭), ছায়াগণের সঙ্গে কিছুক্ষণ (১৯৯৭), মেঘলোকে মনোজ নিবাস (১৯৯৮), সৌন্দর্য আমার ঘরে (১৯৯৮), রূপের প্রবালে দগ্ধ সন্ধ্যা রাতে (১৯৯৮), টুকরা কিছু সংলাপের সাঁকো (১৯৯৮), স্বপ্নে ও দুঃস্বপ্নে বেঁচে আছি (১৯৯৯), নক্ষত্র বাজাতে বাজাতে (২০০০), শুনি হৃদয়ের ধ্বনি (২০০০), হৃদপদ্মে জ্যোৎস্না দোলে (২০০১), ভগ্নস্তুপে গোলাপের হাসি (২০০২), ভাঙাচোরা চাঁদ মুখ কালো করে ধুকছে (২০০৩), গন্তব্য নাই বা থাকুক (২০০৪), কৃষ্ণপক্ষে পূর্ণিমার দিকে (২০০৪), গোরস্থানে কোকিলের করুণ আহবান (২০০৫), অন্ধকার থেকে আলোয় (২০০৬) এবং না বাস্তব না দুঃস্বপ্ন (২০০৬)।
শিশু সাহিত্য : এলাটিং বেলাটিং (১৯৭৪), ধান ভানলে কুঁরো দেব (১৯৭৭), গোলাপ ফোঁটে খুকীর হাতে (১৯৭৭), স্মৃতির শহর (১৯৭৯), রংধনুর সাঁকো (১৯৯৪), লাল ফুলকির ছড়া (১৯৯৫), নয়নার জন্য (১৯৯৭), আমের কুঁড়ি জামের কুঁড়ি (২০০৪) এবং নয়নার জন্য গোলাপ (২০০৫)।
উপন্যাস : অক্টোপাশ (১৯৮৩), অদ্ভুত আঁধার এক (১৯৮৫), নিয়ত মন্তাজ (১৯৮৫) এবং এলো সে অবেলায় (১৯৯৪)।
স্মৃতিচারণ : স্মৃতির শহর (১৯৭৯) এবং কালের ধুলোয় লেখা (২০০৪)।
অনুবাদ কবিতা : ফ্রস্টের কবিতা (১৯৬৬), রবার্ট ফ্রস্টের নির্বাচিত কবিতা (১৯৬৮) এবং খাজা ফরিদের কবিতা (১৯৬৮)।
অনুবাদ নাটক : হৃদয়ের ঋতু (মূল: টেনেসি উইলিয়মস), মার্কোমিলিয়ান্স্ (মূল: ইউজিন ও`নীল; ১৯৬৭) এবং হ্যামলেট (মূল: উইলিয়ম শেক্সপিয়র; ১৯৯৫)।
প্রবন্ধ : আমৃত্যু তাঁর জীবনানন্দ (১৯৮৬), শামসুর রাহমানের প্রবন্ধ (২০০১) এবং কবিতা এক ধরনের আশ্রয় (২০০২)।
সাহিত্যে অনন্য অবদানের জন্য তিনি অসংখ্য সম্মানা ও পুরস্কার অর্জন করেন। এ সবের মধ্যে রয়েছে আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, বাংলা একাডেমী পুরস্কার, একুশে পদক, নাসির উদ্দন স্বর্ণপদক, জীবনানন্দ পুরস্কার, আবুল মনসুর আহমেদ স্মৃতি পুরস্কার, সাংবাদিকতার জন্য মিতসুবিসি পুরস্কার, স্বাধীনতা পদক ও আনন্দ পুরষ্কার লাভ করেন। এছাড়াও ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় এবং রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়-এর পক্ষ থেকে কবিকে সম্মান সূচক ডি. লিট উপাধি দেয়া হয়।
রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৭ আগস্ট ২০১৪/টিপু
রাইজিংবিডি.কম
হাম রোগীর জন্য আলাদা ওয়ার্ড বাধ্যতামূলক: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর