RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     রোববার   ২৫ অক্টোবর ২০২০ ||  কার্তিক ১০ ১৪২৭ ||  ০৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

‘আমার সবচেয়ে আদি প্রেম কবিতা’

হারুন পাশা || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৯:৪৮, ৪ মার্চ ২০২০   আপডেট: ১৬:৩০, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০
‘আমার সবচেয়ে আদি প্রেম কবিতা’

আনিসুল হক পাঠকপ্রিয় কথাসাহিত্যিক, কবি, নাট্যকার ও সাংবাদিক। সাহিত্যের সব শাখাতেই অসামান্য অবদান রেখে চলেছেন। সাংবাদিকতার পাশাপাশি টেলিভিশন নাটকেও এনেছেন নতুন প্রাণের আবাহন। তাঁর কথাসাহিত্য বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। যদিও তিনি কবি হতে চেয়েছিলেন এবং এখনও কাব্যলক্ষ্মীর প্রতিই তার প্রগাঢ় প্রেম। আজ আনিসুল হকের জন্মদিন। এই কথাসাহিত্যিকের জন্মদিনে হারুন পাশার নেয়া সাক্ষাৎকারটি রাইজিংবিডির পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো।

হারুন পাশা : আপনি কবি হতে চেয়েছিলেন। বলেছেন ‘কবিতা প্রকাশের সুযোগ তৈরির জন্যই সাংবাদিকতায় আসা’। সুতরাং কবিতা দিয়েই শুরু করছি এই কথোপকথন। জানতে চাই- কবিতায় কোন বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়েছেন?

আনিসুল হক : গদ্য লিখিত হলেও কীভাবে কবিতা হয়- এটা ছিল আমার প্রধান অন্বিষ্ট। তখন আমি সুকান্ত পড়েছি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যে গদ্য কবিতা; যেমন: ক্যামেলিয়া, বাঁশি, ‘পুনশ্চ’ গ্রন্থের মাঝে যে গদ্য কবিতা সেগুলো পড়ে আমার কৌতূহল হলো। তিনি লিখেছেন প্রায় কাহিনির মতো করে, এগুলোকে আবার ‘কবিতা’ বলছেন কেন? তখন আমি কবিতা কী? ছন্দ কী? এগুলো বোঝার চেষ্টা করলাম। কিন্তু মোটের উপর আমি কবিতা লিখেছি নারীচিত্ত জয়ের বাসনা থেকে। আমরা বড় হয়েছি নারী বিবর্জিত পৃথিবীতে। নারীর কাছে পৌঁছানোর কোনো উপায় ছিল না কবিতা ছাড়া। আমি আসলে কবিতা লিখেছি সতের-আঠার বছর বয়সে। কলেজে সহপাঠী হিসেবে আমাদের ক্লাসে কোনো নারী ছিল না। তাই দূরবর্তী নারীকে কল্পনা করে তার উদ্দেশ্যে কবিতা ছিল প্রেমবার্তা। এ কারণে আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থের নাম ‘খোলা চিঠি সুন্দরীর কাছে’। বলাবাহুল্য কবিতার বিষয় ছিল প্রেম। আরেকটা বিষয় রাজনীতি। আমরা তখন সবাই গণতান্ত্রিক আন্দোলন করতাম। এরশাদবিরোধী মিছিল-মিটিং করতাম বুয়েটে পড়ার সময়। প্রেম এবং দ্রোহ ছিল মূল বিষয়। খুবই কমন বিষয়।

হারুন পাশা :  কথাসাহিত্যে যাত্রা কীভাবে?

আনিসুল হক : ১৯৮৭ সালে আমাদের বড় ভাই মোজাম্মেল বাবু বুয়েটে দুই বছরের সিনিয়র; তিনি একটা পত্রিকা করলেন ‘সাপ্তাহিক দেশবন্ধু’। সেখানে লিখতে শুরু করলাম। পরে ১৯৮৯ সালে আমরা আরেকটা পত্রিকা বের করলাম ‘সাপ্তাহিক পূর্বাভাষ’। কাগজে যেহেতু আমরা কাজ করি। মনে হলো, তাহলে তো আমাদের লেখা উচিত। তখন আমি ‘গদ্য কার্টুন’ নামে একটা কলাম লিখতে শুরু করি। এটা জনপ্রিয় হয়। এর মধ্যে আমার দুটো কবিতার বই বেরুলে তৃতীয় বই বের করি ‘গদ্য কার্টুন’ নামে। সেটাও জনপ্রিয় হয়। প্রকাশক তখন আমাকে চাপ দিতে থাকে- আপনি উপন্যাস লেখেন। কারণ আপনার বই বিক্রি হয়। তখন আমি একটা উপন্যাস লিখতে শুরু করি ‘অন্ধকারের একশত বছর’। সেটাও বিক্রি হয়ে গেল। এরপর প্রকাশকদের চাপ আরো বেড়ে গেল। তারা চাপ দিয়ে দিয়ে আমার কাছ থেকে গল্প-উপন্যাস লিখিয়ে নিলেন।

হারুন পাশা : ‘গদ্য কার্টুন’ তো এখনও লিখছেন।

আনিসুল হক : সেই যে শুরু করেছিলাম ১৯৮৯ সালে, এখনও লিখছি। প্রায় ৩১-৩২ বছর হলো। প্রায় প্রতি সপ্তাহে লিখতে হয়।

হারুন পাশা : এতো দীর্ঘ সময় ধরে লিখছেন। শুরুর সময় বা এখন বিষয়টি আপনাকে কীভাবে আন্দোলিত করে?

আনিসুল হক : বয়স কম থাকায় তখন আমার ঝুঁকি নেয়ার সাহস ছিল। তখন একটা লেখার পরিণতি কী দাঁড়াবে এ নিয়ে চিন্তা ছিল না। আর কাগজটা ছিল ছোট। এখন তো একটা বড় কাগজে কাজ করি। এর সার্কুলেশন ভয়াবহ বেশি। এখন একটা কিছু যদি এদিক-সেদিক হয়ে যায় তাহলে সাংঘাতিক প্রতিক্রিয়া হয়। তখন ছোট কাগজের স্বভাবই ছিল বিদ্রোহ করা। ফলে আমি প্রচুর প্রাপ্তবয়স্কদের জিনিস আমার লেখায় ব্যবহার করতাম। সেসময় সুবিমল মিশ্র নামে একজন প্রথাবিরোধী লেখক ছিলেন। তাঁর লেখা পড়তাম। তিনি লেখায় যৌন অনুষঙ্গগুলো অবলীলায় ব্যবহার করতেন। আমিও প্রচুর ব্যবহার করতাম। রাজনৈতিক প্রশ্নেও খুব উচ্চকিত ছিলাম এবং নিষ্ঠুরভাবে আক্রমণ করতাম। আমি মনে করি, কোনো কোনো সময় বাড়াবাড়ি রকমের কাজ করেছি। যার জন্য এখন আমি পস্তাই, আমার এটা করা উচিত হয়নি। এছাড়াও এখন আমার বয়স হয়েছে। ছোটবেলায় যে লেখাগুলো নিয়ে গৌরববোধ করতাম এখন লজ্জা পাচ্ছি। এর দ্বারা বোঝা যাচ্ছে এখন আমি অনেক সাবধান হয়েছি। অনেক বেশি ভীরু হয়েছি। কোনো কিছু লেখা হলে আমাকে তিনবার করে ভাবতে হয়- প্রকাশযোগ্য কি না? আমার আরও একটা সমস্যা হচ্ছে- আমার লেখা ছোটরা পড়ে। ফলে লেখার সময় আমাকে সচেতন থাকতে হয়।

হারুন পাশা : এখন তরুণরা বিসিএস ক্যাডার হতে চায়। আপনি নিজেও বিসিএস ক্যাডার ছিলেন। সরকারি চাকরি করেছেন, পরে ছেড়ে দিলেন। সেই সময় ক্যাডার এবং বর্তমান সময়ের ক্যাডারদের সুযোগ-সুবিধা বা অন্য দিকগুলো কেমন আপনার দৃষ্টিতে?

আনিসুল হক : এটা আমি প্রথম দিকে বুঝতে পারিনি। আমাদের সময় যেটা ছিল- বেতন কম। বাইরে তো আমরা বেশি বেতন পাই। এছাড়া এর বাইরে ব্যবসা করে তার দ্রুত বড়লোক হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কেউ যদি শিক্ষকতা করেন তিনি অনেক বেশি শ্রদ্ধেয় হবেন। কেউ যদি গবেষক হন সমাজে তার কন্ট্রিবিউট করার ক্ষমতা থাকবে অনেক বেশি। কেউ যদি বিদেশে গিয়ে গবেষণা করতে পারেন, তিনি পুরো মানব সভ্যতাকেই ঋদ্ধ করতে পারবেন। তা না করে এ বছর বাংলাদেশে চার লাখের বেশি ছেলেমেয়ে বিসিএস দেওয়ার চেষ্টা করছে। মাত্র দুই হাজার পদের জন্য এতজন! বাকি তিন লাখ আটানব্বই হাজার সুযোগই পাবে না। বিষয়টা তাদের মাথায় থাকা উচিত। পরে শুনলাম সরকারি চাকরি এখন আকর্ষণীয় হয়ে গেছে। বেতনও বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া গাড়ি-বাড়ি পাওয়া যায়। একটা নিশ্চিত ভবিষ্যৎ। আমাদের সময়  ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবি নাই। আমি ১৯৮৯ সালে পাস করে বের হই। আশির দশকে আমরা সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছি। আমাদের সব ছাত্র নেতারাই সরকার-বিরোধীতা করতে পছন্দ করত। সরকারি দল করাটা তখন ছিল না। একজন-দুজন যারা ছাত্র সমাজ করত তারা ক্যাম্পাসে ঢুকতে পারত না। আমাদের নিয়ম ছিল প্রতিষ্ঠান-বিরোধীতা করা। এখনকার নিয়ম হচ্ছে কীভাবে প্রতিষ্ঠানে ঢুকে পড়া যায়। আমরা এখন আর কাউকে বোঝাতে পারব না- যারা বুয়েটে পড়তাম তারা পাস করে কী করব- এ নিয়ে দুর্ভাবনায় ছিলাম না। কিছু একটা হবেই। নিজের জীবনের চাইতে সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে আমাদের বেশি ভাবনা ছিল।

হারুন পাশা :  সাহিত্যের অতীত ঘাটলে দেখা যায় লেখকরা শিক্ষকতা এবং সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে আরামবোধ করতেন। আপনি কী সাংবাদিকতাকে এনজয় করছেন?

আনিসুল হক : পশ্চিমবঙ্গেও দেখি যে লেখকরা সাংবাদিকতার সাথে যুক্ত থাকেন। সংবাদপত্রের সাথে যুক্ত থাকেন। অথবা শিক্ষকতার সাথে যুক্ত থাকেন। এটা সাধারণভাবে সত্য। যদিও বঙ্কিমচন্দ্র ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। এরকম আরও পাওয়া যাবে যারা আমলা ছিলেন। আমাদের এখানেও আছে। অন্নদাশঙ্কর রায়, হাসনাত আবদুল হাই, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ এঁদের নাম নেওয়া যাবেই। কিন্তু আমার সাংবাদিকতা আমি এনজয় করি। সাংবাদিকতায় নতুন নতুন বুদ্ধি বের করার চেষ্টা করেছি। আমি যখন ‘ভোরের কাগজ’-এ ছিলাম তখন ‘মেলা’ নামে একটি পাতা তৈরি করি। ‘অবসর’ নামে একটা ম্যাগাজিন তৈরি করি। যখন ‘প্রথম আলো’-তে এসেছি, তখন ফিচার পাতাগুলো, যেমন: ছুটির দিনে, আনন্দ, নকশা এগুলো বের করার পেছনে আমার অংশগ্রহণ ছিল। ঐ মাথার কাজগুলো, আইডিয়ার সঙ্গে আমি যুক্ত ছিলাম। ফলে এই কাজটা আমি খুব আনন্দের সঙ্গে করি। যখন নতুন কিছু করি সেটা ভালো লাগে। কিন্তু টানাপোড়েন মাথার ভেতর রয়ে গেছে। আমি লেখক হতে চেয়েছি, কবি হতে চেয়েছি নাকি সাংবাদিক হতে চেয়েছি- এখনও আমি আফশোস করি। আমার জীবনের একটা অনুশোচনা আছে- আমি যদি পূর্ণকালীন লেখক হতাম তাহলে ভালো লেখক হতে পারতাম। অথবা আমি যদি পূর্ণকালীন সাংবাদিক হতাম তাহলে ভালো সাংবাদিক হতে পারতাম। দুটো করতে গিয়ে আমি সাংবাদিকতার প্রতি সুবিচার করিনি, সাহিত্যের প্রতিও সুবিচার করিনি। এখন মনে হয়, যে কোনো একটি ছেড়ে আরেকটিতে পূর্ণকালীন মনোযোগ দেওয়া উচিত। তবে আমি যে ধরনের লেখা লিখেছি, তাতে সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা অনেক সাহায্য করেছে।

আমাদের অনেকের প্রিয় লেখক মার্কেজ সাংবাদিক ছিলেন। তিনি বলেছিলেন কি না জানি না, সৈয়দ শামসুল হকের মুখে শুনেছি, উপন্যাস হচ্ছে একটা উন্নত সাংবাদিকতা। সৃজনশীল সাংবাদিকতা হচ্ছে উপন্যাস লেখা। মার্কেজও বলেছেন, তিনি রিপোর্ট লিখতে গিয়ে, কোনো একটা বিষয়ের খোঁজ করতে গিয়ে, সাংবাদিকতা করতে গিয়ে পরে সেটা উপন্যাস হিসেবে রচনা করেছেন। এটা তাঁর কাজে লেগেছে। যেমন, তাঁর একটি উপন্যাস আছে ‘লাভ অ্যান্ড আদার ডিমোনস’। সেখানে বর্ণনায় আছে তিনি খবরের সন্ধানে গেলেন, একটা মেয়ে মারা গিয়েছিল। তার লাশটা এক-দুই বছর পর তোলা হয়েছিল। দেখা গেল মেয়েটার চুল বড় হয়ে গেছে। অর্থাৎ মারা যাওয়ার পর চুল বড় হলো দেখে তার একটা উপন্যাস লেখার আইডিয়া মাথায় এলো।

আমার ক্ষেত্রেও এমন হয়েছে। আমি যখন ‘মা’ লিখি তখন প্রচুর লোকের ইন্টারভিউ করেছি। অনেক বিপজ্জনক জায়গায় গেছি। ইন্টারভিউ করতে গেলে শহিদ আজাদের খালাত বোন আমাকে বলেন, আপনি এত সাহস কেন করেন? আপনার তো বিপদ হবে। একজন অচেনা লোকের সঙ্গে কথা হলো আর আপনি বাড়িতে চলে এলেন? আপনি জানেন এটা কার বাসা? এটা এই এলাকার সবচেয়ে বড় মাস্তানের বাসা। আপনাকে যে কোনো সময় মেরে ফেলতে পারে। আমি এখনও ভয় পাই না, তখনও ভয় পেতাম না। আমার মনে হয়েছিল, ত্রিশজনের ইন্টারভিউ করতে হবে। আমি সেগুলো করেছি। সাংবাদিকতার ট্রেনিং না থাকলে আমি এটা পারতাম না।

হারুন পাশা :  লেখার ধাঁচে আপনার মতোই জনপ্রিয় ধারার লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন।

আনিসুল হক : সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সাংবাদিকতাকে আমাদের সঙ্গে মেলালে হবে না। আমি যতদূর জানি, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কাজই ছিল উপন্যাস লেখা। তাঁরা ‘দেশ’ পত্রিকায় যেতেন, এখানে নিজের উপন্যাসের যে কিস্তি দেয়ার কথা, সেটা দিতেন, তারপর চলে আসতেন। বাংলাদেশে সাংবাদিকতা একটা বিপজ্জনক পেশা হয়ে গেছে। বিপদটাকে ঘাড়ে নিয়ে এত ধরনের কাজ সুনীলরা করেন নাই। তিনি তো ‘দেশ’-এর কবিতার পাতাও দেখতেন। এগুলো সাংবাদিকতার সঙ্গে খুব একটা যুক্ত না। এটা সাহিত্যের কাজ। ‘আনন্দবাজার’-এর নিয়ম ছিল, তারা কিছু লোককে তাদের ঘরের লোক বানিয়ে ফেলবে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল পশ্চিমবঙ্গের সেরা লেখকদের ‘আনন্দবাজার’-এর লেখক বানানো। এরপর ‘আনন্দ’ থেকে বই প্রকাশ করবেন। কিন্তু পাঠক যাতে বুঝতে না পারে এই লেখকদের ‘আনন্দবাজার’ কিনে ফেলেছে। সেজন্য তাঁরা অন্য কাগজেও লেখা দিতে পারতেন যেগুলো ‘আনন্দবাজার’-এর প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। আমাদের ক্ষেত্রে লেখক হিসেবে ‘প্রথম আলো’ কিনে নিয়েছে এমন না।

আমরা ‘প্রথম আলো’ করেছি মতিউর রহমানের নেতৃত্বে। একযোগে ‘ভোরের কাগজ’ থেকে আমরা বের হয়ে এসেছিলাম। এটা তৈরির পেছনে আমাদের অংশগ্রহণ আছে। অবদান আছে। যে দায়িত্বগুলো আছে আমরা সেটা ভাগ করে নিয়েছি। সম্পাদক আমার উপর দৈনন্দিন কাজের চাপটা কম দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, তুমি যদি লেখক হও তাহলে ‘প্রথম আলো’র একজন লেখক তৈরি হলো- ক্ষতি কী! এর আগে ‘সাংবাদিক’ পরে ‘লেখক’ হিসেবে পরিচিত হয়েছি। আগেই লেখক ছিলাম, সেই হিসাবে ‘প্রথম আলো’ সুযোগ দিয়েছে এমন নয়।

হারুন পাশা : জনপ্রিয় ধারাটি কীভাবে তৈরি হলো বাংলা সাহিত্যে? আপনিও তো জনপ্রিয় বা পাঠকপ্রিয় লেখক- এজন্য প্রশ্নটি করলাম।

আনিসুল হক : বাংলাদেশের জনপ্রিয় ধারাটাকে আমেরিকা-ব্রিটেনে যেভাবে বলা হয় সেভাবে বলা যায় না। আমেরিকায় দুই ধরনের উপন্যাস আছে- লিটারেরি ফিকশন, পপুলার ফিকশন। মার্কেজ যে উপন্যাস লিখতেন সেগুলো লিটারেরি ফিকশন। উইলিয়াম ফকনারেরটা লিটারেরি ফিকশন। ফিলিপ রথেরটাও তাই। কিন্তু হ্যারি পটার পপুলার ফিকশন। রহস্য গল্প, সায়েন্স ফিকশন, গোয়েন্দা গল্প, ভূতের গল্প এগুলো হচ্ছে পপুলার ফিকশন। লিটারেরি ফিকশনটা মানুষের গভীর জীবনবোধের গল্প হতে হবে। বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গে এটা মিলেমিশে খিচুড়ি হয়ে গেছে। যেমন: হুমায়ূন আহমেদ ভূতের গল্প, হিমু সিরিজ, সায়েন্স ফিকশন লিখেছেন। এগুলো লিটারেরি ফিকশন না। এগুলো পপুলার ফিকশন। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের ‘শঙ্খনীল কারাগার’, ‘মধ্যাহ্ন’, ‘নন্দিত নরকে’ লিটারেরি ফিকশন। হারুন পাশা ‘তিস্তা’ নামে একটা উপন্যাস লিখল যেখানে তিস্তা নদীর পারের মানুষের জীবনবৃত্তান্ত আছে। এবং এটা দুই লাখ কপি বিক্রি হলো। তাহলেও কিন্তু এটা জনপ্রিয় উপন্যাস না- এটা লিটারেরি ফিকশন।

বাংলাদেশে মনে করা হয় ‘মা’ দুই লাখ কপি বিক্রি হয়েছে। আনিসুল হক জনপ্রিয় লেখক। আরেকজন যে লিখেছে গোয়েন্দা শফিকের অদ্ভুত কাণ্ড। তার বই বিক্রি হচ্ছে না। সে নিজেকে ভাবতে পারে না- সে সিরিয়াস ধারার লেখক। এটা কিন্তু বিক্রির উপরে না, নিয়তের উপরে নির্ভর করে। কেউ কি সিরিয়াসলি মানুষের জীবনের কাহিনি লিখছে, না হাসির গল্প, ভূতের গল্প, সায়েন্স ফিকশন লিখছে। এগুলো হচ্ছে জনপ্রিয় ধারার লেখা। এগুলোকে মূল ধারার সাহিত্য হিসেবে কখনই মনে করা হয় না। সায়েন্স ফিকশন নিয়ে পৃথিবীর মানুষ বিপদে আছে। কারণ যারা সায়েন্স ফিকশন লিখছেন তারা ভালো লেখক। এদেরকে কোথায় ফেলবে? যদিও সায়েন্স ফিকশন লিখে এখনও কেউ নোবেল পুরস্কার পায় নাই।

হারুন পাশা : একটা নির্দিষ্ট উত্তর আশা করছিলাম।

আনিসুল হক : বাংলাদেশের সাহিত্যের জনপ্রিয়তার ধারা নিয়ে আমাদের কোনো ধারণা নাই! তারা মনে করে, যার বই বেশি বিক্রি হয় সেটা হচ্ছে জনপ্রিয় ধারা। এর অর্থ এটা না হুমায়ূন আহমেদের ‘মধ্যাহ্ন’ জনপ্রিয় ধারার বই। কিন্তু তাঁর ‘হলুদ হিমু কালো র‌্যাব’ জনপ্রিয় ধারার বই। কারণ এগুলোর উদ্দেশ্যই হচ্ছে জনপ্রিয়তা। একটা সিরিজ। কিন্তু ‘মধ্যাহ্ন’র উদ্দেশ্য মহৎ। তিনি উপন্যাসই লিখতে চেয়েছেন। এখন ‘মধ্যাহ্ন’ ‘হলুদ হিমু কালো র‌্যাব’ থেকে বেশি বিক্রি হলেও একে জনপ্রিয় উপন্যাস বলতে পারবেন না। এটা সিরিয়াসধর্মী উপন্যাস। বিক্রির সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নাই।

হারুন পাশা : আপনি লিখেছেন ‘আমারও একটি প্রেমকাহিনি আছে’, ‘বেকারত্বের দিনগুলোয় প্রেম’, ‘এতদিন কোথায় ছিলেন’, ‘বিক্ষোভের দিনগুলোয় প্রেম’...

আনিসুল হক : প্রেম সম্পর্কে একটা নেগেটিভ ধারণা আছে। মানুষ ভাবে প্রেম বাজে জিনিস। কিন্তু মার্কেজের বইয়ের নাম ‘লাভ ইন দা টাইম অফ কলেরা’ অথবা ‘লাভ ইন আদার ডিমোস’। শেক্সপিয়র থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত ভালোবাসা ছাড়া কিছু আছে নাকি? জগৎ টিকে আছে ভালোবাসার উপরে। এখন আপনি কি লিখলেন এটাই হলো আসল কথা। ‘এতদিন কোথায় ছিলেন’ জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে লেখা। বনলতা সেন কে ছিলেন এটাই এ উপন্যাসের অন্বিষ্ট। এটা ‘একজন কমলালেবু’র অনেক আগে লেখা। অনেক ভালো বই। ‘বিক্ষোভের দিনগুলোয় প্রেম’ আশির দশকের কথা। এরশাদ সাহেব সামরিক আইন জারি করলেন এবং নব্বইয়ের দশকে আমরা তাঁকে উৎখাত করলাম। এই পুরো সময় আমরা ছাত্ররা কি করেছি তার বর্ণনা।

হারুন পাশা : ‘আমারও একটি প্রেমকাহিনি আছে’...

আনিসুল হক : এটাও ভালো বই। বই আমি খারাপ লিখি না।

হারুন পাশা :  বই তো আপনি ভালো লেখেন- আমরা জানি। প্রেমের ব্যাপারে বললেন- রবীন্দ্রনাথ কিংবা শেক্সপিয়রের প্রেমের ডাইমেনসন কিংবা পরিণতি ছেলেমেয়েদের প্রেমের মধ্যে আবদ্ধ ছিল না...

আনিসুল হক : ওটা রবীন্দ্রনাথের ‘গীতবিতান’। প্রেম পর্ব আলাদা আছে, পূজা পর্ব আলাদা আছে। মাঝে মাঝে দেখা পাই- এটা পূজার গান, প্রেমের গান না। কতগুলো আছে ডেফিনেটলি প্রেমের গান।

হারুন পাশা :  রবীন্দ্রনাথের উপন্যাগুলো দেখলে কিংবা নাটক, আবার শেক্সপিয়রের কথা বললেন, তাঁর নাটকে প্রেম আছে কিন্তু প্রেমটা মুখ্য নয়।

আনিসুল হক : প্রেমকে অশ্রদ্ধা করেন কেন?

হারুন পাশা : শ্রদ্ধার জায়গা থেকেই বলছি। আপনি যেহেতু তাঁদের কথা বললেন, তাঁদের রচনায় শেষ পর্যন্ত ছেলেমেয়েদের প্রেমটাই ফোকাস পায় না।

আনিসুল হক : রবীন্দ্রনাথের একটা সমস্যা ছিল তিনি ভীষণভাবে পরমেশ্বরে বিশ্বাস করতেন। ফলে তাদের প্রেম এবং পূজা মিলেমিশে আছে। আমাদের আধুনিক মানুষের পক্ষে তো আর ঈশ্বরের প্রেম মাহাত্ম্য দেওয়া সম্ভব না। আমাদের প্রেম তো আরও বিস্তারিত হবে। কারণ আমরা আধুনিক। তার দ্বারা সাহিত্যের উৎকর্ষ-অপকর্ষ নির্ণিত হয় না। এখন আপনি জিনিসটা ভালো লিখলেন কিনা- এটা হলো ব্যাপার। ধরেন বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস কেন এত বিখ্যাত? কারণ প্রেম।

হারুন পাশা :  এখন যে প্রজন্ম বেড়ে উঠছে তাদের উদ্দেশ্যই প্রেমটা লেখা, ফোকাস করা, প্রেমটাই পরিণতিতে নিয়ে যাওয়া।

আনিসুল হক : না, ওটা হচ্ছে, সব সময় একটা গাছে মুকুল বেশি ধরবে। ফল কম হবে। একটা বইমেলায় হাজার হাজার বই বের হয়। তিন হাজার বইয়ের মধ্যে দুই হাজার বই বের না হলে ক্ষতি ছিল না। গৌণ লেখকদের নিয়ে এত দুশ্চিন্তা করলে হবে না। গৌণ লেখকরা তো ভালো লেখক না। ভালো লেখক যদি প্রেম লেখে সেটাও ভালো।

হারুন পাশা :  কিন্তু...

আনিসুল হক : এই কিন্তুটাই আসল। এই কিন্তুটা দিতে পারলেন কি না? ‘কিন্তু’ দিতে না পারলে হবে না।

হারুন পাশা : ‘মা’ উপন্যাসের বহু সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন ভাষায়। এই প্রসঙ্গে জানতে চাই।

আনিসুল হক : ‘মা’ সিরিয়াস ধারার লেখা। এর শততম মুদ্রণ আসবে ২০২০ সালের মার্চে। এটা বাংলাদেশের জন্য রেকর্ড। বইটি যেবার করি, সেবার আমার একটা প্রেমের উপন্যাসও ছিল। সাজ্জাদ শরিফ ফরিদ আহমেদকে বললেন, আনিসের একটা বই নেন, ঈদ সংখ্যায় লিখেছে- ‘মা’। বইটা বিক্রি হবে না। কিন্তু আপনার নাম হবে। প্রেস্টিজ হবে। ফরিদ আহমেদ মন খারাপ করে বইটি নিল। কারণ একটা প্রেমের উপন্যাস ছিল, সেটা সে নিতে চেয়েছিল। আজকে আমার বার্ষিক আয়ের প্রধান উৎস ‘মা’।

একটু আগে প্রশ্ন তুলেছিলেন, আমাদের অনেক তরুণ লেখক আছেন যারা শুধু প্রেম দিয়ে বই করতে চায়। যাদের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে বই বিক্রি হবে কি না? আমি দুই-তিনজন তরুণ লেখককে দেখি তার বই কয় হাজার বিক্রি হচ্ছে তা পোস্ট দিচ্ছে। সাক্ষাৎকার দিচ্ছে। ভিডিও বের করছে। আমি বিস্মিত হই- ও এত বিক্রি নিয়ে চিন্তিত কেন! ওকে চিন্তা করতে হবে আমার লেখাটা ভালো হয়েছে কি না। যদি ভালো হয় তাহলে বই বিক্রি হবে, না হলে হবে না। লেখকের প্রধান দুশ্চিন্তা হওয়া উচিত লেখাটা ভালো হলো কি না। আমি মনে করি, আমার সৌভাগ্য, আমার একটা সিরিয়াস বই, মুক্তিযুদ্ধের বই, একটা দেশপ্রেমের বই, একটা নারীবাদের বই, বাংলাদেশের বেশি বিক্রি হওয়া উপন্যাসের একটি হয়েছে। আমি মনে করি না যে, কোনো জীবিত লেখক অথবা কোনো পাঠ্যপুস্তক ছাড়া কারও উপন্যাস এত বিক্রি হয়েছে। আমাদের ক্ল্যাসিকগুলো হয়েছে। যেমন ‘লালসালু’ পাঠ্য ছিল। হাজার বছর ধরে পাঠ্য ছিল। আমাদের সময় ‘শ্রীকান্ত’ পাঠ্য ছিল। এগুলো লাখ লাখ কপি বিক্রি হয়েছে। ‘আনোয়ারা’ কয়েক লাখ বিক্রি হয়েছে। এরপর ‘মা’। এটা আমার জন্য প্রেরণার বিষয়। এজন্য আমি বাংলাদেশের পাঠককে শ্রদ্ধা করি। এজন্য বলি, বাংলাদেশের পাঠকের রুচি নিয়ে প্রশ্ন করবেন না। আমাদের পাঠক ভালো-মন্দ আলাদা করতে পারে।

হারুন পাশা : টেলিভিশন নাটক, এমনকি চলচ্চিত্রের স্ক্রিপ্টও লিখেছেন। এগুলো লেখার কোনো কারণ আছে?

আনিসুল হক : আমার স্ত্রী একদিন বলল, তুমি কি টেলিভিশনের জন্য নাটক লিখতে পারবা? আমি বললাম, কেন পারব না। এটা আবার এমন কি কঠিন কাজ! একদিন সন্ধ্যা ছয়টায় বসলাম রাত বারোটায় নাটক লেখা শেষ। নাটক লেখাটা সহজ ছিল কিন্তু তখন টেলিভিশন মাত্র একটা। আমি এর কাছে যাই, ওর কাছে যাই, কেউ নেয় না। পরে আফজাল হোসেন কিনলেন এবং আমাকে ৩৫ হাজার টাকা দিলেন। কিন্তু এটা হলো না। শেষে একুশে টেলিভিশন হওয়ার পর আলম এটা করলেন। ততদিনে আমার ‘লাল পিরান’ নাটকটা হয়ে গেছে।বউয়ের বাজিতে জিততে গিয়েই নাটক লেখা। এখন আর লিখি না। কারণ এখন টেলিভিশন নাটকের প্রভাব সমাজে নাই।

হারুন পাশা :  অনেক মাধ্যমেই আপনার পদচারণা। যদি একটাকে বেছে নিতে বলা হয় তাহলে কোনটা বেছে নেবেন?

আনিসুল হক : আমার আদি প্রেম হচ্ছে কবিতা। আমি কবি হতে চেয়েছিলাম। সেজন্য ঢাকা শহরে এসেছি। গদ্য আমাকে দখল করে ফেলেছে। আমার পরিচয়ে প্রধান হয়ে গেছে আমি গদ্য লিখি। কিন্তু আমি মনে করি, আমি কবি হতে চেয়েছিলাম। এখনও আমি কবি হতে চাই।

 

ঢাকা/তারা

রাইজিংবিডি.কম

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়