ঢাকা     সোমবার   ১৭ জুন ২০২৪ ||  আষাঢ় ৩ ১৪৩১

ছোটগল্প || পাখিটি ছাড়িল কে

ধ্রুব এষ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৪:২৬, ২০ এপ্রিল ২০২৩   আপডেট: ১৪:৪৭, ২০ এপ্রিল ২০২৩
ছোটগল্প || পাখিটি ছাড়িল কে

রহস্যময় দেখতে মানুষটা।
কোন মানুষটা?
পৃথিবীর যে কোনো মানুষই রহস্যময় দেখতে। আট কুঠুরি নয় দরজার কাঠামো। পাখি থাকে। পাখি উড়ে যায়। রহস্যময় পাখি। কেউ সেই পাখি দেখে নাই। 
পাখি সেটাই-বা কে বলে দিলো? কমরেড লালন।
খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়।

কমরেড জুলকারনাইন সেই পাখি শিকার করে। শিকারী সে। অবাধ তার বিচরণ শিকার-নিষিদ্ধ ‘হাইস্যকর’ এই পৃথিবী গ্রহে।
বোকা ডটডট হোমো সেপিয়েন্স। চিরদিন-ইচ্ছা-মনে-আইল-ডিঙায়ে-ঘাস-খাবা তারা। কত প্রজাতির পশুপাখি উদ্ভিদ কেবল খেয়ে শেষ করে দিলো! এখন যা হচ্ছে আদিখ্যেতার চূড়ান্ত। পরিবেশ সচেতন সেপিয়েন্সের দল। ‘হাইস্যকর’। খুবই ‘হাইস্যকর’।

কমরেড বিনোদন সাংবাদিক একদিন দেখা করেছিল কমরেড জুলকারনাইনের সঙ্গে।
‘কমরেড আপনি কি অবগত যে পাখি শিকার দেশে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।’
‘সেটা যে পাখি দেখা যায়, কমরেড বিনোদন সাংবাদিক। সরালী, ভাদি হাঁস, শামুক খোল, হরিয়াল এরা। আমি এদের নিয়ে কারবার করি না।’
‘অতিথি পাখি সম্পর্কে ইদানীং...।’
‘প্রতিবাদ জানাই কমরেড বিনোদন সাংবাদিক। অতিথি পাখি মানে? কে অতিথি? তারা কি পাসপোর্ট ভিসা করে আসে? দেশ বোঝে? সীমান্ত বোঝে? তারা কি মানুষ? পৃথিবীটা মানুষের নাকি পাখির? তারা আসে তাদের শৈলনিবাসে, আমরা বলি সাইবেরিয়া থেকে বাংলাদেশে আসে। হাইস্যকর। খুবই হাইস্যকর।’
‘ওয়াও! জ্ঞানী প্রফেসরদের মতো কথা কমরেড। আমাকে একটা বাইট যদি দিতেন...?’
‘কামড়াব? কেন? আমি কি কুকুর? না আপনি ব্ল্যাক ফরেস্ট কেকের টুকরা কমরেড বিনোদন সাংবাদিক।’
‘আমি নিউজ বাইটের কথা বলছি কমরেড।’
‘ডি বি এ এ (DBAA)!’
দরকার ছাড়া অস্ত্রপাতি নিজের কাছে রাখে না, তা না হলে কমরেড বিনোদন সাংবাদিকের পাখিটাকে সেদিন উড়িয়ে দিত কমরেড জুলকারনাইন। বাইট চায়!

কমরেড অশোকতরু এই পৃথিবীতে একমাত্র বন্ধু কমরেড জুলকারনাইনের। পর্ন ক্লিপ তারা একসঙ্গে দেখে। কমরেড অশোকতরু মনস্তত্ববিদ। উনত্রিশ বছর ধরে আমেরিকায়। গত শীতকালে দেশে এসেছিল। বিস্তর অ্যাডাল্ট জ্ঞানের কথা বলে গেছে। শালা হারামি! মগজ হ্যাক করতে পারে মানুষের।
‘আমার মগজ হ্যাক করতে পারবি না।’
‘আ’ম দ্য মোস্ট ফাইনেস্ট অ্যান্ড দ্য ডেডলিয়েস্ট ব্রেইন হ্যাকার ইন দি ওয়ার্ল্ড, কমরেড।’
‘তাহলে বিনীত নিবেদন এই যে আমার মগজ হ্যাক করিস না তুই।’
উনত্রিশ বছর পর দেখা দুই কমরেডের। উনত্রিশ বছর আগে কি আর শিকারী ছিল কমরেড জুলকারনাইন? ছিল কেউ চিন্তা করে নাই, ধরতে পারে নাই। মেধাবী ছাত্র, মেধাবী বিতার্কিক, কে চিন্তা করবে? কে ধরতে পারবে কমরেড জুলকারনাইনের ভেতরে কোন অদেখা অচিন পাখি ওড়ে দিনমান?

আটত্রিশ বছর আগে তারা পড়ে এইটে। মফস্বল টাউনের আজব দিনকাল। টাউনের লম্বাহাটির ফোরকান আলীর গুন্ডারা উঠিয়ে নিয়ে গিয়েছিল মিলুকে। কমরেড অশোকতরুর ছোটভাই মিলু। সেসময় পড়ে সিক্সে। ফোরকান আলী বিকৃতকাম। মানসিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল মিলুর।
‘ফোরকান আলী মরে গেলে তুই খুশি হবি মিলু?’
‘হ্যাঁ।’
ফোরকান আলী মরে গিয়েছিল। জননেন্দ্রিয় কাটা তার ডেডবডি লাম্বাহাটির কাঠের পুলের নিচে ঝুলছিল। থানায় কেউ মামলা দায়ের করে নাই। ফোরকান আলীর খুনি কে ধরবে?
সেই প্রথম শিকারের স্মৃতি। তীব্রতম নস্টালজিয়া কমরেড জুলকারনাইনের। অদেখা অচিন পাখির ঝাপটানি- উচ্ছ্বাসে বুক ভরে গিয়েছিল তার! সেই থেকে শিকারী সে। অদেখা অচিন পাখি শিকার করে এবং উচ্ছ্বাসে বুক ভর্তি করে নেয়। ক্লান্তি লাগে না? না। ক্লান্তি লাগবে কেন উচ্ছ্বাসে?
উচ্ছ্বাসে পূর্ণ একটা মানবজনম কাটিয়ে তবে মরতে পারে কমরেড জুলকারনাইন। তার আগে না।
এমন মানবজনম আর কী হবে
মন যা করো ত্বরায় করো এই ভবে

ভবের পরে কী? অনন্ত জিজ্ঞাসা? সেই জিজ্ঞাসার আকার প্রকার কী? অদেখা অচিন পাখির মতো? পাখির ডানার মতো? ডিমের মতো? অদেখা অচিন পাখি ডিম দেয়? রণক্ষেত্রে কাঠের ঘোড়ার ধোঁকা চিরকালীন যে রূপবতীর কার্যকারণে সেই হেলেন অব ট্রয় কোনো মানুষীর পেট থেকে পড়েনি, আফ্রোদিতির ডিম ফুটে হয়েছে। মিথ বলে।অদেখা অচিন পাখি কি মিথ? সেই মিথের রং সোনালি হলুদ?
হলুদিয়া পাখি সোনারই বরণ
পাখিটি ছাড়িল কে
পাখিটি ছাড়িল কে রে বন্ধু
পাখিটি ছাড়িল কে

বলতে পারবে একমাত্র কমরেড অশোকতরু হয়তো। তবে মরা মানুষের মগজ নিশ্চয় সে হ্যাক করতে পারে না। কাল সে কি শোক প্রকাশ করবে? ব্লগ লিখবে? আমেরিকায় থাকে। আমেরিকান ব্যক্তি। কিছু হোমো সেপিয়েন্স তার বক্তব্যকে আমেরিকার বক্তব্য হিসেবে ধরে নিতে পারে। এবং দেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে একে সরাসরি হস্তক্ষেপ হিসেবে মনে করে নিতে পারে। হাইস্যকর। খুবই হাইস্যকর।

কমরেড জুলকারনাইন অস্ত্রপাতি রাখে দরকারে। পাখি শিকারের দুই-তিন দিন আগে ভাড়া নেয়। ব্যারেটা অটোমেটিক পেয়ে যাবে ভাবে নাই। অস্ত্র ব্যবসায়ী কমরেড ফসিল। সাতাশ-আটাশ বছর ধরে কারবার। সাপ্লাই দেয় কমরেড জুলকারনাইনকে। তবে সেও কখনোই জানে না যে, কোন আট কুঠুরি নয় দরজার ভেতরের অদেখা অচিন পাখিকে ‘ছাড়িবে’ কমরেড জুলকারনাইন।
রহস্যময় দেখতে মানুষটা কে?
আয়নায় দেখা যাচ্ছে যে কমরেড জুলকারনাইনকে? হ্যাঁ। জিরো আওয়ারে তার এক চোখের মণিতে ব্যারেটা অটোমেটিকের নল ঠেকাল কমরেড জুলকারনাইন। পাখিটি ছাড়িল।
পরদিন ব্রেকিং নিউজ হলো। কমরেড অশোকতরু অনলাইনে দেখলেন। সঙ্গে বললেন, ‘রেস্ট ইন পিস।’

১৭.০৪.২০২৩

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়