ঢাকা     শুক্রবার   ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ||  ফাল্গুন ১০ ১৪৩০

নুয়েপড়া ঝুপড়ি ঘরেই প্রতিবন্ধী মা-ছেলের বসবাস

আবু নাঈম, পঞ্চগড় || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:৫৫, ১২ ডিসেম্বর ২০২২   আপডেট: ২২:৪৮, ২ জানুয়ারি ২০২৩

ছোট ঝুপড়ি ঘরটি উত্তরমুখি হলেও নুয়ে পড়েছে দক্ষিণ দিকে। ২০ বছর আগে দাঁড় করানো ঘরটিতে ব্যবহার করা বাঁশের খুটির প্রায় সবগুলোই এখন ঘুনে ধরা। জরাজীর্ণ ঘরটির অবস্থাও নড়বড়ে। যেকোন সময়ই ভেঙ্গে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থাতেই ঘরটিতে বসবাস করে মানবেতর জীবনযাপন করছেন মানসিক প্রতিবন্ধী বৃদ্ধা ছালেহা বেগম (৮৫)। এই ঘরে তার সঙ্গে থাকছেন ছেলে রোস্তম আলীও (৫০)। তিনিও মানসিক প্রতিবন্ধী।

ছালেহা বেগমের বাড়ি পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাড়িভাসা ইউনিয়নের ফুটকি পাড়া গ্রামে। দুই ছেলেসহ ছালেহা বেগমকে রেখে ৪০ বছর আগে অন্যখানে সংসার পাতেন স্বামী হান্নান আলী। বড় ছেলে ওমর আলী বর্তমান স্ত্রী-সন্তান নিয়ে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরে থাকলেও ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি এই বৃদ্ধার। 

একসময় ছেলে রোস্তম আলীর রোজগারে দিনাতিপাত হলেও এখন মানসিক রোগী হওয়ায় কর্মহীন তিনি। সারাদিন বাড়িতেই কাটে তার। ফলে মানুষের করুণাতে যা পান তাই দিয়েই আহার জুটে তাদের। আবার কখনো অনাহারেও কেটে যায় দিনরাত্রি। 

সম্প্রতি ছালেহা বেগমের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ১৬ শতক জায়গার উপর দাঁড়ানো ঝুপড়ি ঘরটি হেলে পড়েছে। ঘরটি সংস্কার করা জরুরি হয়েছে অনেক আগেই। বৃষ্টি হলে ছাউনির পুরনো টিনের ছিদ্র দিয়ে পানি পড়ে। ফলে নির্ঘুম রাত কাটাতে হয় তাদের। কিন্তু যেখানে দুইবেলা খাওয়া ঠিকমতো জোটে না, সেখানে ঘরটি সংস্কারই বা করবেন কীভাবে? 

ছালেহা বেগমের নুয়ে পড়া ঝুপড়ি ঘর।

বসবাসের অনুপযোগী এই ঘরের ভিতর রয়েছে দুটো ভাঙা চৌকি। যার একটিতে ছালেহা বেগম এবং অপরটিতে ছেলে রোস্তম আলী থাকেন। মা-ছেলের সংসারে সঙ্কট বিশুদ্ধ পানির, ফলে আধুনিক যুগেও তাদের খেতে হচ্ছে পুরনো কুয়ার পানি। এছাড়া তাদের ঘরে নেই কোনো টয়লেট ব্যবস্থা। এমনকি খোলা আকাশের নিচে খাবার রান্না করতে হয় তিন ইটের তৈরি বিশেষ চুলায়। ফলে শীত আর বর্ষায় দুর্ভোগ বাড়ে তাদের। 

ছালেহা বেগম এই বয়সে এসেও পান না বয়স্কভাতা। মানসিক প্রতিবন্ধী হিসেবে পরিচয়পত্র থাকলেও প্রতিবন্ধী ভাতাও পান না বলে জানালেন তিনি। দমকা হাওয়া হলেই ঝুপড়ি ঘরটি ভেঙে পড়বে এমন আশঙ্কা রয়েছে তার। ফলে আশ্রয়হীন হবার আগেই একটি ঘরের আকুতি এই বৃদ্ধার। 

ছালেহা বেগম বলেন, ‘ছেলে রোস্তম সুস্থ ছিলো, ওর থাকার আলাদা ঘর ছিলো। তার আয়েই চলতো সংসার। কয়েক বছর আগে রোস্তম নিজের জন্য একটি ছোট ঘরের কাজ শুরু করে; কিন্তু কাজ শেষ হবার আগেই সে মানসিক রোগী হয়ে পড়েন। ঘরের কাজ আর এগোয়নি। ফলে আমার ঘরেই ঠাই হয়েছে ওর। সেই ঘরটির বাকি কাজ শেষ করা গেলেও অনেকটা কষ্ট লাঘব হতো আমাদের। কিন্তু সেই উপায়ও এখন আমাদের নেই।’

পুরাতন কুয়ার পানি ব্যবহারে চলে রান্না ও কাপড় ধোয়া।

ছালেহা বেগমের প্রতিবেশী রোকেয়া বেগম বলেন, ‘রোস্তম আলীর নামে বাড়ি ভিটায় ১৬ শতক জমি আছে। কিন্তু তাদের পাশে দাঁড়ানোর কেউ নেই।’ 

স্থানীয় সামাজিক সংগঠণ আল আকসা ফাউণ্ডেশনের সংগঠক মো. আল আমিন বলেন, ‘এই যুগে এমন অসহায় পরিবার খুঁজে পাওয়া কঠিন। বর্তমান অনেক স্বচ্ছল পরিবারও সরকারের বিভিন্ন সুবিধার আওতায় আসছে। সেখানে ছালেহা বেগমের বঞ্চিত থাকাটা দুঃখজনক। সংশ্লিষ্টদের সুদৃষ্টি কামনা করছি আমি।’

পঞ্চগড় সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাসুদুল হক বলেন, ‘আমি বিষয়টি জানলাম। ছালেহা বেগমের বাড়িতে যাবো। খোঁজ খবর নিয়ে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

মাসুদ

সম্পর্কিত বিষয়:

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়