ছোট বোনকে কোলে নিয়ে গাছ কাটা দেখছিল, রাতে পাতার নিচে মিলল দুজনের লাশ
গাইবান্ধা প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম
কাটা গাছের গুঁড়ির নিচে চাপা পড়া ফিহামনির স্যান্ডেল, যা এখন তার বাবা-মায়ের জন্য শুধুই স্মৃতিচিহ্ন। বৃহস্পতিবার রাতে গাইবান্ধায় সদর উপজেলার বল্লমঝাড় ইউনিয়নের রঘুনাথপুর গ্রামে।
ছোট বোনকে কোলে নিয়ে গাছ কাটা দেখছিল ১১ বছর বয়সি একটি মেয়ে। বিকালের সেই ঘটনার পর তাদের খুঁজে পাওয়া গেল সেই কাটা গাছের গুঁড়ির নিচে পাতা দিয়ে ঢাকা অবস্থায়; তবে নিস্তব্ধ-নিষ্প্রাণ। দুই মেয়ের মরদেহ খুঁজে পেয়ে বুকফাঁটা চিৎকার দেন তাদের বাবা; অবাক বিস্ময়ে ছুটে আসে লোকজন।
গাইবান্ধায় সদর উপজেলার বল্লমঝাড় ইউনিয়নের রঘুনাথপুর গ্রামে বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) রাতে খুঁজতে বেরিয়ে দুই মেয়ের মরদেহ দেখতে পান তাদের বাবা ফরিদ মিয়া। এভাবে মেয়েদের চলে যাওয়ার ঘটনা কোনোমতেই মেনে নিতে পারছেন না তাদের বাবা-মা। পরিবারের অভিযোগ, এটি হত্যাকাণ্ড, এর জন্য ফাঁসির দাবি তুলেছেন তারা।
রঘুনাথপুর গ্রামের আব্বাসের মোড় এলাকার মধু মিয়া ও মতিউর রহমানের বাড়িতে সকাল থেকে গাছ কাটার কাজ চলছিল। বিকালের দিকে পাশের বাড়ির ফরিদ মিয়ার ১১ বছর বয়সি মেয়ে ফিহামনি তার দুই বছর বয়সি বোন জান্নাতি আক্তারকে কোলে নিয়ে গাছকাটা দেখতে যায়। সেই যাওয়া তাদের পরিবারের জন্য চিরবিষাদের অন্ধকার এনে দিল।
অবশ্য রঘুনাথপুরের কয়েকজন বলছেন, একটি কাটা গাছ মেয়ে দুটির ওপর পড়ে তাদের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। ঘটনা ধামাচাপা দিতে গাছ কাটার লোকজন এবং গাছের মালিক মধু মিয়া ও মতিউর রহমান তাদের মৃতদেহ পাতা দিয়ে ঢেকে রেখে বাড়ি থেকে পালিয়ে যান।
নিখোঁজ দুই মেয়ের সন্ধান করতে গিয়ে তাদের বাবা ফরিদ মিয়া রাত ৮টার দিকে গাছের নিচে চাপা পড়া অবস্থায় তার দুই মেয়ের মরদেহ দেখতে পান। তার চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এসে গাছের নিচে চাপা পড়া মরদেহ দুটি উদ্ধারের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়।
খবর পেয়ে গাইবান্ধা থেকে ফায়ার সার্ভিস ও সদর থানা পুলিশের সদস্যরা এসে গাছের নিচ থেকে দুই বোনের মরদেহ উদ্ধার করেন। তখন আঁতকে ওঠে পুরো গ্রাম।
পরিবারের অভিযোগ, তাদের দুই মেয়েকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করে পাতা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। যদি হত্যাই না করে থাকে, তাহলে পাতা দিয়ে ঢেকে রাখবে কেন? এই হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেছে পরিবারটি।
শোকে বিহ্বল মেয়ে দুটির বাবা ফরিদ মিয়া বলেন, “আমার দুই মেয়েকে যারা এভাবে হত্যা করে পাতা দিয়ে ঢেকে রেখেছে, আমি তাদের ফাঁসি চাই।”
ফিহামনি ও জান্নাতি আক্তারের মা লাইজু বেগম দুই সন্তানকে হারিয়ে পাগলপ্রায়। তার আহাজারি থামছেই না। বৃহস্পতিবার রাতে গাইবান্ধায় সদর উপজেলার বল্লমঝাড় ইউনিয়নের রঘুনাথপুর গ্রামে।
মা লাইজু বেগম সন্তানের জন্য বিলাপ করছেন আর বারবার মূর্চ্ছা যাচ্ছেন। চিৎকার করে বলছিলেন, “কোটে মোর সোনার ধন, কেটা মারি ফেলালো রে... মোর কলজে দুইটেক আনি দেও। ওরা আমার মাইয়া দুইটাকে মাইরা পাতা দিয়ে ঢাকি রাখছে, ওরে আল্লারে।”
গাইবান্ধা সদর থানার ওসি আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “দুই বোনের মৃত্যুর পিছনে যারা গাছ কাটছিল এবং যারা গাছের মালিক উভয়েরই দোষ আছে। কারণ, এসব বড় গাছ কাটার সময় অবশ্যই আশপাশের ঘরবাড়ি ও লোকজনকে সতর্ক করতে হয়। তারা হয়তো সেটা করেননি। ফলে একই পরিবারের দুই সন্তানের অকাল মৃত্যু হয়েছে।”
মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়ে ওসি বলেন, “নিহতের পরিবার থেকে এখনো অভিযোগ পাইনি। লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ঢাকা/লুমেন/রাসেল