‘ভাই-ব্রাদার, ফ্রেন্ডস অ্যান্ড কোং’...
ক্রীড়া প্রতিবেদক || রাইজিংবিডি.কম
নাহিদ রানার পাঁচ উইকেট তখন হয়ে গেছে। থার্ড ম্যান অঞ্চলে ফিল্ডিংয়ে ছিলেন তাসকিন আহমেদ। লম্বা পা ফেলে দৌড়ে আসতে তার একটু সময়ই লাগল। তবে পুরোটা সময় মুখে ছিল প্রশস্ত হাসি। কাছে এসেই আগে হাত মেলালেন সতীর্থ নাহিদের সঙ্গে, তারপর বুকভরা আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরলেন তাকে।
মোস্তাফিজুর রহমানের অবস্থাও ছিল প্রায় একই। নিজের সাফল্য সাধারণত খুব একটা উদযাপন করেন না তিনি। কিন্তু নাহিদের বিশেষ দিনে মোস্তাফিজুরও যেন আবেগ ধরে রাখতে পারলেন না—সতীর্থের কীর্তিতে তিনিও মেতে উঠলেন বাঁধনহারা আনন্দে। ডাগ আউটে এদিন ছিলেন আরেক পেসার শরীফুল ইসলাম। নাহিদের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথম ফাইফারের আনন্দটা সেখান থেকেই ভাগ করে নিলেন শরীফুল।
বাংলাদেশের পেস বোলারদের আত্মিক ও গাঢ় সম্পর্কটা আজকের নয়। বিগত ৪-৫ বছর ধরেই তাসকিন, মোস্তাফিজুর, শরীফুল, হাসান, খালেদ, ইবাদত, তানজিম সাকিব, নাহিদ রানা পেস বোলিংয়ের পতাকা উড়িয়ে যাচ্ছেন। নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা, একে অপরকে টেনে নেওয়ার স্বদিচ্ছা, বাধার দেয়াল টপকে সামনে এগিয়ে যাওয়া, বিশ্ব ক্রিকেটের সঙ্গে মানানসই হয়ে উঠা বাংলাদেশের পেসারদের আলাদা করেছে।
২২ গজে সোনালী দিন কাটানো এই পেসারদের অগ্রদূত সুদর্শন তাসকিন। নিজেকে ভেঙে গড়ে তোলা এই পেসার ২০১৯ বিশ্বকাপে নিজের নাম দেখতে না পেরে চোখের জলে ভাসিয়েছিলেন মিরপুরের আঙিনা। সেই আঙিনায় আজ তার নামে রব উঠে। ওই ধাক্কায় পাল্টে যায় তার জীবনের গতিপথ। তার পায়ের নিজের জমিন শক্ত হয়েছে অজস্র ঘাম ঝরিয়ে। বাড়িয়েছেন গতি। হয়েছেন নিয়ন্ত্রিত, ক্ষুরধার। তার দেখানো পথ ধরেই হাসান মাহমুদ, খালেদ, ইবাদত, শরীফুলরা হয়ে উঠেছেন পোস্টারবয়।
মোস্তাফিজুর রহমান বর্তমান পেস অ্যাটাকের বিশ্বনন্দিত খেলোয়াড়। সময় যত যাচ্ছে মোস্তাফিজুর হয়ে উঠছেন আরো বেশি কার্যকর। আরো বেশি অভিজ্ঞ। যার উজ্জ্বল আলোয় জ্বলছে বাংলাদেশের ক্রিকেটও।
পেসাররা নিজেদের পরিপক্বতা, কথার সৌন্দর্য, ভাবনার গভীরতা, প্রতিপক্ষকে মূল্যায়ন, নিজেদের যত্ন, কাজের পরিধি নির্ণয়, আগ্রাসী মনোভাব, হারার আগে না হারার মানসিকতায় অনন্য হয়ে উঠেছেন। নির্ভরতার প্রতীক হয়ে বড় মঞ্চে নিজেদের কারিশমা দেখিয়ে যাচ্ছেন এই পেস বিগ্রেডরা। নিজেদের এই একতাকে বাংলাদেশের তরুণ পেসার দেখছেন বিশাল শক্তি উৎস হিসেবে।
নাহিদ রানার ভাষায় দলটা যেন এক পরিবারের মতো। সতীর্থ মোস্তাফিজুর রহমান ও তাসকিন আহমেদরা তার কাছে ‘ভাই-ব্রাদার’। আর পেস বোলিং কোচ শন টেইট—তিনি যেন বন্ধুর মতোই, ‘ফ্রেন্ডস’। মাঠের ভেতরে-বাইরে সবার সম্পর্কটা তাই বেশ আত্মিক, গভীরতার রঙও গাঢ়। এই বন্ধনই নাহিদের কাছে দলকে আরো শক্ত করে, আস্থা আর স্বস্তির জায়গাটা করে দেয় অনেক বড়।
গতকাল পাকিস্তানের বিপক্ষে ৫ উইকেট পাওয়ার পর নাহিদ বলেছেন, ‘‘আমরা হচ্ছে ধরেন ভাই-ব্রাদার টাইপের। আমরা অন দা ফিল্ড যতটা হাসি খুশি থাকি অফ দা ফিল্ড তার চাইতেও বেশি হাসি খুশি থাকি। এই জিনিসটা আমাদের মাঠে অনেক সাহায্য করে এবং আমরা একজন আরেকজনকে বুস্ট আপ করি। আমার কোন কিছু যদি ভুল হয় তারা ধরিয়ে দেয় এবং আমি তাদের কাছ থেকে সবসময় অনুশীলনে শেখার চেষ্টা করি।’’
কোচ টেইটকে নিয়েও আলাদা করে কথা বলেছেন নাহিদ, ‘‘সত্যি কথা বলতে উনি কোচ হিসেবে আউটস্ট্যান্ডিং কারণ ফ্রেন্ড হিসেবে আমাদের সঙ্গে বিহেভ করে। আমাদের যখন যেটা লাগে তিনি তখন সেই জিনিসটাই আমাদেরকে দেয় এবং আমাদেরকে সবসময় বলে যে তুমি তোমার স্ট্রেংথে থাকো এবং তোমার যা লাগবে তুমি আমাকে বলো আমি জাস্ট তোমাদেরকে গাইড করার জন্য আছি। মাঠে তোমরা খেলব, আমি তোমাদেরকে প্ল্যান দেব; তোমরা এই প্ল্যান এক্সিকিউট করবা এবং ম্যাচ উইন করবা। সে সবসময় আমাদেরকে মোটিভেট করে।’’
ক্রিকেটের গালিচায় লড়াইয়ের ময়দানে এক্সপ্রেস গতি আর ঝাঁঝালো বাউন্সার হাতে এই পেস ব্রিগেডের সৈনিকরাই বড় আশা দেখাচ্ছে বাংলাদেশকে। তারাই হতে পারেন শিরোপার সূর্যস্নানে ভাসিয়ে নেওয়ার ফেরিওয়ালা।
ঢাকা/ইয়াসিন