পঞ্চগড়ে নির্বাচনি সভায় জামায়াতের আমির
উত্তরবঙ্গের সঙ্গে সৎ মায়ের মতো আচরণ করা হয়েছে
পঞ্চগড় প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম
শুক্রবার পঞ্চগড় চিনিকল মাঠে ১০ দলীয় জোটের নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, “উত্তরবঙ্গ গরিব নয়, গরিব করে রাখা হয়েছে। সৎ মায়ের সন্তানের মতো উত্তরবঙ্গের সাথে আচরণ করা হয়েছে। উত্তরবঙ্গ আমাদের কলিজার অংশ, উত্তরবঙ্গ আমাদের খাদ্য এবং পুষ্টি সরবরাহ করে। সেই উত্তরবঙ্গকে পিছিয়ে রাখা হয়েছে ইচ্ছা করে। উত্তরবঙ্গ থেকে আমরা আগামীতে আর কোনো বেজার মুখ দেখতে চাই না। গোটা উত্তরবঙ্গকে কৃষিভিত্তিক শিল্পের রাজধানী বানাতে চাই। বন্ধ চিনিকল খুলে দিয়ে শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রে ফিরিয়ে আনতে চাই।”
শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) পঞ্চগড় চিনিকল মাঠে ১০ দলীয় জোটের নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
জামায়াতের আমির বলেন, “উত্তরবঙ্গের মানুষদের স্বাস্থ্যসেবার জন্য হন্যে হয়ে দৌড়াতে হয় রাজধানীর দিকে। এ সামর্থ্য সকলের নেই, যাওয়ার পথে রাস্তায় অনেকের মৃত্যু হয়। এ অবস্থা আমরা দেখতে চাই না। আল্লাহ আমাদেরকে দায়িত্ব দিলে ৬৪ জেলার কোথাও মেডিকেল কলেজবিহীন থাকবে না। বলবেন, এত টাকা কোথায় পাবেন? ওই যে চুরি করে আমাদের ২৮ লক্ষ কোটি টাকা বিদেশ নিয়ে গেছে, ওগুলো ওদের পেটের ভেতর হাত ঢুকিয়ে বের করে আনব।”
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “আমাদের কাছে কোনো কার্ড নেই। আপনারাই আমাদের কার্ড। আপনাদের বুকে একটা ভালোবাসার কার্ড চাই। আপনাদের সমর্থন, দোয়া ও ভালবাসা দিয়ে আগামীতে একটি বেকারমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে চাই। কারো দয়ায় বাংলাদেশের কোনো এলাকায় মানুষ বসবাস করবে, তা আমরা দেখতে চাই না। মানুষ আওয়াজ দেয়—টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া। কিন্তু, টেকনাফের উন্নয়নের জোয়ার আর আসতে পারে না তেঁতুলিয়া পর্যন্ত। আমরা এটা উল্টিয়ে দিব; বলব, তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ।”
তিনি বলেন, “আল্লাহর নেয়ামত চারটি নদী, আল্লাহ এই উত্তরবঙ্গকে দান করেছেন তিস্তা, ধরলা, ব্রহ্মপুত্র এবং করতোয়া। আজকে আসার সময় দেখলাম, নদী নয়, মরুভূমি। মরে কঙ্কাল হয়ে আছে নদীগুলো। আল্লাহর দান নদীগুলোকে খুন করা হয়েছে। এই দেশের কি কোনো মা-বাবা ছিল না? তাহলে আমার নদী মরে গেল কেন? ওরা জনগণের প্রতি পাঁচ বছরে একবার দরদের হান্ডিতে জ্বাল দেয়, আর এটা উতলায়া ওঠে। বাকি সাড়ে ৪ বছর হারিকেন জ্বালিয়েও খুঁজে পাওয়া যায় না। কেউ কেউ আবার বসন্তের কোকিল, বসন্তকাল আসলে আইসা বলে কুহু কুহু। এরা উড়ে এসে জুড়ে বসে। মানুষের সাথে, তৃণমূলের সাথে এদের কোনো সম্পর্ক নাই। আমরা এই রাজনীতিকে ঘৃণা করি। আমরা ছিলাম, আমরা আছি, আমরা থাকব। দেশবাসীকে ফেলে চরম বিপদের সময়ও কোথাও আমরা যাইনি, আগামীতেও প্রিয় দেশবাসীকে ফেলে আমরা যাব না। জীবনে-মরণে একসাথে লড়াই করব। বাংলাদেশকে গর্বের বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলব।”
জামায়াতের আমির বলেন, “আপনারা যদি মূল্যবান ভোট, ভালোবাসা, সমর্থনে ১০ দলের সমন্বয়কে যদি সংসদে পাঠান, আমরা যদি সরকার গঠন করতে পারি; কথা দিচ্ছি— শুধু নদীর জীবন ফিরবে না, মানুষের জীবনেও প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসবে। এই উত্তরবঙ্গের চেহারা বদলে দেওয়ার জন্য ৫টি বছরই যথেষ্ট হবে। একসাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আমরা যদি কাজ করি, উত্তরবঙ্গের চেহারা বদলে যাবে। এখানকার মানুষ পরিশ্রমী এই এলাকা পিছিয়ে থাকার প্রশ্নই ওঠে না। ষড়যন্ত্র করে, বঞ্চিত করে পিছনে রাখা হয়েছে।”
ডা. শফিকুর রহমান আরো বলেন, “শহীদ পরিবারের সদস্যরা, জুলাই যোদ্ধা, একাত্তরের বীরদের প্রতি আমরা ঋণী। আমরা আগামীতে দেশসেবার সুযোগ পেলে, সরকার গঠন করতে পারলে, আপনাদের ঋণ পরিশোধ করার চেষ্টা করব। আজীবন আপনাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকব।”
তিনি আরো বলেন, “আপনারা ভোট দিতে পারেননি বহুদিন। এখন ভোট দেওয়ার অপেক্ষায় আছেন, চঞ্চল হয়ে আছেন, পিপাসার্ত হয়ে আছেন। আপনার ভোট কেউ যদি ডাকাতি করে নিতে আসে, তাহলে রুখে দিতে হবে। এই দেশ থেকে বৈষম্য, অবিচার, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখলদারি, স্বৈরতন্ত্র বিদায় দিয়ে ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক, আধিপত্যবাদমুক্ত, দুর্নীতি ও দুঃশাসনমুক্ত মানবিক বাংলাদেশ সৃষ্টির না হওয়া পর্যন্ত আমাদের লড়াই অব্যাহত থাকবে।”
পঞ্চগড় জেলা জামাতের সেক্রেটারি মাওলানা দেলোয়ার হোসাইনের সঞ্চালনায় জনসভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন— জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও পঞ্চগড়-১ আসনে ১০ দলের প্রার্থী সারজিস আলম, জাগপার সহ-সভাপতি রাশেদ প্রধান, রাকসুর ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ প্রমুখ।
ঢাকা/নাঈম/রফিক