বসন্তে নজর কাড়ছে রক্তকাঞ্চন
মৌলভীবাজার প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম
বসন্ত এলেই নতুন রঙে সেজে ওঠে প্রকৃতি। পলাশ, শিমুল, কৃষ্ণচূড়ার আগুনরাঙা আভায় এবার যুক্ত হয়েছে রক্তকাঞ্চনের গোলাপি-বেগুনি রঙ। মৌলভীবাজার–ফেঞ্চুগঞ্জ আঞ্চলিক সড়কের পাশে, রাজনগর উপজেলার নন্দীউড়া গ্রামে হীরা সেনের বাড়ির প্রবেশপথ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা দুটি রক্তকাঞ্চন গাছ এখন পথচারীদের দৃষ্টি কাড়ছে। ফুলে ছেয়ে থাকা গাছ দু’টি যেন বসন্তের দূত হয়ে আগতদের স্বাগত জানাচ্ছে।
রক্তকাঞ্চনের বৈজ্ঞানিক নাম Bauhinia variegata (পরিবার: Fabaceae)। ইংরেজিতে এটি Camel’s Foot Tree বা Orchid Tree নামে পরিচিত। এর পাতার গঠন উটের পায়ের ছাপের মতো দ্বিখণ্ডিত হওয়ায় এমন নামকরণ। এটি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় পর্ণমোচী বৃক্ষ; সাধারণত ১০ থেকে ১২ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়, তবে অনুকূল পরিবেশে আরো বড় হতে পারে। মূল কাণ্ড থেকে একাধিক শাখা-প্রশাখা বিস্তার লাভ করে। পাতাগুলো গোলাকার এবং আগার দিকে হালকা বিভক্ত; দেবকাঞ্চনের তুলনায় আকারে কিছুটা ছোট।
বসন্তকালে গাছ প্রায় নিষ্পত্র হয়ে যায়, আর ঠিক তখনই ডালে ডালে ফুটে ওঠে বড় ও আকর্ষণীয় ফুল। পাঁচটি পাপড়ির মধ্যে একটি তুলনামূলক বড় ও গাঢ় রঙের ফুল, যার ওপর সূক্ষ্ম কারুকার্য দেখা যায়। ফুলের মৃদু ঘ্রাণ মৌমাছি ও প্রজাপতিকে আকর্ষণ করে, যা পরাগায়ণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর ফল শিমের মতো লম্বাটে শুঁটি আকৃতির, যার ভেতরে থাকে বীজ। বীজ ও কলম—উভয় পদ্ধতিতেই এর চাষ করা যায়।
রক্তকাঞ্চনের আদি নিবাস ভারতীয় উপমহাদেশ। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে এটি স্বাভাবিকভাবে জন্মে। বাড়ির বাগান, পার্ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সড়কের পাশে শোভাবর্ধনকারী গাছ হিসেবে এটি সমাদৃত। শুধু সৌন্দর্য নয়, আয়ুর্বেদ ও লোকজ চিকিৎসায়ও এর ছাল ও ফুলের ব্যবহার রয়েছে।
রক্তকাঞ্চনের একটি সাদা ফুলের জাতও রয়েছে, যা সমানভাবে দৃষ্টিনন্দন। তবে নগরায়ণ ও অপরিকল্পিত বৃক্ষ নিধনের কারণে গ্রামাঞ্চলে এখন আগের তুলনায় এ গাছের উপস্থিতি কমে গেছে। ব্যক্তিগত উদ্যোগে রোপণ ও পরিচর্যার মাধ্যমে এ গাছ সংরক্ষণে ভূমিকা রাখা সম্ভব।
নন্দীউড়া গ্রামের পথচারী কামরান আহমদ বলেন, “বসন্তে নানা ফুলে প্রকৃতি সাজে। এর মধ্যে রক্তকাঞ্চন আলাদা ধরনের, দেখতে খুব মনোহর।”
স্থানীয় বাসিন্দা মহোন লাল জানান, “হীরা সেনের বাড়ির প্রবেশপথ দিয়ে গেলে মনে হয়, অতিথিকে অভ্যর্থনা জানাতে রক্তকাঞ্চনের দু’টি গাছ দাঁড়িয়ে আছে।”
হীরা সেন বলেন, “বাড়ির শোভাবর্ধনের জন্য কয়েক বছর আগে দুটি গাছ লাগাই। এবার ফুল ফুটেছে। আমার বাড়িতে বিভিন্ন পূজা-পার্বণের জন্য নানা জাতের ফুলের গাছ আছে। রক্তকাঞ্চন আগের মতো দেখা যায় না, তাই যত্ন করে রেখেছি।”
এভাবেই ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও ভালোবাসায় টিকে থাকে প্রকৃতির সৌন্দর্য। বসন্তের রঙে রঙিন রক্তকাঞ্চন শুধু চোখ জুড়ায় না, মনে করিয়ে দেয়। প্রকৃতিকে যত্ন করলে সে তার সেরা রূপেই ধরা দেয়।
ঢাকা/আজিজ/জান্নাত