লক্ষ্মীপুরের চার আসনে যেভাবে সফল হলো বিএনপি
জাহাঙ্গীর লিটন, লক্ষ্মীপুর || রাইজিংবিডি.কম
শাহাদাত হোসেন সেলিম, আবুল খায়ের ভূঁইয়া, শহিদ উদ্দিনন চৌধুরী এ্যানী এবং এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লক্ষ্মীপুরের চার আসনে কে জিতলেন আর কে হারলেন, তা এখন সবাই জানেন। এখন চলছে ফল বিশ্লেষণের পালা। জয়-পরাজয়ের পেছনের কারণ কী, তা নিয়ে চলছে আলোচনা।
মাঠপর্যায়ে প্রচার, প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা, সংগঠনের সক্রিয়তা এবং স্থানীয় ইস্যু—এসব বিষয় নির্বাচনের ফল নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন রাজনীতিক, ভোটা এবং নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা।
লক্ষ্মীপুর-১ (রামগঞ্জ) আসনে শাহাদাত হোসেন সেলিম, লক্ষ্মীপুর-২ (রায়পুর-সদর আংশিক) আসনে আবুল খায়ের ভূঁইয়া, লক্ষ্মীপুর-৩ (সদর) আসনে শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি এবং লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি-কমলনগর) আসনে এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এই চারজনের বিজয়ের পেছনের কারণ খুঁজতে রাইজিংবিডি ডটকমের এই বিশেষ আয়োজন।
লক্ষ্মীপুর-১: শাহাদাত হোসেন সেলিমের জয় কেন?
এই আসনে তরুণ ভোটারদের বড় অংশ সক্রিয় ছিলেন। নির্বাচনি মাঠে ব্যাপক প্রচার, ঘন ঘন উঠোন বৈঠক এবং স্থানীয় উন্নয়ন ইস্যুতে সরাসরি অবস্থান— এসব বিষয় তার পক্ষে জনমত তৈরি করে। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর তুলনায় দলীয় কর্মীদের সমন্বিত কাজও ছিল চোখে পড়ার মতো। এ আসনে বিএনপির প্রার্থী শাহাদাত হোসেন সেলিম পেয়েছেন ৮৬ হাজার ৮১১ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী এনসিপির মাহবুব আলম পেয়েছেন ৫৯ হাজার ২৬৫ ভোট।
লক্ষ্মীপুর-২: আবুল খায়ের ভূঁইয়া কীভাবে এগিয়ে গেলেন?
এ আসনে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও দীর্ঘদিনের সামাজিক সম্পৃক্ততা বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করেছে। ভোটারদের সঙ্গে ধারাবাহিক যোগাযোগ এবং কেন্দ্রভিত্তিক শক্ত অবস্থান তাকে এগিয়ে দেয়। এর আগে ২০০১ সালে এ আসন থেকে বেগম খালেদা জিয়া নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিজয় অর্জন করেন। অনেক ভোটার ‘চেনা মানুষ’ বিবেচনায় ভোট দিয়েছেন বলে জানা যায়।
এ আসনে বিএনপির আবুল খায়ের ভূঁইয়া পেয়েছেন ১ লাখ ৪৬ হাজার ৩২১ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের এস ইউ এম রুহুল আমিন ভূঁইয়া পেয়েছেন ১ লাখ ৩৩ হাজার ৬৯৮ ভোট। আবুল খায়ের ভূঁইয়া ১২ হাজার ৬২৩ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হন।
লক্ষ্মীপুর-৩: শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানির পক্ষে কী কাজ করেছে?
রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, শক্তিশালী দলীয় কাঠামো এবং নির্বাচন-পূর্ব গণসংযোগ— এই তিনটি বিষয় ছিল শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানির জয়ের পেছনে প্রধান অনুঘটক।
জাতীয় রাজনীতির প্রভাবও এ আসনের ভোটে প্রতিফলিত হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। অনেকে মনে করেছেন, এ্যানি নির্বাচিত হলে যদি বিএনপি সরকার গঠন করে, তাহলে তিনি মন্ত্রী হতে পারেন।
এ আসনে বিএনপির শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি পেয়েছেন ১ লাখ ৩৫ হাজার ৬১২ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের রেজাউল করিম পেয়েছেন ১ লাখ ২২ হাজার ৮০২ ভোট। এ্যানি ১২ হাজার ৮১০ ভোট বেশি পেয়ে নির্বাচিত হন।
লক্ষ্মীপুর-৪: এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান কীভাবে আস্থা অর্জন করলেন?
এখানে ভোটাররা পরিবর্তনের বার্তা দিয়েছেন। তৃণমূল পর্যায়ে সরাসরি যোগাযোগ, তরুণদের সম্পৃক্ততা এবং স্থানীয় সমস্যাগুলো নিয়ে সরব অবস্থান আশরাফ উদ্দিন নিজানের পক্ষে জনসমর্থন তৈরি করে।
এ আসনে বিএনপির প্রার্থী আশরাফ উদ্দিন নিজান পেয়েছেন ১ লাখ ১৫ হাজার ১৯৯ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের এ আর হাফিজ উল্লাহ পেয়েছেন ৭৩ হাজার ৭৫৬ ভোট। ৪১ হাজার ৪৪৩ ভোটের বড় ব্যবধানে আশরাফ উদ্দিন নিজান বিজয়ী হন।
লক্ষ্মীপুরের চারটি সংসদীয় আসনে গণভোটে মোট ৬ লাখ ১৫ হাজার ৯৭৮ ভোট পেয়ে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হয়েছে। ‘না’ ভোট পড়েছে ২ লাখ ৫০ হাজার ৭৪৯টি।
চারটি আসনেই প্রভাব ফেলেছে প্রার্থীর ব্যক্তিগত ইমেজ ও গ্রহণযোগ্যতা। দলীয় কর্মীদের মাঠে সক্রিয় উপস্থিতি এবং অবকাঠামো উন্নয়ন, নদীভাঙন রোধ ও কর্মসংস্থান ইস্যু ভোটারদের সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেছে। তরুণ ভোটারদের অংশগ্রহণ, কেন্দ্রভিত্তিক ভোট ম্যানেজমেন্ট ও এজেন্টদের দক্ষতাও জয়ের অন্যতম নিয়ামক ছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, লক্ষ্মীপুরে ভোটাররা এবার ব্যক্তি ও তার কাজ— এই দুই বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।
নির্বাচন-পরবর্তী প্রতিক্রিয়া
ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দিতে পেরে সন্তুষ্ট। অনেকেই আশা করছেন, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা দ্রুত স্থানীয় সমস্যাগুলোর সমাধানে উদ্যোগ নেবেন। রাজনৈতিক নেতারাও ফল মেনে নিয়ে উন্নয়নমুখী রাজনীতির প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন।
শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে তারেক রহমানের নির্দেশে আনন্দ মিছিল না করে চকবাজার মসজিদে আয়োজন করা দোয়া মাহফিলে অংশ নেন শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি। এ সময় নেতাকর্মীদের দায়িত্বশীল আচরণ করার নির্দেশ দেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মহাসচিব ও লক্ষ্মীপুর-৩ (সদর) আসনে বিজয়ী শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি।
তিনি বলেন, “তারেক রহমানের নেতৃত্বে আমরা নতুন বাংলাদেশ গড়ব। এটি কঠিন দায়িত্ব। এ দায়িত্ব নিয়ে তারেক রহমানের হাতকে শক্তিশালী করতে হবে। এজন্য সবার কাছে ও পাশে রেখে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে।”
ঢাকা/লিটন/রফিক