বগুড়ায় ৩০০ বছরের পুরনো খাউড়া মেলায় উৎসবের আমেজ
বগুড়া প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কারণে এ বছর বগুড়ার ঐতিহ্যবাহী পোড়াদহ মেলা না হলেও তার এক সপ্তাহের মধ্যেই জমে উঠেছে প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো শাজাহানপুরের খাউড়া মেলা, যা ছোট সন্ন্যাসী মেলা নামেও পরিচিত।
বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয় উপজেলার খোট্টাপাড়া ইউনিয়নের জালশুকা খাউড়া দহ এলাকায়।
মেলায় তিন শতাধিক দোকান বসে। বড় মাছ, মিষ্টি ও নানা পসরা নিয়ে পুরো এলাকা যেন উৎসবের মাঠে পরিণত হয়। জালশুকা, চান্দাই, নারিল্যা, খোট্টাপাড়া, বলদিপালান, পেরীহাট, মাদলা, চাচাইতারা, ধর্মগাছা, বাগবাড়ি, শেরকোল, নশিপুর, সোনাকানিয়া, কদমতলী, ধুনটসহ আশপাশের প্রায় ২০টি গ্রামে আত্মীয়-স্বজনের আগমনে ছড়িয়ে পড়ে ঈদের আমেজ। বিশেষ করে জামাইদের উপস্থিতিতে বাড়ি বাড়ি ছিল আনন্দের ছোঁয়া।
বড় মাছই প্রধান আকর্ষণ
পোড়াদহ মেলার মতো খাউড়া মেলারও মূল আকর্ষণ বড় আকারের মাছ। বাঘাইড়, বোয়াল, কাতলা, রুই, বিগ হেড, ব্লাড কার্পসহ বিভিন্ন প্রজাতির বড় মাছ কিনতে অনেকে সারা বছর অপেক্ষা করেন।
এবারের মেলায় ৩০ কেজি ওজনের একটি বাঘাইড় মাছ বিক্রি হয়েছে ৬০ হাজার টাকায়। এছাড়া ১০ কেজি ওজনের একটি বড় মিষ্টি দর্শনার্থীদের দৃষ্টি কাড়ে, যার দাম ছিল প্রতি কেজি ৪০০ টাকা।
গাবতলীর মহিষাবান এলাকার ব্যবসায়ী শুঘ্র জানান, তিনি ছয়টি বড় বাঘাইড় মাছ এনেছেন। প্রতি কেজি ১২০০ টাকা দরে বিক্রি করছেন, বড়গুলোর দাম আরও বেশি।
‘মামা-ভাগ্নে মাছের দোকান’-এর মালিক মনু মিয়া জানান, সিরাজগঞ্জ থেকে আনা ২২ কেজির একটি কাতলার দাম চাওয়া হয়েছে ৩০ হাজার টাকা। দরদাম মিললে বিক্রি করবেন।
ক্রেতা-বিক্রেতাদের মতে, গত বছরের তুলনায় এবার মাছের দাম কিছুটা বেশি। মেলা ঘুরে দেখা গেছে, কাতলা প্রতি কেজি ৬০০ থেকে ৯০০ টাকা, বিগ হেড ৩৫০-৪৫০, রুই ৪০০-৬০০, পাঙ্গাস ৩০০-৪০০, ব্লাড কার্প ৪০০-৬০০, কার্পু ৩৫০-৪৫০, সিলভার ২৫০-৩৭০, বোয়াল ৬০০-৯০০ এবং আইড় ১২০০-১৪০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
গাবতলী উপজেলার মাছ ব্যবসায়ী আব্দুল মালেক বলেন, “দাম কিছুটা বাড়লেও বিক্রি ভালো হচ্ছে। তবে চাহিদা অনুযায়ী মাছ আনা সম্ভব হয়নি।”
মাদলা এলাকার আজিজার রহমান জামাইকে সঙ্গে নিয়ে ২০ কেজি ওজনের একটি কাতলা ১২ হাজার টাকায় কিনেছেন। তিনি বলেন, প্রতিবছর মেলা উপলক্ষে মেয়ে-জামাই ও আত্মীয়রা বাড়িতে আসেন, তাই বড় মাছ কেনা যেন এক ধরনের রেওয়াজ।
মিষ্টি ও নিত্যপণ্যের সমাহার
মেলায় মাছের পাশাপাশি ছিল হরেক রকমের মিষ্টি, খেলনা, চুড়ি-ফিতা, লোহার তৈজসপত্র, কাঠের আসবাব, হলুদ, পান খাওয়ার চুনসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা সামগ্রী। শিশু-কিশোরদের কোলাহল আর ক্রেতাদের ভিড়ে সারাদিন সরগরম ছিল মেলা প্রাঙ্গণ।
নারিল্যার আব্দুর রউফ বলেন, “এই দিনটি তাদের কাছে ঈদের মতোই আনন্দের। বগুড়া শহর থেকে আসা শামীম হাসান রুদ্র জানান, পোড়াদহ মেলা না হওয়ায় তিনি এবার খাউড়া মেলায় মাছ কিনতে এসেছেন। দাম একটু বেশি হলেও বড় মাছের জন্য এ মেলায় আসতেই হয়।”
নশিপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা ইঞ্জিনিয়ার রোকন তালুকদার বলেন, “এবারের মেলায় কোনো চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটেনি। স্থানীয়দের কাছে এটি বড় উৎসব, প্রশাসনও ছিল সতর্ক।”
শাজাহানপুর থানার অফিসার ইনচার্জ জানান, যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল। প্রতি বছরের মতো এবারও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে মেলা সম্পন্ন হয়েছে।
ঢাকা/ এনাম/জান্নাত