ঢাকা     বুধবার   ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ||  ফাল্গুন ১৩ ১৪৩২ || ৮ রমজান ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

গাইবান্ধার কৃষক সিন্ডিকেটে অসহায়, বাড়ছে উৎপাদন খরচ

মাসুম লুমেন, গাইবান্ধা || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৯:০৮, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬  
গাইবান্ধার কৃষক সিন্ডিকেটে অসহায়, বাড়ছে উৎপাদন খরচ

বেশি দামে সার কিনতে হওয়ায় কৃষকের ফসলের উৎপাদন খরচ বেড়েছে।

চলতি বছরের ১৭ জানুয়ারি রাত সাড়ে ১০টার দিকে গাইবান্ধা সদর উপজেলার খোলাহাটি ইউনিয়নের গাইবান্ধা-সুন্দরগঞ্জ সড়কের কদমতলী নামক স্থানে ক্রয়ের রশিদ না থাকায় ভ্যানগাড়িসহ ২০ বস্তা সার জব্দ করে সদর উপজেলা কৃষি বিভাগ। 

পর দিন ১৮ জানুয়ারি সকালে সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাকিবুল আলম ও সহকারী কমিশনার (ভূমি)  জাহাঙ্গীর আলম বাবুর নেতৃত্বে সদর উপজেলার তুলসীঘাট বাজারে অভিযান পরিচালনা করা হয়। 

আরো পড়ুন:

এ সময় সার কালোবাজারি ও অবৈধ মজুদের অভিযোগে খুচরা সার ব্যবসায়ী খাজা মিয়া, শাহাদাত হোসেন ও নির্মল বাবুর ঘর থেকে ৩৪ বস্তা সার (ডিএপি) জব্দ করা হয়। এছাড়া অবৈধ মজুদের অপরাধে ২০ হাজার টাকা নগদ জরিমানাও করা হয়।

এর ঠিক ১০ দিন পর ২৭ জানুয়ারি রাত ৮টার দিকে একই স্থান গাইবান্ধা শহরের কদমতলী এলাকা থেকে ক্রয়ের রশিদ না থাকায় ২০০ বস্তা ইউরিয়া সারবোঝাই একটি  মিনি ট্রাক আটক করে স্থানীয়রা। খবর পেয়ে সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এসে সারগুলো সদর উপজেলা পরিষদ  চত্বরে নিয়ে যান। অবৈধ পণ্য পরিবহনের কারণে ট্রাক চালক মিন্টু মন্ডলকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচারক সহকারী কমিশনার (ভূমি) জাহাঙ্গীর আলম। জব্দকৃত ২০০ বস্তা সার জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালকের জিম্মায় দেওয়া হয়।

পরে জানা যায়, জেলার অন্য উপজেলা পলাশবাড়ির ডিলার মেসার্স রাম চন্দ্র সাহা মহদিপুর ইউনিয়নের জন্য বরাদ্দকৃত সার সদর উপজেলার তুলসীঘাট বাফার গোডাউন থেকে উত্তোলন করে মহদীপুর ইউনিয়নে না নিয়ে সদর উপজেলার মাঠেরহাটে নিয়ে যাচ্ছিলেন। সার কালোবাজারির এমন দু-চারটি ঘটনা সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য স্পষ্ট করে।

নদী ভাঙ্গন ও মঙ্গাপীড়িত জেলা গাইবান্ধা। এখানে উৎপাদিত রবিশস্যর মধ্যে ধান অন্যতম।  জেলার ১৩টি উপজেলা জুড়ে এখন চলছে ইরি-বোরো আবাদের মৌসুম। ধান উৎপাদন এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন রাসায়নিক সার। আর এই ইরি-বোরো কিংবা আমন এই দুই মৌসুম এলে জেলাজুড়ে শুরু হয় ব্যবসায়ীদের সার সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কার্যালয় সূত্র জানায়, জেলার সাতটি উপজেলায় ১ লাখ ২৯ হাজার ২০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এই পরিমাণ জমির জন্য ইউরিয়া ৪০ হাজার ১২৯ মেট্রিক টন, টিএসপি ১৬ হাজার ৬৫০ মেট্রিক টন, পটাশ ২১ হাজার ৪৫৯ মেট্রিক টন ও ডিএপি সার ১৬ হাজার ৯১৬ মেট্রিক টন সারের প্রয়োজন। এখন পর্যন্ত ইউরিয়া প্রায় ৪০ হাজার মেট্রিক টন, টিএসপি ও পটাশ পুরোটা এবং ডিএপি প্রায় ১৩ হাজার মেট্রিক টন মজুদ আছে। 

এসব সার বিসিআইসির ১১১ এবং বিএডিসির ১১৮ জন ডিলারের মাধ্যমে সরাসরি জেলার কৃষকদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে। বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বোরো রোপনের উপযুক্ত সময়। কৃষকরা এখন বোরো রোপনে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। তারা ধানের চারা রোপণের সময় টিএসপি, পটাশ ও ডিএপি সার প্রয়োগ করেন। বর্তমানে ইউরিয়া সারের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে।

প্রতিকেজি ইউরিয়া ২৭ টাকা, টিএসপি ২৭ টাকা, পটাশ ২০ টাকা ও ডিএপি ২১ টাকায় বিক্রির জন্য সরকারি মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। গাইবান্ধার বিভিন্ন হাট-বাজারে খুচরা বিক্রেতারা প্রতিকেজি সার ৩ থেকে ৫ টাকা বেশিতে বিক্রি করছেন।

কৃষকদের অভিযোগ, খুচরা বিক্রেতারা তাঁদের কাছ থেকে সারের দাম বেশি নিচ্ছেন। কিন্তু তারা কোনো রশিদ দিচ্ছেন না। রশিদ চাইলে তার কাছে সার বিক্রি করছেন না। ডিলার ও খুচরা সার বিক্রেতারা তাদের দোকানে লোক দেখানোর জন্য মূল্য তালিকা টাঙিয়ে রেখেছেন। কিন্তু সেই দামে সার বিক্রি করছেন না। তারা প্রতিকেজি সার ৩ থেকে ৫ টাকা বেশি দামে বিক্রি করছেন। প্রতিবাদ করেও লাভ হচ্ছে না।

গাইবান্ধা সদর উপজেলার খোলাহাটি ইউনিয়নের মাঠবাজার গ্রামের কৃষক সাগির মিয়া জানান, গত বছরের তুলনায় এ বছর বোরো চাষে খরচ বেড়েছে। বিশেষ করে প্রতিকেজি সার ৩ থেকে ৫ টাকা বেড়েছে। পাশাপাশি এবার কীটনাশকের দাম ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বেড়েছে। ফলে বোরো রোপণে উৎপাদন খরচ আগের তুলনায় বেড়েছে।

সদর উপজেলার মালিবাড়ি ইউনিয়নের কচুয়ার খামার গ্রামের কৃষক মামুন মিয়া বলেন, ‘‘প্রতি বছরের মতো এ বছরও বাড়তি দামে সার ও কীটনাশক কিনতে হচ্ছে। আমার ৩০ থেকে ৩৫ বস্তা ইউরিয়া সারসহ অন্যান্য সার কিনতে হয়। কিন্তু ডিলারের কাছে থেকে এক বস্তা সারও ক্রয় করতে পারিনি। বাইরের খুচরা দোকান থেকে বস্তা প্রতি ১৫০ থেকে ২০০ টাকা বেশি দিয়ে কিনতে হচ্ছে।’’

এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সদর উপজেলার  কয়েকজন খুচরা সার বিক্রেতা বলেন, ‘‘ইচ্ছে করে সারের দাম বেশি নেওয়া হয় না। ডিলাররা আমাদের কাছে বেশি দাম রাখায়, বাধ্য হয়ে বেশি দামে সার বিক্রি করছি।’’ 

মেসার্স লতিফ হক্কানি, নুরুল আমিন হক্কানিসহ কয়েকজন ডিলারের সঙ্গে কথা বললে তারা বলেন, নিয়ম মেনেই তারা সার বিক্রি করছেন। প্রতিটি সারের বস্তা বিক্রির ক্রয় রশিদ দেওয়া হয়। কৃত্রিম সার সংকট বা সিন্ডিকেট করে সার বিক্রির অভিযোগ অস্বীকার করেন তারা।

এ সব বিষয়ে গাইবান্ধা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক আতিকুল ইসলাম রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, জেলায় সারের সংকট নেই। এছাড়া বাফার গুদামে সকল প্রকার ৮ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন সার মজুদ আছে। গত জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে অতিরিক্ত অর্থ আদায় ও ক্রয় রশিদ ছাড়া সার বিক্রির অভিযোগে তিন ব্যবসায়ীকে নগদ অর্থ জরিমানা ও ভবিষ্যতের জন্য সতর্ক করা হয়েছে। নিয়মিত বাজার তদারকি করা হচ্ছে। 

ঢাকা/মাসুম/বকুল

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়