ঢাকা     মঙ্গলবার   ০৩ মার্চ ২০২৬ ||  ফাল্গুন ১৮ ১৪৩২ || ১৩ রমজান ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

স্ট্রবেরিতে ৭৫ কোটি টাকা বাণিজ্যের আশা

মেহেদী হাসান শিয়াম, চাঁপাইনবাবগঞ্জ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৪:২২, ৩ মার্চ ২০২৬   আপডেট: ১৪:২৪, ৩ মার্চ ২০২৬
স্ট্রবেরিতে ৭৫ কোটি টাকা বাণিজ্যের আশা

স্ট্রবেরি

আমের রাজধানী হিসেবে পরিচিত চাঁপাইনবাবগঞ্জে স্ট্রবেরির বাম্পার ফলন হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া আর উন্নত জাতের চারার কারণে জেলায় এবার এই দামি ফলের আবাদ হয়েছে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি। কৃষি বিভাগ আশা করছে, চলতি মৌসুমে জেলাজুড়ে প্রায় ৭৫ কোটি টাকার স্ট্রবেরি বেচাকেনা হবে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছর ধরে চাঁপাইনবাবগঞ্জে স্ট্রবেরি চাষে তারতম্য দেখা গেছে। ২০২৩ সালে ১০০ হেক্টর জমিতে চাষ হলেও ২০২৪ সালে তা কমে ৮২ হেক্টরে নেমেছিল। তবে, এ বছর ১১৫ হেক্টর জমিতে ফলটির আবাদ করেছেন কৃষকরা। সবচেয়ে বেশি স্ট্রবেরি চাষ হচ্ছে শিবগঞ্জ উপজেলায়। 

আরো পড়ুন:

এবার প্রতি হেক্টরে গড়ে ১৩ টন করে স্ট্রবেরি পাওয়া যাচ্ছে। সেই হিসেবে জেলায় মোট ১ হাজার ৪৯৫ টন স্ট্রবেরি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। বাজারে এই ফলটি প্রতিকেজি গড়ে ৫০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এই দাম বজায় থাকলে মৌসুমে মোট বিক্রির অংক দাঁড়াবে প্রায় ৭৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা।

শিবগঞ্জের কালুপুর দক্ষিণপাড়ার কৃষক রেজাউল করিম বলেন, “মৌসুমের শুরুতে অনেক বেশি দামে ফল বিক্রি করতে পেরেছিলাম। শুরুতে প্রতি কেজি স্ট্রবেরি দাম ছিল প্রায় ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত। বর্তমানে বাজারে স্ট্রবেরির সরবরাহ বেশি থাকায় দাম কম। এবার ফলন ভালো হওয়ায় দাম কমলেও কৃষকরা খুশি। অল্প সময়ে বেশি লাভ হওয়ায় সাধারণ কৃষকদের মধ্যে স্ট্রবেরি চাষে আগ্রহ দিনদিন বাড়ছে।”

কৃষক ঠকিয়ে লাভবান ফড়িয়া: মাঠে বাম্পার ফলন ও বাজারে উচ্চমূল্য থাকলেও তার সুফল পাচ্ছেন না প্রকৃত স্ট্রবেরি কৃষকরা এমন অভিযোগ রয়েছে। মূলত মধ্যস্থতাভোগী বা ফড়িয়াদের সিন্ডিকেটের কারণেই কৃষকরা কাঙ্ক্ষিত লাভ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। 

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে প্রতিকেজি স্ট্রবেরি কৃষকের কাছ থেকে মান ও রকমভেদে মাত্র ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় কিনছেন ফড়িয়ারা। সেই একই স্ট্রবেরি খুচরা বাজারে হাতবদল হয়ে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো- রাজধানীসহ বড় বড় শহরের সুপারশপগুলোতে এই একই স্ট্রবেরি ৮০০ থেকে হাজার টাকা কেজি দরেও বিক্রি হতে দেখা যাচ্ছে।

স্ট্রবেরি চাষি ওয়াসিম বলেন, “বাজারে চাহিদা কম থাকার অজুহাত দিয়ে ফড়িয়ারা আমাদের কাছ থেকে নামমাত্র দামে ফলটি কিনছেন। স্ট্রবেরি পেকে গেলে বেশিক্ষণ রাখা যায় না, পচে যায়। বাড়িতে রাখার বা হিমায়িত করার কোনো ব্যবস্থা নেই বলে আমরা অনেকটা বাধ্য হয়েই ফড়িয়াদের দেওয়া দামে ফল ছেড়ে দিচ্ছি। আমরা ঘাম ঝরিয়ে উৎপাদন করি, আর লাভের সবটুকু নিয়ে যাচ্ছে মধ্যস্থতাকারীরা।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ফড়িয়া বলেন, লাভের আশায় কিছু কমবেশ করে স্ট্রবেরি বেঁচতে হয়। আমরা যে আহামরি খুব লাভ করি তাও না।

পরিবহণে বাড়ছে খরচ ও ঝুঁকি: স্ট্রবেরি আবাদের উচ্চ খরচের পাশাপাশি পরিবহণ ব্যয় এখন কৃষকদের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্ট্রবেরি অত্যন্ত পচনশীল হওয়ায় দ্রুত বাজারজাত করতে চাষিরা কুরিয়ার সার্ভিস ও যাত্রীবাহী বাসের ওপর নির্ভরশীল। এতে ৫ কেজির একটি কার্টুন ঢাকা বা অন্য কোনো দূরবর্তী জেলায় পাঠাতে অন্তত ৬০ টাকা খরচ হচ্ছে। গড়ে একজন চাষি প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৩০ কেজি পর্যন্ত স্ট্রবেরি পরিবহণ করেন, যার পেছনে বিশাল অঙের টাকা চলে যাচ্ছে।

চাষি আব্দুর রাজ্জাক বলেন, “আমরা যদি সরকারিভাবে কোনো পরিবহণের সুবিধা পেতাম, তবে নামমাত্র খরচে বা বিনামূল্যে এই ফলগুলো ঢাকায় পাঠাতে পারতাম। পরিবহণ খরচ কমলে আমরা লাভবান হতে পারতাম।”

যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা: চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. ইয়াছিন আলী বলেন, “গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার স্ট্রবেরি চাষাবাদ বেড়েছে। আমরা মাঠ পর্যায়ে কৃষকের পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি। আবহওয়া অনুকূলে থাকায় উচ্চ মূল্যের এ ফলটির বাম্পার ফলন হয়েছে। প্রতি হেক্টরে প্রায় ১৩টন করে স্ট্রবেরির আবাদ হয়েছে। এবার ৭৫ কোটি টাকার স্ট্রবেরি বাণিজ্যের সম্ভাবনা রয়েছে।”

পরিবহণ ও বিপণন সংকটের বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মোমিনুল ইসলাম বলেন, “চাষিরা আগে আমাদের কাছে এমন কোনো দাবি জানাননি। তবে, তাদের এই দাবিটি অত্যন্ত যৌক্তিক। দ্রুত পরিবহণের ব্যবস্থা থাকলে কৃষকরা অবশ্যই ন্যায্যমূল্য পেতেন। তারা আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি জানালে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে সুপারিশ পাঠাব এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করব।”

ঢাকা/মাসুদ

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়