গাইবান্ধায় ফেব্রুয়ারি মাসে ৫ খুন
গাইবান্ধা প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার চক গোবিন্দপুর এলাকার নিজ বাড়ি থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রাইমারি স্কুলের সহকারী শিক্ষিকার হাত-পা বাঁধা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
গাইবান্ধায় ফেব্রুয়ারি মাসে পাঁচজন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে এক আইনজীবীর সহকারীকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। গণপিটুনির শিকার হয়ে মারা গেছেন দুজন। নিজ ঘর থেকে এক শিক্ষকের হাত-পা বাঁধা মরদেহ এবং সেপটিক ট্যাঙ্ক কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার হয়। যা এলাকাবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরদিন (১৩ ফেব্রুয়ারি) রাত ৮টার দিকে গাইবান্ধা সদর উপজেলার বল্লমঝাড় ইউনিয়নের খামার বল্লমঝাড় গ্রামের শ্রী নিরঞ্জন কুমারের ছেলে গাইবান্ধা আদালতের আইনজীবীর সহকারী সুজন মহুরীকে কুড়াল দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে সদর থানায় মামলা হলেও এখনো আসামি গ্রেপ্তার হয়নি। পুলিশের ভাষ্য, তদন্ত সাপেক্ষে হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের খোঁজ করা হচ্ছে।
আরো পড়ুন: ভোটের পরদিন গাইবান্ধায় যুবককে কুপিয়ে হত্যা
গাইবান্ধা সদর থানার ওসি আব্দুল্লাহ আল মামুন সে সময় জানান, কারা কী কারণে সুজনকে হত্যা করেছে, তা এখনো জানা যায়নি।
২০ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে ঢাকা থেকে গাইবান্ধার বাসে করে একজন পুরুষ ও একজন নারী পলাশবাড়ীর ঠুঠিয়াপুকুর বাজারে নামেন। সেখান থেকে সাদুল্লাপুর সড়ক ধরে ইদিলপুর ইউনিয়নের মাদারহাট খেয়াঘাট (ভাঙা সেতু) এলাকায় পৌঁছালে দুই মোটরসাইকেলে ছয়জন ছিনতাইকারী তাঁদের পথরোধ করে। ছিনতাইকারীরা তাদের কাছ থেকে স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা ছিনিয়ে নেয়।
মোজাহিদপুর গ্রামের দারোগার বাজারে এসে মোটরসাইকেলসহ তিন ছিনতাইকারী গ্রামবাসীর হাতে আটক হন। পরে একজন সুকৌশলে পালিয়ে গেলেও পলাশবাড়ী উপজেলার লেবু মিয়া ওরফে ভন্ডল (২৪) ও মস্তাপুর গ্রামের মঈনুল ইসলামকে (৫০) গ্রামবাসী গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করেন। এ ঘটনায় নিহতের পরিবার থেকে অজ্ঞাত গ্রামবাসীর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
আরো পড়ুন: গাইবান্ধায় ছিনতাইকারী সন্দেহে গণপিটুনিতে নিহত ২
সাদুল্লাপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ আব্দুল আলীম জানান, ভোরে তিনজন ব্যক্তি একটি মোটরসাইকেল নিয়ে মোজাহিদপুর এলাকায় যান। পথে তারা এক ব্যক্তিকে ছিনতাই করার চেষ্টা করেন। ভুক্তভোগীর চিৎকার শুনে আশেপাশের লোকজন ছুটে আসেন। এসময় একজন পালিয়ে গেলেও অন্য দুজন ছিনতাইকারীকে ধরে স্থানীয়রা গণধোলাই দেন। ঘটনাস্থলেই তারা মারা যান।
২২ ফেব্রুয়ারি রবিবার। এদিন বিকালে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার তালুককানুপুর ইউনিয়নের চৌধুরীপাড়া গ্রামের একটি সেপুটিক ট্যাংক থেকে নুরমা আক্তার (১৬) নামে দশম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রীর গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এর আগে, দুপুরের দিকে নুরমা আক্তার নিজবাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়।
নুরমা আক্তারের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় মানুষের মনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। নিহতের পরিবার থেকে অজ্ঞাত আসামি করে মামলা করা হয়।
২৮ ফেব্রুয়ারি শনিবার দুপুরের দিকে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার চক গোবিন্দপুর এলাকায় নিজ বাড়ি থেকে শামসুন্নাহার রুমা (৪৫) নামের এক স্কুল শিক্ষিকার হাত-পা বাঁধা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
আরো পড়ুন: গাইবান্ধায় স্কুল শিক্ষিকার হাত-পা বাঁধা মরদেহ উদ্ধার
শামসুন্নাহার রুমা স্থানীয় তালতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা ছিলেন। স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভাষ্য, স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ির কারণে শামসুন্নাহার রুমা বাড়িতে একাই থাকতেন। শনিবার দুপুরে প্রতিবেশীরা ওই শিক্ষিকার ঘরের দরজা খোলা এবং আসবাবপত্র এলোমেলো দেখতে পান। ঘরের ভেতরে হাত-পা বাঁধা ও গলায় ওড়না পেঁচানো অবস্থায় শিক্ষিকার মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে তারা পুলিশকে খবর দেন। রংপুর থেকে আসা গোয়েন্দা পুলিশ ও জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
গোবিন্দগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোজাম্মেল হক বলেছেন, “কে বা কারা শিক্ষিকার ঘরে প্রবেশ করে হাত-পা বেঁধে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করে পালিয়ে গেছে। লাশ উদ্ধার করে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশ তদন্ত করছে।”
গাইবান্ধা সামাজিক সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর কবির তনু বলেন, “নির্বাচিত সরকার এলেও পুলিশ এখনো সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে না। নৃশংস হত্যাকাণ্ড সমাজে ভীষণ নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সমাজে এক শ্রেণির মানুষের মধ্যে বর্বরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এজন্য সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই। আমরা চাই, দ্রুত এসব হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার। মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিতে পুলিশ জোরালো ভূমিকা পালন করবে এমনটি প্রত্যাশা করছি।”
গাইবান্ধা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এ সার্কেল) বিদ্রোহ কুমার কুন্ডু বলেন, “হত্যাকাণ্ড কারোরই কাম্য নয়। নির্বাচিত সরকার এসেছে। আশা করি, হত্যাকাণ্ড আর ঘটবে না। পুলিশ আগের চেয়ে আরো বেশি তৎপর রয়েছে।”
ঢাকা/মাসুম/মাসুদ