ঢাকা     শনিবার   ২৩ মে ২০২৬ ||  জ্যৈষ্ঠ ৯ ১৪৩৩ || ৭ জিলহজ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

অনিয়ন্ত্রিত পাথর উত্তোলনে বদলে গেছে লোভা নদীর গতিপথ: গবেষণা

মোসাইদ রাহাত, সিলেট || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৮:৩৮, ২৩ মে ২০২৬   আপডেট: ১৮:৩৯, ২৩ মে ২০২৬
অনিয়ন্ত্রিত পাথর উত্তোলনে বদলে গেছে লোভা নদীর গতিপথ: গবেষণা

সিলেটের সীমান্তবর্তী পাহাড়ি নদীগুলোর মধ্যে অন্যতম লোভা নদী।

সিলেটের সীমান্তবর্তী পাহাড়ি নদীগুলোর মধ্যে লোভা নদী একসময় ছিল স্বচ্ছ পানি, পাথরের সৌন্দর্য আর জীববৈচিত্র্যের এক অনন্য আধার। বর্ষায় পাহাড়ি ঢলে ফুলে-ফেঁপে ওঠা এই নদী শুধু প্রকৃতিপ্রেমী বা পর্যটকদেরই আকর্ষণ করত না, স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি ও পরিবেশের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়ন্ত্রিত পাথর উত্তোলন, ভারী যন্ত্রের ব্যবহার এবং পরিকল্পনাহীন ব্যবস্থাপনার কারণে এখন নদীটি তার স্বাভাবিক রূপ হারাতে বসেছে। জাতীয় নদী দিবস সামনে রেখে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক এক গবেষণায় লুভা নদীর ভয়াবহ বাস্তবতা উঠে এসেছে।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী সেল ‘রিপোর্টস সাসটেইনেবিলিটি’-তে প্রকাশিত ‘সোসিও-ইকোলজিক্যাল ইমপ্যাক্টস অব রিভারাইন অ্যাগ্রিগেট এক্সট্র্যাকশন অ্যান্ড পাথওয়েজ টুওয়ার্ড সাসটেইনেবল ম্যানেজমেন্ট’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে নদী থেকে অনিয়ন্ত্রিতভাবে পাথর উত্তোলনের কারণে লোভা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, নদীতল, পলি পরিবহন ব্যবস্থা ও প্রতিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শাহ মো. আতিকুল হকসহ দেশ-বিদেশের তিনজন শিক্ষার্থী। এতে স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ, মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ এবং স্থানীয় মানুষের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে নদীর পরিবর্তন মূল্যায়ন করা হয়েছে।

আরো পড়ুন:

গবেষণায় দেখা গেছে, নদীর ভেতরে ভারী যন্ত্র ব্যবহার করে যেভাবে পাথর উত্তোলন করা হয়েছে, তা নদীর স্বাভাবিক পুনর্গঠন ক্ষমতার চেয়েও বেশি ছিল। ফলে কোথাও নদীর তলদেশ অস্বাভাবিকভাবে গভীর হয়েছে, কোথাও আবার পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এতে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ ও পলি পরিবহন প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। গবেষকরা বলছেন, নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ফলে নদীতীরের ভাঙন বেড়েছে এবং বন্যার ঝুঁকিও বৃদ্ধি পেয়েছে।

গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, পাথর উত্তোলনের ফলে নদীর পানির স্বচ্ছতা কমে গেছে এবং জলজ প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হয়েছে। নদীর ভেতরে তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত। এসব কারণে মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর স্বাভাবিক প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। নদীতীরবর্তী বন্যাপ্রবণ এলাকাগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে বর্ষাকালে পাহাড়ি ঢল নামলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় আকস্মিক ভাঙন ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

তারা বলছেন, নদীগুলোতে খননযন্ত্র ও ড্রেজার ব্যবহারের কারণে শুধু নদীতলই নয়, আশপাশের কৃষিজমি ও পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক এলাকায় নদীর তীর ধসে বসতভিটা ঝুঁকিতে পড়েছে। আবার কোথাও কোথাও নদীর স্বাভাবিক গভীরতা পরিবর্তিত হওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে পানি কমে যাচ্ছে।

গবেষণায় সামাজিক বাস্তবতার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে। লোভা নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত বহু শ্রমিক, নৌকাচালক ও ব্যবসায়ী পাথর উত্তোলন বন্ধ হওয়ার পর কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। সাক্ষাৎকারে অংশ নেওয়া প্রায় ৯৫ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, উত্তোলন বন্ধ হওয়ার পর তারা আয় হারিয়েছেন বা বেকার হয়েছেন। প্রায় ৮৮ শতাংশ মানুষ বলেছেন, তাদের আর্থিক অবস্থা আগের তুলনায় খারাপ হয়েছে।

তবে গবেষকরা মনে করছেন, পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে উত্তোলন নিয়ন্ত্রণ জরুরি হলেও বিকল্প কর্মসংস্থান ছাড়া শুধু নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক সংকট তৈরি করতে পারে। তাই টেকসই ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের জন্য বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২১ সালে সরকারিভাবে পাথর উত্তোলন বন্ধ হওয়ার পর নদীর কিছু অংশে প্রাকৃতিক পুনরুদ্ধারের লক্ষণ দেখা গেছে। নদীর মূল প্রবাহপথে পানির গতিশীলতা কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে এবং কিছু এলাকায় পলি জমা শুরু হয়েছে। তবে নদীতীরের বড় বড় খনিগর্ত এবং ক্ষতিগ্রস্ত বন্যাপ্রবণ অঞ্চল এখনো আগের ক্ষত বহন করছে। গবেষকদের মতে, শুধু উত্তোলন বন্ধ করলেই নদী পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফিরবে না। এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি পুনরুদ্ধার কার্যক্রম প্রয়োজন।

গবেষণায় টেকসই নদী ব্যবস্থাপনার জন্য কয়েকটি সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নদীর সক্রিয় প্রবাহ এলাকা থেকে উত্তোলন সীমিত করা, ছোট পরিসরে ও নিয়ন্ত্রিতভাবে পাথর উত্তোলন, মৌসুমভিত্তিক উত্তোলন নীতিমালা প্রণয়ন, স্থানীয় জনগণকে ব্যবস্থাপনায় সম্পৃক্ত করা, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত নদীতীর ও বন্যাপ্রবণ এলাকা পুনরুদ্ধার করা।

নদী ও পরিবেশ রক্ষা সংগঠনের নেতারা বলছেন, সিলেট অঞ্চলের নদীগুলো ভূতাত্ত্বিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল। পাহাড়ি ঢল, অতিবৃষ্টি ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এসব নদীর ওপর স্বাভাবিকভাবেই চাপ বাড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অনিয়ন্ত্রিত খনন ও সম্পদ আহরণ। ফলে নদীগুলোর স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।

সিলেটের নাগরিক আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক সুরমা রিভার ওয়াটারকিপার ও ধরিত্রী রক্ষায় আমরা- ধরা সিলেটের সদস্য সচিব আব্দুল করিম চৌধুরী বলেন, নদী শুধু পাথর বা বালুর উৎস নয়। এটি একটি জীবন্ত প্রতিবেশ ব্যবস্থা। নদী ধ্বংস হলে তার প্রভাব কৃষি, মৎস্যসম্পদ, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবনযাত্রার ওপর পড়ে।

তিনি আরও বলেন, ‘‘আমরা উন্নয়নের নামে নদীকে খনি বানিয়ে ফেলেছি। এখনও সিলেটের বিভিন্ন সীমান্ত নদী থেকে পাথর উত্তোলন হচ্ছে। লোভা নদীতে পাথর উত্তোলন নিষিদ্ধ করা হলেও রাতের আধারে পাথর উত্তোলন হয়েছে। নদীকে শুধু রাজস্ব আয়ের উৎস হিসেবে দেখলে চলবে না। নদীর পরিবেশগত মূল্য অনেক বড়। একটি নদী ধ্বংস হলে তার প্রভাব বহু বছর ধরে থাকে এবং তা পুরো অঞ্চলের পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।’’ 

ঢাকা/বকুল

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়