দেয়াল ধসে নিভে গেল বৃদ্ধ কৃষকের স্বপ্ন, গাভী-বাছুর হারিয়ে এখন পথে
গাজীপুর (পূর্ব) প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম
ছবি: রাইজিংবিডি
বারবার সতর্ক করেছিলেন তিনি। কাঁপা কণ্ঠে প্রতিবেশীদের বলেছিলেন, “দেয়ালটা যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে, আমার গরুগুলো মরে যাবে, আমরাও বিপদে পড়তে পারি।” কিন্তু সেই আশঙ্কার কথা কেউ গুরুত্ব দেয়নি। অবশেষে যে দুর্ঘটনার ভয় তিনি দীর্ঘদিন ধরে বয়ে বেড়াচ্ছিলেন, সেটিই সত্যি হলো। পরিত্যক্ত একটি মাটির ঘরের দেয়াল ধসে পড়ে প্রাণ হারিয়েছে এক দুধেল গাভী ও একটি বাছুর। মুহূর্তেই নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার মরাশ গ্রামের ৭২ বছর বয়সী কৃষক মো. ছাদেকুর রহমান শেখ।
বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) দুপুরে ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় প্রায় তিন লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগী। ঘটনার পর রাতে নিজেই বাদী হয়ে কালীগঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন তিনি।
অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাকির হোসেন।
স্থানীয় সূত্র ও অভিযোগ থেকে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে ছাদেকুর রহমানের গোয়ালঘরের পাশে একটি পরিত্যক্ত মাটির ঘর ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিল। ঘরটির চাল অনেক আগে খুলে ফেলা হলেও মূল দেয়ালগুলো অরক্ষিত অবস্থায় রেখে দেওয়া হয়। বৃহস্পতিবার দুপুর দেড়টার দিকে হঠাৎ করে পরিত্যক্ত ঘরটির উত্তর পাশের দেয়াল ভেঙে ছাদেকুর রহমানের গোয়ালঘরের ওপর আছড়ে পড়ে। এ সময় ভেতরে থাকা একটি দুধেল গাভী ও একটি বাছুর দেয়ালের নিচে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই মারা যায়।
দুর্ঘটনার পর ছাদেকুর রহমান কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমি কতবার বলছি, দেয়ালটা ভেঙে ফেলেন। বলছিলাম, একদিন গরু-বাছুর মরে যাবে, মানুষও মরতে পারে। কেউ আমার কথা শোনেনি। আজ আমার সব শেষ হয়ে গেল। এই গাভীর দুধ বিক্রি করেই সংসার চলত। এখন আমি নিঃস্ব।”
ভুক্তভোগীর মেয়ে মারিয়া মিম বলেন, “আমাদের গোয়ালের পাশে যে দেয়াল ছিল, সেটি ভেঙে পড়েই গরুগুলো মারা গেছে। যদি ভেতরের বড় দেয়ালগুলো ভেঙে পড়ত, তাহলে হয়তো আজ আমি নিজেও বেঁচে থাকতাম না। প্রায় দেড় বছর ধরে আমরা দেয়ালটি অপসারণের জন্য বলে আসছি।”
তার অভিযোগ, সম্ভাব্য দুর্ঘটনা এড়াতে একাধিকবার সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ করা হলেও কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। উল্টো প্রতিবাদ করায় ভয়ভীতি ও হুমকির মুখেও পড়তে হয়েছে তাদের।
ঘটনার সময় আশপাশের লোকজন ছুটে এসে গরুগুলোকে উদ্ধারের চেষ্টা করেন। কিন্তু ভারী দেয়ালের নিচ থেকে তাদের জীবিত বের করা সম্ভব হয়নি।
প্রতিবেশী মোতাহার হোসেন শেখ (৭৫) বলেন, “খবর পেয়ে এসে দেখি সবাই চেষ্টা করছে। অনেক চেষ্টা করেও গরুগুলোকে বাঁচানো যায়নি। ঘরটির চাল অনেক আগেই খুলে ফেলা হয়েছিল। দেয়ালগুলোও যদি তখন ভেঙে দেওয়া হতো, তাহলে আজ এই ক্ষতি হতো না।”
তিনি আরো বলেন, “গাভীটি প্রতিদিন প্রায় পাঁচ কেজি দুধ দিত। ওই দুধ বিক্রি করেই তাদের সংসার চলত। এখন পরিবারটি বড় বিপদে পড়ে গেছে।”
স্থানীয় ইউপি সদস্য হুমায়ুন কবির ভূঁইয়া বলেন, “ছাদেকুর রহমান অত্যন্ত অসহায় ও দরিদ্র মানুষ। তিনি বহুবার তার চাচাতো ভাইকে পরিত্যক্ত দেয়াল ভেঙে ফেলার অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু তা করা হয়নি। অবহেলার ফলেই আজ দুটি গরুর প্রাণ গেছে এবং তিনি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ঘটনাটি খুব দুঃখজনক।”
ভুক্তভোগীর অভিযোগে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, দুর্ঘটনার পর ক্ষতিপূরণ দাবি করলে অভিযুক্তরা তাকে আবারো হুমকি দেন। স্থানীয়ভাবে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা হলেও কোনো সমাধান না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত থানার দ্বারস্থ হন তিনি।
কালীগঞ্জ থানার ওসি মো. জাকির হোসেন বলেন, “আমরা লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। ঘটনাটি তদন্তের জন্য একজন কর্মকর্তাকে ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয়দের মতে, ঝুঁকিপূর্ণ ও পরিত্যক্ত স্থাপনা সময়মতো অপসারণ করা হলে এমন মর্মান্তিক ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতো। একটি দেয়ালের অবহেলা আজ কেড়ে নিয়েছে দুটি প্রাণ, আর এক বৃদ্ধ কৃষকের জীবিকার শেষ সম্বল। এখন তিনি তাকিয়ে আছেন ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণের আশায়।
ঢাকা/রফিক/ফিরোজ