গাজীপুরে লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত জনজীবন, ধুঁকছে কৃষি ও খামার খাত
গাজীপুর (পূর্ব) প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম
ফাইল ফটো
দিনের তীব্র দাবদাহের পর মানুষ যখন একটু স্বস্তির আশায় সন্ধ্যার অপেক্ষায় থাকে, ঠিক তখনই নিভে যায় বিদ্যুতের আলো। কিছুক্ষণ নয়, কোথাও দুই ঘণ্টা, কোথাও তিন ঘণ্টা, আবার কোনো কোনো এলাকায় একটানা পাঁচ-ছয় ঘণ্টাও বিদ্যুৎ থাকে না। গাজীপুরের বিভিন্ন উপজেলায় চলমান এই দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিং এখন শুধু ভোগান্তির বিষয় নয়, বরং জনজীবন, কৃষি, শিক্ষা ও প্রাণিসম্পদ খাতের জন্য বড় সংকটে পরিণত হয়েছে।
বিশেষ করে শ্রীপুর, কালীগঞ্জ, কাপাসিয়া ও কালিয়াকৈর উপজেলার পল্লী বিদ্যুতের আওতাধীন এলাকাগুলোতে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। গ্রাহকদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ চলে গেলে কখন ফিরে আসবে তার কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। দিনে-রাতে বারবার বিদ্যুৎ বিভ্রাটে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
শ্রীপুরের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা জানান, বর্তমানে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১০ থেকে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। অনেক এলাকায় ৪০ থেকে ৫০ মিনিট পরপর বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। এতে রাতের ঘুম, শিশুদের পড়াশোনা এবং দৈনন্দিন কাজকর্ম সবকিছুই ব্যাহত হচ্ছে।
শ্রীপুর পৌরসভার লিচুবাগান এলাকার গৃহিণী মাহফুজা আক্তার বলেন, “দিনে কতবার বিদ্যুৎ যায় তার হিসাব রাখা কঠিন। গত এক সপ্তাহ ধরে প্রায় প্রতি রাতেই কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। গরমে শিশুদের নিয়ে ঘুমানো দায় হয়ে পড়েছে।”
বরমীর পাইটালবাড়ী গ্রামের রহিমা খাতুন বলেন, “ফ্রিজে রাখা মাছ, মাংস ও সবজি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় খাবার সংরক্ষণ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।”
একই ধরনের অভিযোগ করেন গৃহিণী নাজমা আক্তার। তার ভাষায়, “পরীক্ষার্থীরা পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারছে না। গরমে শিশু ও বয়স্করা সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছেন।”
লোডশেডিংয়ের সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে পোলট্রি শিল্পে। প্রচণ্ড গরমে খামারের ভেতরে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সার্বক্ষণিক বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। কিন্তু ঘনঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় খামারিরা চরম উদ্বেগে রয়েছেন।
গোসিংগা এলাকার খামারি মনির হোসেন জানান, আধাঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলেই খামারের ভেতরে তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। সম্প্রতি দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের কারণে তার খামারে প্রায় একশ’ ব্রয়লার মুরগি মারা গেছে।
আরেক খামারি সোহেল রানা বলেন, “বিদ্যুৎ না থাকলে ফ্যান ও পানির সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মুরগি অসুস্থ হয়ে পড়ে। এখন লাভ নয়, লোকসান ঠেকানোই বড় চ্যালেঞ্জ।”
তরুণ উদ্যোক্তা রফিকুল ইসলাম জানান, ঋণ নিয়ে খামার গড়ে তুলেছেন তিনি। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে খামারের স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি রোগবালাইও বাড়ছে।
খামারি আবু তাহেরের মতে, জেনারেটর চালিয়ে খামার সচল রাখতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে যাচ্ছে।
লোডশেডিংয়ের প্রভাব পড়েছে কৃষি ও ডেইরি খাতেও। বরমী ইউনিয়নের কৃষক মোবাশ্বের আলী বলেন, “নির্ধারিত সময়ে সেচ দিতে না পারায় ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা বাড়ছে। বিদ্যুৎ সংকট চলতে থাকলে কৃষকদের বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।”
দুগ্ধ খামারি জুবায়ের আহমেদ জানান, প্রচণ্ড গরমে গরুর দুধ উৎপাদন কমে গেছে। বিদ্যুৎ না থাকলে জেনারেটর চালাতে হয়, কিন্তু ডিজেলের বাড়তি খরচ বহন করা এখন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কাওরাইদ রেলওয়ে স্টেশন এলাকার বাসিন্দা সেলিম মিয়ার অভিযোগ, তাদের এলাকায় দিনে গড়ে ১৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলেও বাকি সময়জুড়ে লোডশেডিং থাকে। তিনি বলেন, “এভাবে চলতে থাকলে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন অসম্ভব হয়ে পড়বে।”
স্থানীয়দের ভাষ্য, শহরাঞ্চলের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের মাত্রা অনেক বেশি। ফলে বৈষম্যের অভিযোগও উঠছে বিভিন্ন এলাকায়।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, অতিরিক্ত গরমে বিদ্যুতের চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এর শ্রীপুর জোনাল অফিসের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) আনোয়ারুল আলম বলেন, উৎপাদন সীমাবদ্ধতার কারণে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
শ্রীপুরের মাওনা জোনাল অফিসের ডিজিএম শান্তনু রায় জানান, মাওনা জোনে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১২০ মেগাওয়াট এবং শ্রীপুর এলাকায় মোট চাহিদা প্রায় ২১২ মেগাওয়াট। সরবরাহ ঘাটতির কারণে প্রতিদিন লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।
অন্যদিকে গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর মহাব্যবস্থাপক আবুল বাশার আজাদ বলেন, সমিতির আওতাধীন এলাকায় মোট চাহিদা ৪৮৪ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৩১২ মেগাওয়াট। অর্থাৎ ১৭২ মেগাওয়াট ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতির কারণেই গড়ে প্রায় ৩০ শতাংশ লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
স্থানীয় অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যুৎ সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে কৃষি, পোলট্রি ও ডেইরি খাত বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে। উৎপাদন কমে গেলে বাজারে মুরগি, ডিম ও দুধের দাম বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাবেন।
বর্তমান বাস্তবতায় গাজীপুরের বিস্তীর্ণ গ্রামীণ জনপদে বিদ্যুতের অভাব শুধু একটি সেবাগত সংকট নয়; এটি মানুষের জীবনমান, খাদ্য উৎপাদন এবং স্থানীয় অর্থনীতির ওপর সরাসরি আঘাত হানছে। দ্রুত চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে এই সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঢাকা/রফিক/ফিরোজ