আইসিডিডিআর,বি গবেষণা
গ্রামাঞ্চলে প্রতি তিনজনে ২ কিশোরী মাসিকজনিত সমস্যায় ভুগছে
ঢাকার কানাডা ক্লাবে আয়োজিত এক সেমিনারে গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়।
বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে প্রায় প্রতি তিনজন কিশোরীর মধ্যে দুইজন মাসিকসংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছে। তাদের মধ্যে অনেকেই তীব্র ব্যথার কারণে দৈনন্দিন কাজকর্মে ব্যাঘাতের মুখে পড়ে এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কিশোরী স্কুলেও অনুপস্থিত থাকে। একই সঙ্গে কিশোর-কিশোরীদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার (এসআরএইচআর) বিষয়ে জ্ঞানের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে বলে উঠে এসেছে আইসিডিডিআর, বি পরিচালিত এক গবেষণায়।
বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) ঢাকার কানাডা ক্লাবে আয়োজিত এক সেমিনারে গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়।
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, নীতিনির্ধারক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের প্রতিনিধি এবং উন্নয়ন সহযোগীরা অংশ নেন।
সেমিনারে আইসিডিডিআর, বি পরিচালিত বালিয়াকান্দি হেলথ অ্যান্ড ডেমোগ্রাফিক সার্ভেইল্যান্স সিস্টেম (এইচডিএসএস)-এর আওতায় ২ হাজার ৭১৩ জন কিশোর-কিশোরীর ওপর ২৪ মাসব্যাপী পরিচালিত গবেষণার তথ্য তুলে ধরা হয়। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রতি চার মাস অন্তর অংশগ্রহণকারীদের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
গবেষণার এক অংশে ১২ থেকে ১৬ বছর বয়সী ১ হাজার ২৫৫ জন কিশোরীর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ৬৪ শতাংশ কিশোরী অন্তত একটি মাসিকসংক্রান্ত সমস্যায় ভুগেছে। সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে মাসিকের তীব্র ব্যথা বা ডিসমেনোরিয়া, যা ৫৬ শতাংশ কিশোরীর মধ্যে পাওয়া গেছে।
গবেষণায় আরো দেখা যায়, প্রতি তিনজন মেয়ের মধ্যে একজন গবেষণাকালীন সময়ে তিন বা তার বেশি বার তীব্র মাসিকব্যথার সম্মুখীন হয়েছে। ৯ শতাংশ কিশোরী নিয়মিত এই সমস্যায় ভুগেছে। প্রায় ৪০ শতাংশ কিশোরী জানিয়েছে, মাসিকের ব্যথার কারণে তাদের স্বাভাবিক দৈনন্দিন কাজকর্ম ব্যাহত হয়েছে। এছাড়া, প্রতি চারজনের মধ্যে প্রায় একজন কিশোরী তীব্র ব্যথা বা অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে স্কুলে যেতে পারেনি।
নিয়মিত মাসিকের ব্যথায় আক্রান্ত কিশোরীদের মধ্যে ৪৩ শতাংশ অন্য শারীরিক জটিলতারও সম্মুখীন হয়েছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়।
এদিকে, বালিয়াকান্দি ও রাজবাড়ীর ১ হাজার ৭৭ জন ১৬ বছর বয়সী অবিবাহিত কিশোর-কিশোরীর ওপর পরিচালিত পৃথক এক বিশ্লেষণে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যবিষয়ক জ্ঞানের ক্ষেত্রে উদ্বেগজনক ঘাটতি উঠে এসেছে।
গবেষণায় দেখা যায়, ৩৪ শতাংশ কিশোর জানত না যে ঋতুস্রাব শুরু হওয়ার পর একজন মেয়ে গর্ভবতী হতে পারে। কিশোরীদের ক্ষেত্রে এই হার ১৬ শতাংশ। পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি সম্পর্কেও তাদের জ্ঞান সীমিত।
যেখানে ৮৪ শতাংশ কিশোর জন্মনিয়ন্ত্রণ উপকরণ কনডম সম্পর্কে শুনেছে, সেখানে কিশোরীদের মধ্যে এ হার মাত্র ৪৫ শতাংশ। একইভাবে জরুরি জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি সম্পর্কে ৩৮ শতাংশ কিশোরের ধারণা থাকলেও কিশোরীদের মধ্যে এ হার ছিল মাত্র ৪ শতাংশ।
গবেষণার ফলাফলে আরো দেখা যায়, বিয়ের আগে প্রজনন স্বাস্থ্যবিষয়ক জ্ঞান ভবিষ্যৎ জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। যেসব মেয়ের বিয়ের আগে পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কে ধারণা ছিল, তাদের মধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের হার ছিল ৫ শতাংশ। বিপরীতে এ বিষয়ে জ্ঞান না থাকা মেয়েদের মধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের হার ছিল ১০ শতাংশ।
পর্যবেক্ষণকালীন সময়ে প্রায় ২০০ জন কিশোরীর বিয়ে হয় এবং ৭২ জন গর্ভবতী হয়। গবেষকরা বলছেন, এই তথ্য বিয়ের আগেই সঠিক প্রজনন স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য প্রদানের প্রয়োজনীয়তাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
অনুষ্ঠানে কিশোর-কিশোরীদের কাছে নির্ভরযোগ্য প্রজনন স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও সুস্থতাবিষয়ক তথ্য পৌঁছে দিতে অ্যাডসার্চের দুটি উদ্ভাবনী উদ্যোগও উপস্থাপন করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে- চাঁদপুরের মতলবে পরিচালিত স্মার্টফোনভিত্তিক একটি শিক্ষা প্রকল্প, যা ৮৩ শতাংশ অংশগ্রহণকারীর কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। অন্যটি হলো- বিনামূল্যে ব্যবহারযোগ্য বাংলা মোবাইল অ্যাপ ‘কৈশোর কথা’, যেখানে অ্যানিমেটেড ভিডিও, ইনফোগ্রাফিকস এবং প্রচলিত ভুল ধারণার ব্যাখ্যা রয়েছে।
আইসিডিডিআর, বি-এর বিজ্ঞানী ড. ফাওজিয়া আখতার হুদার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন অবস্টেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের (ওজিএসবি) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. ফারহানা দেওয়ান, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকারবিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দ মো. নুরুদ্দীন, বিশ্বব্যাংকের গ্লোবাল ফাইন্যান্সিং ফ্যাসিলিটির কান্ট্রি কোঅর্ডিনেটর নন্দিনী লোপা, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের এমসিএইচ সার্ভিস ইউনিটের সহকারী পরিচালক ডা. মো. মনজুর হোসেন এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্কুল হেলথ শাখার সহকারী পরিচালক ডা. আসিফ ইকবাল।
বাংলাদেশে নিযুক্ত কানাডিয়ান হাইকমিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি (ডেভেলপমেন্ট-হেলথ) এডওয়ার্ড ক্যাব্রেরা তার বক্তব্যে বাংলাদেশের কিশোর-কিশোরীদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার নিশ্চিত করতে ‘গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা’র অব্যাহত সহযোগিতা ও প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করেন।
সেমিনারে বক্তারা বলেন, গবেষণার ফলাফল কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্য শিক্ষা ও সেবায় আরো জোরালো বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। এর মধ্যে মাসিককালীন সহায়তা, প্রজনন স্বাস্থ্যবিষয়ক নির্ভরযোগ্য তথ্য এবং কিশোর-কিশোরীবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে তারা সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং সুস্থ জীবনযাপন করতে সক্ষম হয়।
ঢাকা/এমএসবি/মাসুদ