কাতারকে গোলবন্যায় ভাসিয়ে কানাডার ইতিহাস
ক্রীড়াডেস্ক || রাইজিংবিডি.কম
কানাডা ফুটবল দলের জন্য এটি কেবল একটি ম্যাচ ছিল না, ছিল এক স্বপ্নের মহাকাব্যিক সূচনা। ঘরের মাঠ ভ্যানকুভার বিসি প্যালেসে যখন ৫২ হাজার ৪৯৭ জন দর্শক একসঙ্গে জাতীয় সংগীতে গলা মেলালেন, তখনই বোঝা গিয়েছিল এক অবিস্মরণীয় রাতের সাক্ষী হতে চলেছে ফুটবল বিশ্ব। জেসি মার্শের শিষ্যরা সেই আবেগের জোয়ারে ভেসে কাতারকে ৬-০ গোলে খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দিয়ে বিশ্বকাপের ইতিহাসে নিজেদের প্রথম জয়ের মহাকাব্য রচনা করল।
ম্যাচের শুরু থেকেই গ্যালারির গর্জন যেন কানাডার দ্বাদশ খেলোয়াড় হয়ে মাঠে নেমেছিল। প্রথম আট মিনিট কাতারকে তাদের নিজেদের অর্ধে পুরোপুরি অবরুদ্ধ করে রাখে কানাডিয়ানরা। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে বসনিয়ার বিপক্ষে ড্র করা কানাডা যেন এই ম্যাচেই সব ক্ষুধা মেটাতে মরিয়া ছিল। ম্যাচের প্রথম আধঘণ্টার মধ্যেই তিনটি কর্নার আদায় করে কাতারের রক্ষণভাগকে কাঁপিয়ে দেয় তারা। অবশেষে সাইল লারিন ম্যাচের ডেডলক ভাঙলে স্টেডিয়াম জুড়ে তখন উল্লাসের সুনামি, কারণ এটিই যে কানাডার পুরুষ ফুটবল ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ গোল।
এরপর আলিস্টার জনস্টনের চমৎকার পাস থেকে তাজন বুকানানের শট প্রতিহত হলেও, বল বাতাসে ভাসতে ভাসতেই হাজির হয় জনাথন ডেভিডের সামনে। মাটিতে পড়ার আগেই জুভেন্টাস তারকার এক দুর্দান্ত ভলি কাতার গোলরক্ষককে পরাস্ত করে জালে জড়ায়। তারপর কাতারের ওপর নেমে আসে আরও বড় বিপর্যয়। বুকানান যখন ডিফেন্স ভেঙে বক্সে ঢোকার চেষ্টা করছিলেন, তখন তাকে অবৈধভাবে ফেলে দেন হোমাম আহমেদ। ভিএআর দেখে রেফারি সিদ্ধান্ত নেন যে গোলের স্পষ্ট সুযোগ নষ্ট করা হয়েছে। ফলে হোমাম আহমেদকে সরাসরি লাল কার্ড দেখিয়ে মাঠ থেকে বের করে দেওয়া হয়। দশ জনের কাতারের ওপর চাপ আরও বাড়িয়ে দেন ডেভিড।
প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে বুকানানের ক্রস থেকে লারিনের হেড গোলরক্ষক ঠেকালেও, ফিরতি বলে নিজের দ্বিতীয় গোল করে দলকে ৩-০ ব্যবধানে এগিয়ে নেন ডেভিড। কিন্তু ফুটবলের এই আনন্দ উৎসব বিষাদে রূপ নেয় দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই। ম্যাচের ৫১তম মিনিটে ঘটে সেই হৃদয়বিদারক ঘটনা। কানাডার মাঝমাঠের প্রাণভোমরা ইসমাইল কোনে বল পাস দেওয়ার ঠিক পর মুহূর্তেই পেছন থেকে এক ভয়াবহ ও দেরিতে ট্যাকল করেন কাতারের আসিম মাদিবো। রেফারি প্রথমে হলুদ কার্ড দেখালেও ভিএআর রিপ্লেতে দেখা যায় কোনের বাম পা অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং অস্বাভাবিকভাবে বেঁকে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত বদলে মাদিবোকে সরাসরি লাল কার্ড দেখান রেফারি। কাতার পরিণত হয় ৯ জনের দলে।
মাঠে তখন কোনের যন্ত্রণাকাতর মুখ আর অপরাধবোধে মাথায় হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মাদিবো। কানাডিয়ান খেলোয়াড়রা চোখের জল আর ক্ষোভ সামলাতে পারছিলেন না। তবে পুরো স্টেডিয়াম সেই কঠিন সময়ে কোনের পাশে দাঁড়ায়। স্ট্রেচারে করে মাঠ ছাড়ার সময় হাজার হাজার দর্শকের করতালিতে ভেসে যান কোনে। যন্ত্রণার মাঝেও টানেলে ঢোকার আগে উঠে বসে হাত নাড়িয়ে সমর্থকদের ভালোবাসার জবাব দেন এই তরুণ তারকা।
সতীর্থের এই ইনজুরি কানাডাকে আরও ক্ষুধার্ত করে তোলে। কোনের বদলি হিসেবে মাঠে নামা নাথান সালিবা ৬৪তম মিনিটে সরাসরি ফ্রি-কিক থেকে দুর্দান্ত গোল করেন। গোল করেই তিনি দুই হাত দিয়ে কোনের জার্সি নম্বর ‘৮’ তৈরি করে গোলটি উৎসর্গ করেন তার আহত সতীর্থকে। মাঠের এই আবেগ ছুঁয়ে যায় গ্যালারির সবাইকে।
এরই মধ্যে গ্রুপ বি-এর অন্য ম্যাচে সুইজারল্যান্ড ৪-১ ব্যবধানে বসনিয়াকে হারিয়ে দেয়। ফলে গোল ব্যবধানে এগিয়ে থাকার লড়াইয়ে কানাডা আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। ৭৫তম মিনিটে জ্যাকব শ্যাফেলবার্গের এক জোরালো শট ক্লিয়ার করতে গিয়ে কাতারের মোহাম্মদ আল মান্নাই নিজেদের জালেই বল জড়িয়ে দেন। আত্মঘাতী গোলে ব্যবধান দাঁড়ায় ৫-০।
হ্যামস্ট্রিং চোট কাটিয়ে অ্যালফোনসো ডেভিস দলে ফিরলেও কোচ মার্শ তাকে নিয়ে কোনো ঝুঁকি নেননি, কারণ ডেভিড আর কোনের মতো তরুণরাই যে ইতোমধ্যেই দলের ভবিষ্যৎ গড়ে দিয়েছেন।
ম্যাচের নাটকীয়তার শেষ অঙ্কটি তখনও বাকি ছিল। যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে সতীর্থের একটি শট জনাথন ডেভিডের গায়ে লেগে দিক পরিবর্তন করে কাতারের জালে আশ্রয় নেয়। ভাগ্যের সহায়তায় হলেও এই গোলের মাধ্যমেই পূর্ণ হয় ডেভিডের স্মরণীয় হ্যাটট্রিক। আর এর মাধ্যমেই কানাডার সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখে নেন তিনি।
৬-০ গোলের এই মহাকাব্যিক জয় কেবল একটি ম্যাচ জয় ছিল না, এটি ছিল কানাডার ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে সোনালি অধ্যায়। স্কোয়াডের এই ২৬ জন খেলোয়াড় বিশ্বকাপের মঞ্চে জয় পাওয়া প্রথম কানাডিয়ান পুরুষ দল হিসেবে চিরকালের জন্য অমর হয়ে গেলেন। টরন্টোর এই রাতটিও কানাডিয়ান ফুটবলের পুনর্জন্মের রাত হিসেবে ইতিহাসে টিকে থাকবে। এদিকে এই জয়ে কানাডার দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠা প্রায় নিশ্চিত।
ঢাকা/নাভিদ