ঢাকা     সোমবার   ১২ জানুয়ারি ২০২৬ ||  পৌষ ২৮ ১৪৩২

Risingbd Online Bangla News Portal

“দেশের জন্য দাঁড়াও, যেমন আমি দাঁড়িয়েছিলাম”

বাকৃবির স্মৃতিস্তম্ভে লেখা এক বীরত্বগাথা

লিখেছেন লিখন, বাকৃবি প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৯:৩৪, ১১ জানুয়ারি ২০২৬  
বাকৃবির স্মৃতিস্তম্ভে লেখা এক বীরত্বগাথা

বীর প্রতীক এ.টি.এম খালেদ

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে চোখে পড়ে এক নীরব স্মৃতিস্তম্ভ। কোনো কোলাহল নেই, নেই উচ্চস্বরে ঘোষণা। তবু পাথরের গায়ে খোদাই করা একটি নাম গভীরভাবে নাড়া দেয়—বীর প্রতীক এ.টি.এম খালেদ। এই নাম কেবল একজন ছাত্র বা একজন মুক্তিযোদ্ধার নয়; এটি এক সময়ের দলিল, এক আদর্শের প্রতিচ্ছবি এবং আত্মত্যাগে ঋদ্ধ এক ইতিহাস।

গাইবান্ধা জেলার কুপতলা ইউনিয়নের এক সাধারণ পরিবারে ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি জন্ম তার। পিতা গোলাম মওলা প্রামাণিক ও মাতা রেজিয়া খাতুনের সন্তানদের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। পরিবার ও স্বজনদের কাছে তার পরিচিত নাম ছিল ‘দুলু’। সহজ-সরল এই ডাকনামেই তাকে চিনত বন্ধু, সহপাঠী ও সহযোদ্ধারা।

আরো পড়ুন:

১৯৬৮ সালে গাইবান্ধা সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাস করে তিনি ভর্তি হন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। খেলাধুলায়, বিশেষ করে ফুটবলে, তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রতিভাবান। মাঠে তার দৌড়, নেতৃত্ব আর দৃঢ়তা আলাদা করে নজর কাড়ত। কিন্তু ১৯৭১ সালে যখন স্বাধীনতার ডাক এলো, তখন ক্লাসরুমের দেয়াল আর আটকে রাখতে পারেনি এই তরুণকে। কৃষি অনুষদের অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র হয়েও বই-খাতা ফেলে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েন মহান মুক্তিযুদ্ধে।

মুক্তিযুদ্ধে এটিএম খালেদ ছিলেন ১১ নম্বর সেক্টরের মানকারচর সাব-সেক্টরের একজন সক্রিয় যোদ্ধা। ভারতের দেরাদুনে সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে তিনি অংশ নেন কুড়িগ্রামের কোদালকাটি, চিলমারীসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রণাঙ্গনে। ১৯৭১ সালের ১ অক্টোবর সুবেদার আলতাফের নেতৃত্বে কোদালকাটির পাকিস্তানি অবস্থানে একযোগে আক্রমণে তিনি একটি দলের নেতৃত্ব দেন। টানা কয়েক দিনের সংঘর্ষের পর ৩ অক্টোবর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কলার ভেলায় নদী পার হয়ে শত্রুদের অবস্থানে প্রবেশ করেন। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, পাকিস্তানি সেনা ও তাদের দোসররা পালিয়ে গেছে, ঘাঁটি ফাঁকা।

এরপর, ১৭ অক্টোবর চিলমারীতে আরেকটি ভয়াবহ যুদ্ধে কাজিউল ইসলামের সঙ্গে একটি দলের নেতৃত্ব দেন তিনি। জোড়গাছ স্কুলে পাকিস্তানি অবস্থানে আক্রমণ চালিয়ে শত্রু বাহিনীকে ছত্রভঙ্গ করেন। এই যুদ্ধে একজন পাকিস্তানি সেনাকে জীবিত আটক করা হয়, যাকে পরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। অসীম সাহসিকতা ও বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাকে ‘বীর প্রতীক’ খেতাবে ভূষিত করে। এর মাধ্যমে তিনি দেশের সর্বকনিষ্ঠ খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের একজন হিসেবে ইতিহাসে স্থায়ী আসন করে নেন।

মুক্তিযুদ্ধ শেষে তিনি ফিরে আসেন বাকৃবিতে। স্বপ্ন ছিল পড়াশোনা শেষ করে কৃষিবিদ হয়ে নিজ এলাকায় আধুনিক কৃষিচাষের মাধ্যমে মানুষের ভাগ্য বদলাবেন। কিন্তু, সময় তাকে নিয়ে যায় আরেক সংগ্রামে। ১৯৭৩–৭৪ শিক্ষাবর্ষে তিনি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের (বাকসু) ক্রীড়া সম্পাদক নির্বাচিত হন। ফুটবল ও হকিতে অসাধারণ নৈপুণ্যের জন্য অর্জন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদাপূর্ণ ‘ব্লু’ খেতাব। মাঠে যেমন সাহসী ছিলেন, সংগঠক হিসেবেও ছিলেন দৃঢ়, আপসহীন ও জনপ্রিয়।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি যুক্ত হন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের রাজনীতিতে। মুক্তিযুদ্ধকালেই জিয়ার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তার সাহস ও নেতৃত্বগুণে মুগ্ধ হয়ে জিয়াউর রহমান তাকে বাকৃবি শাখা ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাকালীন আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব দেন। পরিবার-পরিজনের কথা ভুলে গিয়ে তিনি ছাত্রদল গঠনে আত্মনিয়োগ করেন। সংগঠন, রাজনীতি ও খেলাধুলায় সক্রিয় থাকার কারণে তার শিক্ষাজীবন দীর্ঘ হলেও নেতৃত্বে তার গ্রহণযোগ্যতা ছিল আকাশচুম্বী। ১৯৭৯–৮০ শিক্ষাবর্ষে তিনি অনার্স শেষ বর্ষের ছাত্র ছিলেন।

১৯৮০ সালের ১০ জানুয়ারি গভীর রাতে, ১১ জানুয়ারির প্রথম প্রহরে, ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের হামলায় বীর প্রতীক এ.টি.এম খালেদ শাহাদাত বরণ করেন। তিনি হয়ে ওঠেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ইতিহাসের প্রথম শহীদ। তার শাহাদাত শুধু একটি সংগঠনের নয়, গোটা ক্যাম্পাস রাজনীতির ইতিহাসে এক বেদনাবিধুর অধ্যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ ময়মনসিংহের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতিবাদে ফেটে পড়ে ছাত্রদলসহ শিক্ষার্থীরা।

আজ তিনি নেই, কিন্তু আছেন বাকৃবির প্রতিটি প্রজন্মের স্মৃতিতে। তার নামে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ কেবল ইট-পাথরের কাঠামো নয়—এটি তরুণদের জন্য এক জীবন্ত পাঠশালা। এখানে এসে শিক্ষার্থীরা শেখে দেশপ্রেম, সাহস ও আদর্শের মূল্য।

তার মা রেজিয়া খাতুন ও বোন মাহমুদা খাতুন বলেন, “শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান জীবিত থাকাকালে এবং পরবর্তীতেও দলের শীর্ষ নেতারা তাঁদের পরিবারের খোঁজখবর রাখতেন, যা তাদের জন্য ছিল গভীর সান্ত্বনার।”

আজ এই মহান বীর পুরুষের ৪৬তম শাহাদাত বার্ষিকী। দিবসটি উপলক্ষে সংস্কারকাজ শেষে তার স্মৃতিস্তম্ভের উদ্বোধন ও আত্মার মাগফিরাত কামনায় দোয়া অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে ফজলুল হক ভূঁইয়া বীর প্রতীক এ.টি.এম খালেদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। তিনি মুক্তিযুদ্ধকালীন ও পরবর্তী সময়ের কিছু স্মৃতিচারণ করেন এবং নতুন প্রজন্মের মাঝে এ.টি.এম খালেদের দেশপ্রেম, ত্যাগ ও বীরত্বগাথা ছড়িয়ে দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এ সময় বাকৃবি শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির পক্ষ থেকে স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।

এ.টি.এম খালেদ—একটি নাম, একটি ইতিহাস। বাকৃবির আকাশে যখন বাতাস বইতে থাকে, তখনো যেন শোনা যায় এক নীরব আহ্বান—“দেশের জন্য দাঁড়াও, যেমন আমি দাঁড়িয়েছিলাম।”

ঢাকা/জান্নাত

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়