RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ২৯ অক্টোবর ২০২০ ||  কার্তিক ১৪ ১৪২৭ ||  ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

জুতা পলিশ: একজন মুচির মানবিক গল্প

ডা. এজাজ বারী চৌধুরী || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১২:২৯, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০   আপডেট: ১৩:২৫, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০
জুতা পলিশ: একজন মুচির মানবিক গল্প

স্যার, জুতাটা একটু কালি করে দেই? ২০-২২ বছরের তরুণ, মলিন জামা-কাপড় আর কাঁধে একটা বাক্স৷ আমার নিস্পৃহ ভাব আর নিরুত্তরভাবে অন্য দিকে তাকানো দেখে তার আব্দার, ‘স্যার খুব ভালো কাজ পারি আমি৷’ আপনে খুশি হইলে ট্যাকা দিয়েন’৷

লঞ্চের ডেকে প্রকৃতির সৌন্দর্য আর বৃষ্টির ছাঁটমাখা এলোমেলো দমকা বাতাস উপভোগ করছিলাম আমি৷ বললাম, কালি করে লাভ কি, লঞ্চ থেকে নামলেই তো আবার কাদায় মাখামাখি হয়ে যা...তাই হয়ে যাবে৷ একগাল হেসে সে বললো, ‘সে ব্যবস্থাও কইরা দিমু স্যার, মঞ্জুর স্পেশাল কেরামতি৷’ বেশ মজা পেলাম তার কথায়৷ ভেতরে বেশ কৌতুক আর কৌতূহলও কাজ করল৷

শুরু হলো মঞ্জুর জুতা কালি করা৷ আমি মুগ্ধ হয়ে দেখতে থাকলাম....এক নিপুণ শিল্পীর আশ্চর্য কলাকৌশল৷ একসময় হারিয়ে গেলাম ২৫ বছর আগের ক্যাডেট কলেজের স্মৃতির ভিড়ে! জুতা পলিশ ছিল আমাদের নিত্য দিনের আতঙ্কগুলোর একটি৷ পলিশ করার পর যদি জুতার মাথায় দাঁত (সাদা কালারসহ) দেখা না যেত, তাহলে সেটাকে পলিশ হিসেবে গণ্য করা হতো না৷ কত punishment বরাদ্দ ছিল, শুধু এই জুতা বেচারাকে ঠিকমতো ঝকঝকে না করার ব্যর্থতার জন্য৷ আর special প্যারেড তো ছিল আরেক দুঃস্বপ্ন, যা আমাদের অন্তত সপ্তাহ খানেক আগে থেকেই ঘুমের মধ্যে তাড়া করত৷ 

ঐদিন এক Special shoe polish করতে হতো, যার নাম ছিল, "Water Polish"৷ এটা পানি দিয়ে করতে হতো এবং এর শর্ত থাকতো, জুতার সম্মুখভাগটা পুরো আয়নার মতো বানিয়ে ফেলা, যেন শুধু দাঁত না, বরং পুরো চেহারা দেখা যায়! ঐ water polish করতে অনেক সময় আমাদের সিনিয়র-জুনিয়রদের সারা রাতও জাগতে হতো৷

মঞ্জুর কথায় আবার বাস্তবে ফিরে এলাম, ‘কেমন হচ্ছে স্যার?’ একটা জুতা তার কালি করা শেষ৷ যদিও জুতা কালি করে একজন এক্স ক্যাডেটকে মুগ্ধ করা অত সহজ নয়, তবুও আমি মুগ্ধ হলাম৷ কিন্ত কিছুই প্রকাশ করলাম না, বরং ভাবলেশবিহীনভাবে বললাম, আগে শেষ করো...তারপর দেখব৷ 

একসময় সে শেষ করল, quality হলো প্রায় water polish এর কাছাকাছি৷ তারপর সে তার বাক্স থেকে জুতার মাপে বানানো ২টা পলিথিন বের করে জুতা দুটোকে প্রায় ল্যামিনেটিং করে দিল৷ তারপর বলল, স্যার কাদাপানি আর লাগবো না...আপনি বাসায় যাইয়া পলি দুইডা ফালাই দিয়েন৷

এবার আমি সত্যিই আর নিজের বিস্ময় লুকিয়ে রাখতে পারলাম না৷ বললাম, কাজে তোমার যেই মনোযোগ আর আন্তরিকতা, শুধু শুধু জুতা পলিশ করে নিজের জীবনটা নষ্ট করছ কেন? আর তোমার যেই বুদ্ধি, কাদা থেকে জুতা বাঁচানোর এমন সুন্দর উপায়...তোমার আগেতো কোনো মুচির মাথাতেই আসেনি...তাহলে পড়াশুনা করছ না কেন তুমি? জীবনে সফল হবার, বড়লোক হবার স্বপ্ন নেই তোমার?

মঞ্জু এবার একটু কাচুমাচু হয়ে তাকালো আমার দিকে৷ বললো, স্যার- ছোটবেলায় বন্ধুগো লগে মাঠে খেলতেছিলাম৷তহন এক বন্ধুর নতুন জুতা ছিইড়্যা যায়৷ তারপর তার সে কি কান্না! বাসায় গ্যালে মারবো...আর জুতা কিইন্যা দিবো না-এইসব বলতেছিল আর কাঁদতেছিল৷ আমি তখন বুদ্ধি কইরা জালের সূতা দিয়া তার জুতাডা সেলাই কইরা দেই৷ তারপর তার সে কি আনন্দ! খুশি হইয়া সে যে কতক্ষণ আমারে তার বুকে জড়াইয়া রাখছিলো! মানুষরে খুশি কইরা যে কত সুখ সেইদিনই প্রথম ট্যার পাইলাম৷ পরের কয়েক দিনও ওর স্যাই আনন্দ আমি আমার বুকের মইদ্যে ট্যার পাইতাম।

তারপর ঠিক করলাম, আমি গরীব মানুষ, পড়াশুনার ট্যাহা নাই, বাপের জমি নাই, তার চেয়ে এই কামডাই করি৷ যেডা মানুষ ঘেন্না কইরা নিজে করবার চায় না, কিন্ত কেউ কইরা দিলে তার খুব উপকার হয়, আবার সে খুব খুশিও হয়।

গেরামের মানুষ স্যার, একেকটা জুতা স্যান্ডেল বছরের পর বছর পিন্দে৷ ছিইড়্যা গ্যালে আমি যখন সাইরা দেই, রঙ কইরা নতুন বানাইয়া দেই, তখন তাদের হাসি আর আনন্দে আমার বুকডা ভইরা যায়৷ আর আপনেগো মতো বড় বড় সাহেবরা যখন আমার পলিশ করা জুতার দিকে বারবার তাকায়, খুশি হইয়া বকশিশ দ্যায়, তখন মনে হয় আমিই মুচিদের রাজা!

স্যার, কাজডারে এত্ত ভালো লাগে আমার, যে সবসময় মাথার মইদ্যে এইডাই ঘুরতে থাকে৷ কালির সাথে কী মিশাইলে জুতা আরও চকচক করবো, ক্যামনে সেলাই করলে সেইটা হাঁটার সময় ঘষা খাইবো না, কোন কোন জিনিষ দিয়া জুতার পট্টি দেওন যায়, আরও কত কি সবসময় ভাবতে থাকি, আর test কইরা বেড়াই!

লঞ্চ আরেকটু আগেই ঘাটে ভিড়েছিল৷ যাত্রীরা প্রায় সবাই নেমে গেছে৷ আমিও মঞ্জুর কাছ থেকে বিদায় নিলাম৷ সারাটা পথ কেমন অন্যমনষ্ক ছিলাম, বারবার জুতাজোড়ার দিকে চোখ চলে যাচ্ছিল৷ 

মঞ্জু যেন শুধু আমার জুতাজোড়াই পলিশ করেনি, আমার মনের ঝাপসা কাঁচটাকেও পরিষ্কার করে দিয়ে গেছে! এখন চোখ বন্ধ করেও আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি জীবনের গূঢ় রহস্যগুলো, জীবনে সত্যিকারের সফল হবার সূত্রগুলো-

১. মানুষকে সেবা করার সদিচ্ছা থাকলে, যেকোনো পেশাতে থেকেই করা সম্ভব, তা সে যত ছোট পেশাই হোক না কেন৷

২. নিজের কাজকে ভালোবাসলে আর উপভোগ করলে, সেখানে নতুন নতুন inputআসে, উন্নয়নের তাগিদে experimentআসে, আর এভাবেই একজন মানুষ তার একই পেশার অন্যান্যদের ছাড়িয়ে অনেক উপরে স্থান করে নেয়৷

৩. মানুষের ভালোবাসা পাওয়া এবং তাদের হৃদয়ে স্থান করে নিতে পারাটাই হচ্ছে জীবনের সবচেয়ে বড় সফলতা৷

৪. আমি ধনী না হতে পারি, বিখ্যাত হবার সম্ভাবনাও না থাকতে পারে আমার, অন্যদের সাফল্যের সাথে নিজের তুলনা করলে হয়তো লজ্জায় মাথা নুয়ে আসে আমার! 

কিন্ত সবার চেয়েও বেশি সফল হব আমি, যদি- মানুষের মন আমি জয় করতে পারি এবং মানুষের কল্যাণে সাধ্যমতো নিজেকে বিলিয়ে দিতে পারি!

লেখক: ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ, প্রধান, ডায়াবেটিস অ্যান্ড হাইপারটেনশন ইউনিট, মেডিনোভা মেডিকেল সার্ভিসেস লি.।  

ঢাকা/মুছা/মাহি

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়