ঢাকা     বুধবার   ০৮ এপ্রিল ২০২৬ ||  চৈত্র ২৬ ১৪৩২ || ২০ শাওয়াল ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

বিলুপ্তির পথে শতবর্ষের শখের হাঁড়ি, তবু সংগ্রাম টিকে থাকার

ফাহমিদুর রহমান ফাহিম, রাবি প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৭:০৩, ৮ এপ্রিল ২০২৬  
বিলুপ্তির পথে শতবর্ষের শখের হাঁড়ি, তবু সংগ্রাম টিকে থাকার

ভোরের আলো ফোটার আগেই রাজশাহীর পবা উপজেলার বসন্তপুর গ্রামের কুমোরপাড়ায় ঢুকলেই চোখে পড়ে রঙের এক নিঃশব্দ উৎসব। উঠোনজুড়ে সারি সারি মাটির হাঁড়ি—কোনটির গায়ে হলুদ পরতের উপর লাল-নীল আঁচড়, কোনটায় সাদা-কালোর সূক্ষ্ম রেখা। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, যেন মাটির ওপর বসে আছে রঙিন কোনো লোকজ জগৎ—যেখানে মাছ সাঁতরে বেড়ায়, পাখি উড়ে যায়, পদ্মফুল নিঃশব্দে ফুটে ওঠে। এই হাঁড়িগুলোরই নাম—শখের হাঁড়ি।

রাজশাহীর লোকসংস্কৃতির অন্যতম প্রাণবন্ত অংশ হিসেবে গ্রামীণ গীতিকবিতায় উঠে এসেছে এক শতাব্দীর শিল্পঐতিহ্য বাহারি রঙে সাজানো শখের হাঁড়ি। কবিতায় শখের হাঁড়ি আসে রঙের উৎসব হয়ে—কোথাও তা মেলার আনন্দের প্রতীক, কোথাও পারিবারিক ঐতিহ্যের স্মারক। লক্ষ্মীপেঁচা, পদ্ম, ধানের ছড়া কিংবা রঙিন নকশার ভেতর দিয়ে কবিরা যেন মাটির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, জীবিকার সঙ্গে শিল্পের বন্ধন আর হারিয়ে যেতে বসা এক লোকজ ঐতিহ্যের আবেগকে ফুটিয়ে তোলেন।

আরো পড়ুন:

একসময় এই চিত্রিত মাটির হাঁড়ি শুধু শৌখিন বস্তুই ছিল না, বরং রাজশাহীর লোকসংস্কৃতি ও দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হতো। মেয়ের বিয়েতে মিষ্টিভর্তি শখের হাঁড়ি উপহার পাঠানো ছিল এ অঞ্চলের বহুল প্রচলিত সামাজিক রীতি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নকশাদার হাঁড়ি তৈরি হলেও বিষয়বৈচিত্র্য, রঙের ব্যবহার ও লোকজ মোটিফের কারণে রাজশাহীর শখের হাঁড়ির রয়েছে স্বতন্ত্র পরিচিতি।

রঙিন নকশায় সাজানো এই হাঁড়ি মূলত খাদ্যদ্রব্য সংরক্ষণ ও পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত হতো। রান্নাঘর কিংবা শোবার ঘরের ছাদের শিকে ঝুলিয়ে এতে রাখা হতো নানান খাদ্যসামগ্রী। নতুন আত্মীয়ের বাড়িতে মিষ্টি বা উপহার পাঠানোর ক্ষেত্রেও ছিল এর বিশেষ ব্যবহার। তবে প্লাস্টিক ও কাচের আধুনিক তৈজসপত্র সহজলভ্য হওয়ায় ধীরে ধীরে এর ব্যবহার কমে যায়, আর সেই সঙ্গে হারিয়ে যেতে বসে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প।

স্বর্ণপদকসহ ২৪টি সম্মাননা, অসংখ্য সনদ আর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ঝলক থাকলেও বাস্তবতা আজ নির্মম। বাজার হারিয়েছে, মেলা কমেছে, ক্রেতার আগ্রহ ফিকে হয়েছে—ফলে শিল্পীরা দাঁড়িয়ে আছেন টিকে থাকার কঠিন লড়াইয়ে। বাহারি রঙের এই শখের হাঁড়ি এখন আর শুধু শৌখিনতার প্রতীক নয়, বরং এক হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যের নীরব।

রাজশাহী শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরের বসন্তপুর গ্রামে এখন শখের হাঁড়ি টিকে আছে মাত্র একটি পরিবারে। এই পরিবারের প্রধান কারিগর সুশান্ত কুমার পাল। তাঁর হাত ধরেই কোনোভাবে বেঁচে আছে রাজশাহীর এই শতবছরের ঐতিহ্য। বাহারি রঙ, সূক্ষ্ম নকশা আর নিখুঁত কারুকাজে তৈরি এই হাঁড়ি একসময় মেলা মাতিয়েছে, কুড়িয়েছে দেশ-বিদেশের প্রশংসা। কিন্তু স্বর্ণপদকসহ ২৪টি পদক পাওয়া সেই হাঁড়ি আজ বিলুপ্তির শঙ্কায়।

শৈশবে বাবা ভোলানাথ পালের হাত ধরে হাঁড়ি তৈরিতে হাতেখড়ি হয় সশান্তের। বাবার স্বপ্ন ছিল একদিন বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হবে তাদের শিল্পকর্ম। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে নিরলস পরিশ্রম করেছেন তিনি। ফলও পেয়েছেন-১৮টি দক্ষয় কারিগর পুরস্কার, ৪টি শ্রেষ্ঠ কারশিল্প পুরস্কার, ১টি স্বর্ণপদক এবং শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন আজীবন সম্মাননা।

এছাড়া, বাংলাদেশ কারুশিল্প পরিষদ, লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন, জাতীয় জাদুঘর, কারিকা বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ৩২টি সনদ অর্জন করেছেন তিনি। শখের হাঁড়ির গল্প স্থান পেয়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্যবইয়েও। এমনকি জাপানে দেশের কারুশিল্পের প্রতিনিধিত্ব করে প্রশংসা কুড়িয়েছেন সুশান্ত। তবে সম্মাননা আর পদকের ঝুলি ভারী হলেও জীবনযুদ্ধে সচ্ছলতা আসেনি।

মূলত বৈশাখীমেলা, বাণিজ্যমেলা, রথের মেলা, কুঠির শিল্প মেলাসহ নানাবিধ মেলায় এ হাঁড়ি বিক্রির প্রধান মাধ্যম। রাজশাহীর স্থানীয় পর্যায়ে তেমন চাহিদা না থাকলেও ঢাকাসহ অন্যান্য মেলাতে বেশ চাহিদা ছিল হাঁড়িগুলোর। তবে করোনা মহামারির পর থেকে দেশের মেলাগুলো কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিক্রি কমে গেছে আশঙ্কাজনকভাবে।

দীর্ঘদিনের পারিবারিক ঐতিহ্য আর বর্তমানের সংকটের বাস্তবতা তুলে ধরে কথা বলেন কারিগর সনজয় কুমার। শখের হাড়ির এই কারিগর বলেন, ব্যবসাটি আমাদের বংশ পরম্পরায় চলে আসছে। আমার বাপ দাদারা এসব কাজ করেছেন তাই আমরাও করছি। আগে রাজশাহীতে নানারকম মেলা হতো সেখানে বিক্রি হতো এসব হাঁড়ি। আত্মীয় বাড়িসহ প্রিয়জনদের মিষ্টিসহ নানারকম উপহার দেওয়া হতো। এখন তেমন মেলাও হয়না বিক্রিও হয়না। 

ফিকে হয়ে আসা বাজার আর সীমিত সুযোগের বাস্তবতা তুলে ধরে সনজয় কুমার জানান, আগে আমরা ভালো অর্ডার পেতাম, এখন একটু কম আসে। সামনে বৈশাখি মেলা জন্য একটু চাপ আছে অন্যান্য সময় তেমন চাপ থাকে না। আগে শখের হাড়ি শুধু রাজশাহীতেই বিক্রি হতো তবে কয়েকবছর আগে বিসিকের এক মেলায় বাবা ঢাকায় যান একটা মেলায়। সেখান থেকেই মানুষ শখের হাড়ি চিনলো। তারপরও সেরকম সুযোগ সুবিধা আমরা পাইনা। এত এত পণ্যের মাঝে প্রায় হারিয়ে গেছে শখের হাড়ি। 

এদিকে শ্রম আর প্রাপ্যের বৈষম্যের কষ্টভরা অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন আরেক কারিগর স্বর্ণা রাণী দাস। কাজের ফাঁকে স্বর্ণা বলেন, “আমাদের কাজের মুল্য অনুযায়ী আমরা পারিশ্রমিক পাইনা, যখন আমরা নদী থেকে মাটি তুলে আনি তখন মাটিতে একটা কাঁকর ও রাখা যায় না। আমাদের এর পিছনে যে পরিমান পরিশ্রম যায় সেই তুলনায় আমরা টাকা পাইনা। এখন ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার অনেক খরচ, এই অল্প আয়ে সংসার চালানো কষ্ট।”

কমে আসা বিক্রি আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশার কথা তুলে ধরে বলেন, “‎গত কয়েকবছরে আমাদের বেঁচাকেনা নাই। আমার ছেলেমেয়েরা যদি পড়াশোনা শিখে এ কাজের মুল্যায়ন যদি না পায় তাহলে তারা এ কাজ টিকিয়ে রাখতে পারবে না। আগে অনেক জায়গায় মেলা হতো, আমরা কাজের চাপে খাওয়ার সময়ও পেতাম না কিন্তু এখন পহেলা বৈশাখ ছাড়া বছরে তেমন চাপ থাকে না।”

তিনি আরো বলেন, “এখন ‎আমাদের চাওয়া- যেখানে মেলাগুলো হতো সেখান থেকে আমাদের যদি ডাকে, যাওয়া আসার ভাড়া, থাকার খরচটা যদি দেয় তাহলে আমরা ব্যবসা করতে পারবো কারণ মালামালসহ যাওয়াটা অনেক খরচের যা আমাদের পক্ষে সম্ভব না। যদি এমনটা হয় আমাদের সন্তানেরাও চেষ্টা করবে ব্যবসাটা টিকিয়ে রাখার।”

লোকজ শিল্প টিকে থাকার শর্ত ও বাস্তবতা নিয়ে বিশ্লেষণ করেন ফোকলোর বিশেষজ্ঞ উদয় সঙ্কর বিশ্বাস। ‎‎শখের হাড়ি নিয়ে এই অধ্যাপক বলেন, “রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী শখের হাড়ি টিকে থাকা নির্ভর করবে ক্রেতার উপরে।কারণ শিল্পী তো আসলে নিজের জন্য শিল্প তৈরী করে না আমরা আমাদের সন্তানের যদি এর সাথে যুক্ত করতে না পারি তাহলে এটা থাকবে না এবং যেটা হচ্ছে শপিস হিসেবে সংগ্রহ করছে সেই মাত্রাও বেশি না। শিল্প বাঁচিয়ে রাখে তার ক্রেতা, রাষ্ট্র কখনো শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে না, তবে রাষ্ট্র চাইলে শিল্পীদের কিছু সুবিধা যেমন মাটি, কম দামে রং দিয়ে সাহায্য করতে পারে। এটা টিকিয়ে রাখতে আমাদের সুন্দর মন ও সুন্দর চোখ থাকতে হবে, আগামী প্রজন্মের সাথে, বন্ধু বান্ধবের সাথে পরিচয় করায় দিতে পারলে এই শিল্পটার একটা নতুন জায়গা তৈরী হবে।”

গৌরব আর বঞ্চনার মাঝখানে দাঁড়িয়ে নিজের সংগ্রামের কথা তুলে ধরেন প্রধান কারিগর সুশান্ত কুমার পাল। ‎পাল বংশের এ শিল্পী বলেন, করোনা আসার পর থেকে আমরা বিলুপ্তির পথে চলে যাচ্ছি। প্রচুর সরঞ্জাম আছে, বেচাকেনা নেই। শখের হাঁড়ি নিয়ে দেশের প্রায় সব মিডিয়াতে রিপোর্ট হয়েছে। এমনকি বিটিভিতেও রিপোর্ট হয়েছে। বইয়ের পাতায়ও নাম এসেছে। কিন্তু আসেনি সচ্ছলতা। সবাই হাঁড়ি নিয়ে ভাবলেও আমাদের পেটে ভাত জোটে না, এটা কেউ ভাবে না। যা বিক্রি হয় তাতে খাবারের টাকাও হয় না।

নাম পেলেও সচ্ছলতা আসেনি মন্তব্য করে তিনি বলেন, “নামের দিক দিয়ে যা চেয়েছি তার থেকেও অনেক বেশি পেয়েছি। কিন্তু আমার প্রজন্ম হুমকির মুখে। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, না পারছি ছেড়ে দিতে না পারছি কাজ চালিয়ে যেতে। এভাবে চলতে থাকলে বিলুপ্তির পথেই যাবে শখের হাঁড়ি।”

পোড়ামাটির শিল্পের অস্তিত্ব হারাতে বসেছে জানিয়ে সুশান্ত বলেন, “একসময় রাজশাহীতে সাড়ে চার হাজারের বেশি কারিগর এই পোড়ামাটির শিল্পে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে গুটিকয়েক ছাড়া প্রায় সবাই পেশা বদলেছেন। প্লাস্টিক ও স্টিলের সহজলভ্য পণ্যের ভিড়ে মাটির হাঁড়ি-কলসি, বদনা, গুড়ের হাঁড়ি, মুড়ির হাঁড়ির চাহিদা কমেছে ব্যাপকভাবে। ফলে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে এই শিল্প।”

প্রকৃত কারুশিল্পীরা অবহেলিত অভিযোগ করে তিনি বলেন, “কারশিল্প ফাউন্ডেশনের স্টলগুলোতে কারশিল্পীর নামে অনেকেই বিভিন্ন জায়গা থেকে। হাজার রকম জিনিস কিনে এনে বিক্রি করে। এসব বিক্রেতা নিজেরা ফুলেফেপে উঠলেও প্রকৃত কারুশিল্পীরা অবহেলিত।”

ঢাকা/জান্নাত

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়