শ্রমের মর্যাদা ও শঙ্কা: শিক্ষার্থীদের ভাবনায় মে দিবস
ফাহমিদুর রহমান ফাহিম, রাবি প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম
ছবি: শিমুল শোয়াইব
মে দিবস; শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের এক ঐতিহাসিক প্রতীক। প্রতি বছর ১ মে এ দিনটি এলেই শ্রমের মর্যাদা, ন্যায্য মজুরি ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। তবে, এই দিবসটি আজকের শিক্ষার্থীদের কাছে কী অর্থ বহন করে, তারা শ্রমকে কীভাবে দেখে এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবন নিয়ে তাদের ভাবনা কী; তা জানতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে ভিন্নধর্মী বাস্তবতা, স্বপ্ন ও শঙ্কার চিত্র।
বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা মে দিবসকে শুধু একটি ঐতিহাসিক দিবস হিসেবে দেখে না; বরং তারা এটিকে অধিকার সচেতনতার প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করে। তাদের কাছে মে দিবস মানে শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও সম্মান আদায়। অনেকের মতে, শুধু শ্রমিক নয়, সমাজের প্রতিটি মানুষের শ্রমই সমান গুরুত্বপূর্ণ; শারীরিক বা মানসিক, সব ধরনের শ্রমেরই যথাযথ মূল্য থাকা উচিত।
শ্রম সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের দৃষ্টিভঙ্গিতে ইতিবাচক পরিবর্তনও লক্ষ করা যায়। আগে যেখানে শুধু ‘চাকরি’কে গুরুত্ব দেওয়া হতো, এখন ‘কাজের মূল্য’ বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। ছোট-বড় কোনো কাজ নেই, প্রতিটি কাজই সম্মানের, এই ধারণা ক্রমেই দৃঢ় হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া অনেক শিক্ষার্থী পার্ট-টাইম কাজ, ফ্রিল্যান্সিং কিংবা উদ্যোক্তা হওয়ার মাধ্যমে নিজেদের দক্ষতা ও শ্রমের মূল্য বুঝতে শিখছে। ফলে শ্রমকে তারা আর কেবল কষ্টের বিষয় হিসেবে নয়, বরং আত্মনির্ভরতার পথ হিসেবে দেখছে।
তবে, বাস্তবতা সবসময় এতটা সহজ নয়। অনেক শিক্ষার্থী ভবিষ্যৎ কর্মজীবন নিয়ে শঙ্কিত। বেকারত্ব, কম বেতন এবং অনিরাপদ কর্মপরিবেশ তাদের উদ্বিগ্ন করে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশের প্রেক্ষাপটে অনেকেই মনে করে, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সঠিক মূল্যায়ন পাওয়া কঠিন। তাই তারা শুধু চাকরির পেছনে না ছুটে বিকল্প পথ খোঁজার দিকেও ঝুঁকছে।
এ বিষয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও ইনস্যুরেন্স বিভাগের ২০২২–২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. ফয়সাল আহমেদ বলেন, “মে দিবস, যা আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস নামে পরিচিত, প্রতি বছর ১ মে বিশ্বব্যাপী পালিত হয়। এই দিনটি শ্রমিকদের অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায্য মজুরির দাবিতে তাদের সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের স্মরণে উদযাপিত হয়। এটি শুধু একটি দিবস নয়, বরং শ্রমজীবী মানুষের ঐক্য, শক্তি ও ন্যায়বিচারের প্রতীক। তবে আমাদের দেশে বাস্তবতায় দেখা যায়, শ্রমিকরা এখনো ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও বৈষম্যহীন আচরণ থেকে বঞ্চিত হন।”
শ্রমিকদের অধিকার প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, “সকল বৈষম্য দূর করে শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দিতে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।”
একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষার্থী মো. রহিম মিয়া বলেন, “মে দিবস মূলত শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকারের দিন। কিন্তু, আমাদের দেশের বাস্তবতা ভিন্ন। শ্রমিক, দিনমজুরসহ বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পারিশ্রমিক থেকে বঞ্চিত। চা শ্রমিক, ইটভাটার শ্রমিক কিংবা পোশাক কারখানার শ্রমিকদের নিয়মিত আন্দোলন করতে হয় নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য। এবারের মে দিবসে আমার প্রত্যাশা, দেশের সব শ্রমিক ভালো থাকুক, ফিরে পাক তাদের অধিকার।”
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী সৈয়দ রাইয়ান বলেন, “মে দিবসের কথা উঠলেই শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাস মনে পড়ে। কিন্তু এখনো শ্রমিক শোষণ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃত্বও প্রশ্নবিদ্ধ। তাই এ সমস্যা থেকে বের হতে হলে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। মে দিবসকে শুধু শ্রমিক দিবস না ভেবে আমাদের সবার অধিকার আদায়ের দিন হিসেবে দেখা উচিত।”
আইন বিভাগের শিক্ষার্থী জিহাদ হোসেন বলেন, “মে দিবস আমাদের শ্রমিকদের দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেয়। সমাজের প্রতিটি মানুষ কোনো না কোনোভাবে শ্রমের সঙ্গে যুক্ত; শিক্ষক, চিকিৎসক, ছাত্র, গৃহিণী সবাই। তাই সব ধরনের কাজকে সম্মান করা উচিত। শ্রমিকদের ন্যায্য পারিশ্রমিক ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব।”
সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সুমন হাসান বাপ্পি বলেন, “আমার কাছে মে দিবস শুধু একটি দিন নয়; এটি শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও মর্যাদার প্রতীক। শারীরিক, মানসিক বা জ্ঞানভিত্তিক, সব ধরনের শ্রমের প্রতি সম্মান দেখানো এবং শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করা আমাদের সামাজিক দায়িত্ব।”
তিনি আরো বলেন, “শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন, ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও মানবিক আচরণ নিশ্চিত করা গেলে একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।” মে দিবসের চেতনাকে শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব জীবনে ধারণ করার আহ্বান জানান তিনি।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আব্দুল মালিক সরকার বলেন, “মে দিবস শ্রমিকদের অধিকার, ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশের দাবিকে সামনে নিয়ে আসে। যখন এসব নিশ্চিত করা যাবে, তখন শ্রমিকরা স্বাভাবিকভাবেই সম্মানিত হবে। শিকাগোর আন্দোলন ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের পক্ষে সংগ্রাম—আজও সেই চেতনা প্রাসঙ্গিক।”
তিনি আরো বলেন, “মে দিবস শুধু শ্রমিকদের জন্য নয়; সচেতন নাগরিক হিসেবেও শিক্ষার্থীদের কাছে এটি গুরুত্বপূর্ণ। একজন শ্রমিক যেন তার পেশা নিয়ে গর্বের সঙ্গে বাঁচতে পারে, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।”
ঢাকা/জান্নাত
‘পয়লা মে দিবস’ এর ইতিহাস