সহজ হচ্ছে আইপিও প্রক্রিয়া
একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। শিল্প, অবকাঠামো, নগর উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ এবং সম্ভাবনাময় ব্যবসা শুধু ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর করলে আর্থিক খাতের ওপর চাপ বাড়ে। তাই পুঁজিবাজারকে গভীর, বহুমাত্রিক, স্বচ্ছ ও আস্থাভিত্তিক করে উৎপাদনশীল খাত ও সম্ভাবনাময় কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের কার্যকর প্ল্যাটফর্মে পরিণত করা হবে। একই সঙ্গে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) প্রক্রিয়া সহজ করা হবে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে পুঁজিবাজারের উন্নয়নে এসব পরিকল্পনার কথা জানায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
প্রস্তাবিত বাজেটে পুঁজিবাজার উন্নয়নে যেসব উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে সেগুলো হলো-অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় বলেন, “সম্ভাবনাময় কোম্পানিগুলো কেন পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে আগ্রহী হয় না, তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। অপ্রয়োজনীয় জটিলতা, দীর্ঘসূত্রিতা, অতিরিক্ত ব্যয়, একই ধরনের কাগজপত্র বারবার দাখিল এবং অনুমোদন ও পরিপালন-সংক্রান্ত অস্পষ্টতা ধাপে ধাপে কমানো হবে। বিনিয়োগকারীর সুরক্ষা অক্ষুণ্ণ রেখে তালিকাভুক্তির মানদণ্ড আরো স্বচ্ছ, বাস্তবসম্মত এবং প্রবৃদ্ধিশীল কোম্পানির জন্য সহায়ক করা হবে।”
প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) প্রক্রিয়া সহজ, সময়াবদ্ধ ও প্রযুক্তিনির্ভর করা হবে। আবেদন, আনুষঙ্গিক দলিল, যাচাই-বাছাই, ফি পরিশোধ, সংশোধন ও অনুমোদনের ধাপ অনলাইনে সম্পন্ন হবে। ইস্যুকারী কোম্পানি, ইস্যু ম্যানেজার, স্টক এক্সচেঞ্জ, সিডিবিএল ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে হবে। যোগ্য ও পরিপক্ক কোম্পানির জন্য ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের সম্ভাবনাও পর্যালোচনা করা হবে।
পুঁজিবাজারকে স্থিতিশীল করতে পেনশন তহবিল, বীমা প্রতিষ্ঠান, অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (এএমসি), মিউচ্যুয়াল ফান্ড এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো হবে। নতুন এমসি গড়ে তোলা, পেশাদার ফান্ড ম্যানেজমেন্ট জোরদার করা এবং দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়কে বিনিয়োগে রূপান্তরের সুযোগ বাড়িয়ে মিউচ্যুয়াল ফান্ডের আকার ও সংখ্যা বৃদ্ধি করা হবে।
দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ বাড়াতে করপোরেট বন্ড মার্কেট সম্প্রসারণ এবং স্থানীয় সরকার ও নগর অবকাঠামো উন্নয়নে মিউনিসিপাল বন্ড ইস্যুর ব্যবস্থা করা হবে। সরকারি ও বেসরকারি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে বন্ড, সুকুক, ইনফ্রাস্টাকচার ফান্ড এবং অন্যান্য ফাইন্যান্সিং ইনস্ট্রুমেন্টসের ব্যবহার বাড়ানো হবে, যাতে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা কমে।
বিনিয়োগের সুযোগ ও ফাইন্যান্সিয়াল প্রডাক্টসের পরিসর বাড়াতে দেশের প্রথম কমোডিটি এক্সচেঞ্জ কার্যকরভাবে চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে। বিদ্যমান লাইসেন্স কার্যকর করা, প্রয়োজনীয় বিধিমালা প্রণয়ন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ সহায়তা নিশ্চিত করা হবে। রিয়েল এস্টেট ইনভেস্টমেন্ট ট্রাস্ট (আরইআইটি), এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড (ইটিএফ), ইনডেক্স হেজিং এবং সম্ভাব্য কারেন্সি হেজিং ইনস্ট্রুমেন্টসের ব্যবহার যোগ্যতাও পর্যালোচনা করা হবে।
দেশীয় কোম্পানির জন্য আঞ্চলিক স্টক এক্সচেঞ্জে ডুয়েল লিস্টিংয়ের সুযোগ এবং বাছাইকৃত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের তালিকাভুক্তির সম্ভাবনা যাচাই করা হবে। অনাবাসী বাংলাদেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ সহজ করতে নিটা হিসাব খোলা ও পরিচালনার প্রক্রিয়া আরো সহজ করা হবে।
বিনিয়োগকারীর আস্থা বাড়াতে তালিকাভুক্ত কোম্পানির তথ্য প্রকাশ, আর্থিক প্রতিবেদন, নিরীক্ষা, শেয়ার মূল্যায়ন, ক্রেডিট রেটিং, আইপিও ব্যবস্থাপনা ও রিসার্স রিপোর্টের মান উন্নত করা হবে। অডিটর, ভ্যালুয়ার, ইস্যু ম্যানেজার, ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি, রিসার্স এনালিস্টি, মার্চেন্ট ব্যাংকার, ব্রোকার-ডিলার এবং অন্যান্য বাজার-মধ্যস্থতাকারীর দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতা স্পষ্ট করা হবে। প্রয়োজন হলে প্রফেসনাল লাইবিলিটিং ফ্রেমওয়ার্ক এবং প্রফেসনাল ইনডেমিটি বা লাইবিলিটি ইন্স্যুরেন্স বিবেচনা করা হবে।
লেনদেনের পর শেয়ার ও অর্থ হস্তান্তর দ্রুত ও নিরাপদ করতে সেটেলমেন্ট সময় ধাপে ধাপে কমানো হবে। বর্তমানে টি প্লাস টু ভিত্তিক নিষ্পত্তি ব্যবস্থা চালু থাকলেও তা টি প্লাস ওয়ান এ নামিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে এবং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও বাজার অবকাঠামো নিশ্চিত করে পরবর্তী ধাপে টি প্লাস জিরো বা একই দিনে নিষ্পত্তির লক্ষ্য নিয়ে প্রস্তুতি নেওয়া হবে। বিএসইসি, স্টক এক্সচেঞ্জে, সিডিবিএল, ব্যাংক, ব্রোকার, ইস্যুয়ার কোম্পানি ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার তথ্য ব্যবস্থার সমন্বয় জোরদার করা হবে।
পুঁজিবাজার-সংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষায়িত ডিসপুট রেজুলেশন ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয় পর্যালোচনা করা হচ্ছে। প্রয়োজনে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বা দ্রুত নিষ্পত্তি আদালত গঠনের সম্ভাবনা বিবেচনা করা হবে, যার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আইনি ক্ষমতা থাকবে। এতে বিনিয়োগকারীর আস্থা বাড়বে এবং বাজারে শৃঙ্খলা শক্তিশালী হবে।
এসব উদ্যোগ পুঁজিবাজারকে শুধু শেয়ার কেনাবেচার ক্ষেত্র নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহ, অবকাঠামো অর্থায়ন, সঞ্চয়কে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে রূপান্তর এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের শক্তিশালী প্ল্যাটফর্মে পরিণত করবে।
ঢাকা/নাজমুল/এসবি
হামের উপসর্গে আরো ৫ শিশুর মৃত্যু, ঢাকায় ৩