বিনিয়োগ হারানোর শঙ্কা
আট এনবিএফআইয়ের শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থরক্ষায় গভর্নরকে অনুরোধ বিএসইসির
নুরুজ্জামান তানিম || রাইজিংবিডি.কম
দুর্বল ও সমস্যাগ্রস্ত শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করার পর এবার বন্ধ হচ্ছে অব্যবস্থাপনায় খেলাপি ঋণে জর্জরিত নয়টি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই)। এর মধ্যে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত রয়েছে আটটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান। গত বছরের ৩০ নভেম্বর এ সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে ব্যাংক খাতে বিনিয়োগ হারানোর ধাক্কা সামলানোর আগেই আর্থিক খাতেও সর্বস্ব হারানোর আশঙ্কায় রয়েছেন পুঁজিবাজারের হাজার হাজার বিনিয়োগকারী।
ব্যাংক একীভূতকরণের মতোই নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানতকারীদের সম্পূর্ণ সুরক্ষার কথা বলা হলেও শেয়ারহোল্ডার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তাই আটটি এনবিএফআই অবসায়নের ক্ষেত্রে সাধারণ বিনিয়োগকারীর স্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়গুলো বিবেচনা করতে বাংলাদেশ ব্যাংককে অনুরোধ জানিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
গত সপ্তাহে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে বিএসইসি থেকে এ বিষয়ে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
অবসায়ন হতে যাওয়া নয়টি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আটটি প্রতিষ্ঠান পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত। সেগুলো হলো-এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি লিমিটেড (বিআইএফসি), প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স লিমিটেড, ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, জিএসপি ফাইন্যান্স কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড, প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড। আর আভিভা ফাইন্যান্স লিমিটেড পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত নয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, সমন্বিত ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ কার্যকরের পর দেশের এটাই বড় নয়টি এনবিএফআই অবসায়ন প্রক্রিয়া, যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরাসরি হস্তক্ষেপ করে প্রতিষ্ঠান বন্ধ, সম্পদ বিক্রি ও আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর আগে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ নামে নতুন একটি ব্যাংক গঠনের মাধ্যমে পাঁচ ব্যাংকের শেয়ার শূন্য ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ওই পাঁচ ব্যাংকে বিনিয়োগ করা বিনিয়োগকারীদের প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার শেয়ারের মূল্য এক ধাক্কায় শূন্য হয়ে যায়। বিনিয়োগকারীরা সেই ক্ষতির রেশ কাটিয়ে না উঠতে এবার নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর একই পরিণতির অপেক্ষায় রয়েছেন বিনিয়োগকারীরা।এসব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বর্তমান সংকটজনক অবস্থার জন্য সাধারণ বিনিয়োগকারীরা কোনোভাবেই দায়ী নন। বরং ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর ধারা ২৯ অনুযায়ী দায়ী ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপনাই এই অবস্থার জন্য সম্পূর্ণভাবে দায়ী।ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে পুঁজিবাজারে।
গভর্নরকে দেওয়া চিঠিতে বিএসইসি জানিয়েছে, অবসায়ন করতে যাওয়া নয়টি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আটটি প্রতিষ্ঠান যথা-এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি লিমিটেড, প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স লিমিটেড, ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, জিএসপি ফাইন্যান্স কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড, প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড স্টক এক্সচেঞ্জসমূহে তালিকাভুক্ত।এদের বর্তমান অবস্থার জন্য কোনভাবেই সাধারণ বিনিয়োগকারীরা দায়ী নয়। ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ ২০২৫ এর ধারা-২৯ এ বর্ণিত দায়ী ঋক্তিপণ নন ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের এই অবস্থার জন্য সম্পূর্ণভাবে দায়ী, যা ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশে স্বীকৃত।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণ, পুঁজিবাজারের উন্নয়ন এবং এ সংক্রান্ত বিষয়াবলী বা তদধীনে আনুষঙ্গিক বিধি প্রণয়নের উদ্দেশ্যে ১৯৯৩ সালের ৬ জুন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন গঠিত হয় এবং কমিশন গঠনের পর থেকে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেক কমিশন দেশের পুঁজিবাজারের উন্নয়নে নিরলস ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এমতাবস্থায়, বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণে উক্ত নয়টি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবসায়নের ক্ষেত্রে সাধারণ বিনিয়োগকারীর স্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়সমূহ বিবেচনা করা অত্যন্ত জরুরি।
১. স্টক এক্সচেঞ্জসমূহে তালিকাভুক্ত নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবসায়ন সংক্রান্ত তথ্য অবশ্যই বিনিয়োগকারীদের সময় অবহিত করা।
২. সরকার কর্তৃক কোনো পক্ষকে ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হলে বিনিয়োগকারীদের জন্যও বরাদ্দ রাখা।
৩. নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের ব্যালান্সশিটে প্রদর্শিত সম্পদ মূল্যায়নের পাশাপাশি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রদত্ত ঋণের বিপরীতে সংরক্ষিত জামানত এবং দায়ী ব্যক্তিগণের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক পূর্বক আদায়যোগ্য অর্থ বিবেচনায় নিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীর স্বার্থ নির্ধারণ করা।
৪. ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ ২০২৫ এর ধারা ৭৭-এ বর্ণিত দায়ী ব্যক্তি কর্তৃক ধারণকৃত শেয়ার ব্যতিত অন্যান্য সাধারণ শেয়ারহোল্ডাররা বা সাধারণ বিনিয়োগকারী কর্তৃক বিনিয়োগকৃত অর্থকে (বাজার মূল্য ও ফেসভ্যালুর মধ্যে যেটি বেশি) সাধারণ বিনিয়োগকারীর ন্যূনতম স্বার্থ মূল্য বিবেচনা করে অবসায়ন করা।
৫. নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহে সাধারণ বিনিয়োগকারীর স্বার্থ মূল্য নির্ধারণ এবং তা ঘোষণা না করে অথবা সাধারণ বিনিয়োগকারী কর্তৃক ধারণকৃত শেয়ারের মূল্য নির্ধারণ এবং ঘোষণা না করে আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহকে অবসায়ন না করা অথবা স্টক একচেঞ্জ হতে তালিকাচ্যুত না করা।
অতএব, উক্ত নয়টি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়ন করার ক্ষেত্রে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণে উপরোক্ত বিষয়সমূহ বিশেষভাবে বিবেচনা করার জন্য আপনার সদয় দৃষ্টি ও সানুগ্রহ কামনা করা হচ্ছে বলে চিঠিতে আরো উল্লেখ করা হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএসইসির পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “নয়টি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবসায়ন করার ক্ষেত্রে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়গুলো বিবেচনা করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।”
এ বিষয়ে পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ ও ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, “আইন অনুযায়ী সম্পদের থেকে দায় বেশি হলে সে কোম্পানির শেয়ার মূল্য শূন্য হয়ে যায়।কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাস্তবে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের এর কোনো দায় নেই। তাদের মনে প্রশ্ন, গত বছর যে কোম্পানিটি মুনাফা বা সম্পদের মূল্য দেখিয়েছে সেটা এ বছর কি করে শূন্য হয়ে যায়? কিন্তু এতো বছর সেটা কোম্পানি আর অডিটর মিলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে যোগসাজশে মিথ্যা তথ্য দেখিয়েছে।তাই সাধারণ বিনিয়োগকারীদের যেহেতু দায় নেই সেক্ষেত্রে সরকার আমানতকারীদের মতো বিনিয়োগকারীদের কিছু হলেও ক্ষতিপূরণ দিতে পারে।সেক্ষেত্রে আগে একটা মূল্যায়ন করে দেখতে পারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কি পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে।”
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ৭.৫৫ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ৭৯.২৫ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্সের প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ৪২.৭৯ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ১৮.৮৬ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সের প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ২১.১৮ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ৫৮.১০ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ১১.৭৮ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ৪৮.৪৮ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।জিএসপি ফাইন্যান্সের প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ৩৪.৭৬ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ৫৩.২২ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ৭.২১ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ৩৩.৬৫ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ৮.২৬ শতাংশ, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে ০.৬৫ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ৭২.৯৪ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ২০.৯৭ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ৩৭.৪৮ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।
ঢাকা/এনটি/এসবি