খলনায়ক মিশার বাড়িতে স্নিগ্ধ এক সন্ধ্যা
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক || রাইজিংবিডি.কম
মিশা সওদাগর
ঢাকাই সিনেমার দাপুটে খল অভিনেতা মিশা সওদাগর। পর্দায় তার উপস্থিতি মানেই ভয়, রূঢ়তা আর শক্তিশালী এক চরিত্র। তবে বাস্তব জীবনে তিনি একেবারেই ভিন্ন—বিনয়ী, মানবিক ও অতিথিপরায়ণ। কয়েক দিন আগে এক সন্ধ্যায় রাজধানীর উত্তরায় তার বাসভবনে অতিথি হয়ে মানবিক মিশা সওদাগরের দেখা পাই।
সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে সূর্যের আলো নিভে আসে। ঠিক সেই সময়ে মিশা সওদাগরের বাসায় পৌঁছাই। রুপালি জগতের মানুষটির বাড়িতে রয়েছে সিনেমার আবেশ, তবে তা কোনো জাঁকজমকপূর্ণ নয়; বরং পরিমিত, রুচিশীল ও শান্ত।
প্রথমেই তিনি নিয়ে যান ড্রয়িং রুমে। সাদামাটা সাজের এই ঘরের দেয়ালে টাঙানো পুরোনো একটি ছবি চোখে পড়ে। এ ছবিতে দেখা যায়, চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সামনে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন মিশা সওদাগর। প্রায় দুই যুগ আগের মুহূর্তটি তার দীর্ঘ অভিনয় জীবনের স্মারক হয়ে আছে। আলাপচারিতার ফাঁকে নিজেই মোবাইল হাতে অতিথিদের কয়েকটি ছবি তুলে দেন।
মিশা সওদাগরের বাড়িতে রাইজিংবিডির জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক রাহাত সাইফুল
স্ত্রী মিতার সঙ্গে পরিচয় পর্ব শেষে তিনি নিয়ে যান তার একান্ত সময় কাটানোর ফ্লোরে। এখানেই সংরক্ষিত রয়েছে তার চলচ্চিত্র জীবনের নানা উপকরণ-মেকআপ সামগ্রী, পোশাক ও চরিত্রভিত্তিক পোশাক। অবসর পেলেই এই জায়গায় সময় কাটান তিনি। মেকআপ রুমটি সাজানো হয়েছে ভিন্ন রুচিতে। পাশেই ড্রেসিং রুম, যেখানে সারি সারি পোশাক রাখা। এই পোশাকগুলো পরেই তিনি বিভিন্ন সময় অসংখ্য সিনেমায় পর্দা কাঁপিয়েছেন।
এই ফ্লোরে পাশেই রয়েছে একটি বসার ঘর। সেখানে বসে চায়ে চুমুক দিতে দিতে মনের প্রশান্তি নিয়ে চলচ্চিত্রের গল্প, চরিত্র ও কাজের ভাবনায় ডুবে থাকেন মিশা সওদাগর। বসার ঘর থেকে দেখা যায় খোলা আকাশ। বৃষ্টির সময় টিনের চালের ওপর বৃষ্টির টাপুর টুপুর শব্দ অন্য এক অনুভূতি জাগায়। বারান্দায় ইচ্ছাকৃতভাবেই টিনের ছাদ ব্যবহার করা হয়েছে, প্রকৃতির খুব কাছাকাছি থাকার জন্য।
কথা আর গল্প বলতে বলতেই সবাই চলে যাই খাবার টেবিলে। ঘরোয়া পরিবেশে রাতের খাবার পরিবেশন করা হয়। খাবার শেষাংশে ছিল মিষ্টান্ন। সবশেষে খেজুরের গুড় দিয়ে তৈরি বিশেষ দুধ-চা, যা আড্ডার শেষ রেশটুকু যেন আরো মধুর করে তোলে।
মিশা সওদাগরের বাড়িতে অতিথিরা
পরবর্তী গন্তব্য বাসার টপ ফ্লোর। এখানেও ছড়িয়ে রয়েছে মিশা সওদাগরের দীর্ঘ ক্যারিয়ারের অসংখ্য স্মৃতি। একসময় এই ফ্লোরেই বসত ঢালিউড শিল্পীদের আড্ডা। দেশের জনপ্রিয় চলচ্চিত্র শিল্পীরা সুযোগ পেলেই এখানে একত্র হতেন, হতো সিনেমা ও শিল্প নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা। কেউ কেউ এই আড্ডায় আমন্ত্রণ না পেয়ে করতে অনুযোগও—এমনটাই জানান মিশা সওদাগর।
আড্ডার একপর্যায়ে মিশা সওদাগর জানান, ২০০০ সালে উত্তরার এই জায়গাটি তিনি কিনেছিলেন মাত্র ৪৩ লাখ টাকায়। ২০০৮ সালের অক্টোবরে তিনি এই বাসায় ওঠেন। বাসার সিঁড়িতে সাজানো রয়েছে মিশা-মিতা দম্পতির বিভিন্ন সময়ের ছবি, যা তাদের ব্যক্তিগত জীবনের গল্প নীরবে বলছে।
মিশা সওদাগরের বাড়িতে রাইজিংবিডির জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক রাহাত সাইফুল
নানা পদের ফল পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় আড্ডা। পুরো সময়জুড়ে মিশা সওদাগরের আন্তরিকতা ও আতিথেয়তায় মুগ্ধ হই আগত সবাই। রুপালি পর্দার শক্তিশালী খলনায়কের খোলসের ভেতরে স্নিগ্ধ, মানবিক একজন মানুষকে খোঁজে পাই, একটি সন্ধ্যায় সেই মুগ্ধতার আবেশ ছিটিয়ে বাড়ি ফেরার পথে পা বাড়াই।
ঢাকা/রাহাত/শান্ত