আমাদের একজন ‘মিয়া ভাই’ ছিলেন
ফারুক
দর্শক তার অভিনয় দেখে কেঁদেছেন, হেসেছেন। কখনো প্রতিবাদী রূপে, কখনো নিঃশব্দ প্রেমিক, কখনো সাদামাটা কৃষক হয়ে ক্যামেরায় ধরা দিয়েছেন। চোখ মানুষের মনের কথা বলে, তবে তার চোখের ভাষায় ছিল অফুরন্ত কথা। বলছি, ঢাকাই সিনেমার ‘মিয়া ভাই’-এর কথা। ২০২৩ সালের ১৫ মে, পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন ঢাকাই চলচ্চিত্রের শক্তিশালী এই শিল্পী।
জন্ম গ্রামে, বেড়ে উঠেছেন শহরে
আকবর হোসেন পাঠান জন্মগ্রহণ করেন গাজীপুরের কালিগঞ্জে। সেখানে বেশি দিন থাকেননি। পরিবারের সঙ্গে পাড়ি জমান রাজধানীতে। পুরান ঢাকায় তার বেড়ে ওঠা। পুরান ঢাকায় পরিচালক এইচ আকবর, এ টি এম শামসুজ্জামান, প্রবীর মিত্রর মতো নির্মাতা-শিল্পীর সংস্পর্শে আসেন ফারুক। সেই সময় পুরান ঢাকার লালকুঠিতে নাটক মঞ্চস্থ হতো, নাটক শেষে নিয়মিত আড্ডা দিতেন শিল্পী, নির্মাতারা; সেখানেই ফারুক নিজেকে সমৃদ্ধ করেছেন। সেখানে নানা অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে মিশতেন, সব অঞ্চলের মানুষের ভাব-ভাষা রপ্ত করতেন। পরবর্তীতে তা সিনেমার পর্দায় কাজে লাগিয়েছেন এই তারকা।
চলচ্চিত্রে অনন্য ফারুক
১৯৭১ সালে চলচ্চিত্রে যাত্রা শুরু করেন ফারুক। এইচ আকবর পরিচালিত ‘জলছবি’ সিনেমা দিয়ে বড় পর্দায় তার অভিষেক। তবে আলোচনায় আসেন খান আতাউর রহমানের ‘সুজন সখী’ সিনেমা দিয়ে। এটি মুক্তি পায় ১৯৭৫ সালে। সিনেমাটির সুজন চরিত্রে তার আবেগঘন ও নির্ভার অভিনয় মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয় ফারুককে। আমজাদ হোসেনের ‘নয়নমনি’ সিনেমায় নয়ন চরিত্রে তার সংবেদনশীল অভিনয় তার ক্যারিয়ারে উচ্চ মাত্রা যোগ করে। ১৯৭৮ সালে ‘সারেং বউ’ সিনেমায় কদম সারেং হয়ে বাংলাদেশি সিনেমার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেন তিনি। সত্তর ও আশির দশক ছিল ফারুকের স্বর্ণযুগ। ‘লাঠিয়াল’, ‘আবির্ভাব’, ‘লাল কাজল’, ‘নয়নমনি’, ‘সুজন সখী’—প্রতিটি সিনেমায় মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেন ফারুক। পরিচালকেরা জানতেন গ্রামীণ আবেগ, বঞ্চিত মানুষের গর্জন, প্রেমিকের নীরবতা—সবকিছুর জন্য ফারুক উপযুক্ত। তবে সবকিছু ছাপিয়ে গ্রামীণ চরিত্রে নিজেকে অনন্য করে তুলেছেন ফারুক।
ফারুক যখন মিয়া ভাই
ফারুক নামের প্রতিশব্দে রূপ নিয়েছে ‘মিয়া ভাই’। এ নাম সবচেয়ে বেশি গেঁথে আছে মানুষের মনে। চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত ‘মিয়া ভাই’ সিনেমা তাকে পৌঁছে দেয় আবেগময় এক উচ্চতায়। তিনি হয়ে ওঠেন সেই ভাই, যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন, পরিবারকে আগলে রাখেন, গ্রামীণ জীবন ও সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠেন। দর্শকের হৃদয়ে মিয়া ভাই শুধু একটি চরিত্র নয়, এক আত্মীয়ের মতো আপন কেউ।
ফারুক পর্দার বাইরেও সহশিল্পীদের কাছেও ‘মিয়া ভাই’ ছিলেন। চলচ্চিত্র অভিনেত্রী রোজিনা বলেন, “ফারুক কেবল অভিনয়ে একজন বড় শিল্পী ছিলেন না, তিনি মানুষ হিসাবেও ছিলেন অনেক বড় মাপের। তিনি আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে সবার কাছে ছিলেন মিয়া ভাই, সবাই তাকে মিয়া ভাই বলে ডাকতাম। আমাদের শিল্পের কারো কোনো সমস্যা হলে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসতেন।”
ফারুকের কাজ ও স্বীকৃতি
পাঁচ দশকের অভিনয় ক্যারিয়ারে ষাটের অধিক সিনেমায় অভিনয় করেছেন নায়ক ফারুক। অভিনয়ের স্বীকৃতিস্বরূপ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ২০১৬ সালে আজীবন সম্মাননা ও ‘লাঠিয়াল’ চলচ্চিত্রের জন্য ১৯৭৫ সালে শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতার পুরস্কার লাভ করেন ফারুক। অভিনয়ের পাশাপাশি রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা।
ঢাকা/শান্ত