ইরানের কিংবদন্তি জেনারেল কাশেম সোলাইমানি সম্পর্কে কতটা জানেন?
সাতসতেরো ডেস্ক || রাইজিংবিডি.কম
কাশেম সোলাইমানি
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি একসময় জেনারেল কাশেম সোলাইমানিকে — ‘‘ইরানি বিপ্লবের জীবন্ত কিংবদন্তি’’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। তিনি শুধু ইরানের নন—মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি ও যুদ্ধের ইতিহাসে তিনি ছিলেন এক প্রভাবশালী ও আলোচিত নাম। জেনারেল কাশেম সোলাইমানি অনেকের চোখে তিনি ছিলেন পুরো আরব বিশ্বের এক বীর। ক্যারিশম্যাটিক কমান্ডার হিসেবে তার পরিচিতি ছড়িয়ে পড়েছিল পুরো বিশ্বে। বুদ্ধি, সাহস, দূরদর্শী নেতৃত্ব আর যুদ্ধক্ষেত্রে তার বিচক্ষণতার গল্প ছিল মানুষের মুখে মুখে।
বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ও মোসাদের ‘হিট লিস্টে’ কাশেম সোলাইমানির নাম ছিল শীর্ষে। অনেক বিশ্লেষকের কাছে তিনি ছিলেন পৃথিবীর ‘এক নম্বর জেনারেল’। ৩ জানুয়ারি, তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে মার্কিন বাহিনীর ড্রোন হামলায় নিহত হন তিনি।
সিরিয়া ও ইরাক যুদ্ধের সময় কাশেম সোলাইমানি আন্তর্জাতিক পরিচিতি পান। সে সময় তিনি ‘সারুল্লাহ’ গ্রুপের নেতৃত্ব দেন এবং যুদ্ধক্ষেত্রে অসামান্য কৌশল ও নেতৃত্বের স্বাক্ষর রাখেন। তার অবদানের প্রশংসা করেছিলেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত।
ইরানের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরব ও ইসরাইলের জন্য তিনি ছিলেন এক বড় মাথাব্যথার কারণ। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় তার বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা প্রথম সবার নজরে আসে। গত দুই দশকে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও বিভিন্ন আরব গোষ্ঠী বহুবার তাকে হত্যার চেষ্টা চালালেও প্রতিবারই তিনি প্রাণে বেঁচে যান।
২০১১ সালে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হলে প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ বারবার পরাজয়ের মুখে পড়েন। তখন তার সমর্থনে এবং ইরানের সীমান্তের বাইরে সামরিক অভিযানের দায়িত্ব নেয় কাশেম সোলাইমানির নেতৃত্বাধীন কুদস বাহিনী। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি একের পর এক সন্ত্রাসী সংগঠন ও ইরাকের ইসলামিক স্টেটকে (আইএস) পরাজিত করতে সক্ষম হন।
এর আগে ইরানের পূর্ব সীমান্তে মাদক চোরাচালান ও সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেছিলেন কাশেম সোলাইমানি। সেখানেও তার নেতৃত্ব ছিল সফল—সন্ত্রাসীদের দমন করে তিনি ওই অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনেন।
১৯৯৮ সালে তিনি কুদস বাহিনীর প্রধান নিযুক্ত হন। এই সময়েই লেবাননের হিজবুল্লাহর সঙ্গে ইরানের দীর্ঘদিনের বৈরি সম্পর্কের অবসান ঘটিয়ে তিনি একটি শক্তিশালী জোট গড়ে তোলেন। একই সঙ্গে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ ও ইরাকের শিয়া মিলিশিয়াদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রাখেন। ২০১১ সালের ২৪ জানুয়ারি তিনি জেনারেল পদে উন্নীত হন।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং শিয়া নেতাদের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে থাকার কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিনি আরও বেশি আলোচনায় আসেন। তার নেতৃত্বে কুদস বাহিনী ইরানের সীমান্ত ছাড়িয়ে গোয়েন্দা, সামরিক ও রাজনৈতিক—তিন ক্ষেত্রেই বিশ্বব্যাপী শক্তিশালী প্রভাব বিস্তার করে।
দক্ষিণ ইরানের কারমান প্রদেশের এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম কাশেম সোলাইমানির। মাত্র ১৩ বছর বয়স থেকেই পরিবারের জন্য কাজ শুরু করেছিলেন তিনি। ভারোত্তোলনের প্রতি তার আগ্রহ ছিল এবং অবসর সময়ে তিনি নিয়মিত খামেনির খুতবা শুনতে যেতেন।
ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের সময় তিনি প্রথম ইরানি সেনাবাহিনীর নজরে আসেন। সে সময় পশ্চিম আজারবাইজান রাজ্যে তিনি ছয় মাসের সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।
ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় তার নেতৃত্বে ইরাকের সীমান্ত পেরিয়ে পরিচালিত অভিযানের মধ্য দিয়েই তিনি ইরানের জাতীয় বীর হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। ২০০৫ সালে ইরাকে নতুন সরকার গঠনের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইব্রাহিম আল-জাফারি ও নুরি আল-মালিকির সময় ইরাকের রাজনীতিতে তার প্রভাব আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
২০১১ সালে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হলে বাশার আল আসাদকে রক্ষায় তিনি তার নিয়ন্ত্রিত ইরাকি মিলিশিয়াদের সিরিয়ায় পাঠানোর নির্দেশ দেন। পাশাপাশি ইসলামিক স্টেট অব দ্য ইরাক অ্যান্ড দ্য লেভান্টের (আইএসআইএল) বিরুদ্ধে ইরান-সমর্থিত হাশদ আল-শাবীর (পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস) একাধিক ইউনিট সরাসরি তার নিয়ন্ত্রণে যুদ্ধ করে।
তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের আমেরিকান স্টাডিজ বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ মারান্দি একবার বলেছিলেন, “আইএসআইএলকে পরাজিত করতে কাশেম সোলাইমানি মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন। এ কারণেই তিনি ইরানি জনগণ ও মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশের কাছে ‘জাতীয় বীর’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন।”
তিনি আরও বলেন, “কাশেম সোলাইমানি না থাকলে হয়তো এই পুরো অঞ্চলজুড়ে কালো পতাকা উড়তে দেখত বিশ্ব।”
ঢাকা/লিপি