ঢাকা     মঙ্গলবার   ২০ জানুয়ারি ২০২৬ ||  মাঘ ৬ ১৪৩২

Risingbd Online Bangla News Portal

সুরমার হাজার বছরের ইতিহাস

সাতসতেরো ডেস্ক || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১১:২৩, ২০ জানুয়ারি ২০২৬   আপডেট: ১১:২৫, ২০ জানুয়ারি ২০২৬
সুরমার হাজার বছরের ইতিহাস

ছবি: মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া

সুরমা কেবল সৌন্দর্যচর্চার উপকরণ নয়, এটি আধ্যাত্মিক বিশ্বাস আর উত্তরাধিকারের প্রতীক। এশিয়া থেকে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য থেকে আফ্রিকা—বিভিন্ন সভ্যতায় কাজল যুগ যুগ ধরে বহন করে চলেছে তার নিজস্ব তাৎপর্য। এই ঐতিহ্যের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও মিলেছে। গত বছরের ডিসেম্বরে জাতিসংঘের সাংস্কৃতিক সংস্থা ইউনেস্কো আরব অঞ্চলের কাজল ব্যবহারের ঐতিহ্যকে মানবজাতির অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ঐতিহ্যগতভাবে কাজল তৈরি হতো অ্যান্টিমনি, সীসা বা বিভিন্ন খনিজ পদার্থ দিয়ে। আধুনিক যুগে উপাদান বদলালেও, এর সাংস্কৃতিক গুরুত্ব একটুও কমেনি।

বিবিসি গ্লোবাল উইমেনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সাংবাদিক ও লেখক জাহরা হানকির বলেন, “আমি যখন ব্রুকলিনে আমার ফ্ল্যাটে বসে আইলাইনার পরি, তখন মনে হয়—আমি শুধু সাজছি না, আমি আমার মা, আমার দাদি এবং মধ্যপ্রাচ্যের অগণিত নারীর সঙ্গে এক গভীর সংযোগ তৈরি করছি।”

আরো পড়ুন:

এই অনুভূতি নিছক আবেগ নয়; কাজলের ইতিহাসই তা প্রমাণ করে। প্রাচীনকাল থেকেই নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মানুষ চোখে কাজল ব্যবহার করে আসছে। আরব বিশ্বে একে বলা হয় কুহল, দক্ষিণ এশিয়ায় কাজল বা সুরমা, ইরানে সোরমে, নাইজেরিয়ায় তিরো, আর ইংরেজিতে পরিচিত কোল বা আইলাইনার নামে।

ব্রিটিশ-লেবানিজ লেখক হানকিরের কাছে কাজল বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ১৯৭৫ সালের লেবাননের গৃহযুদ্ধের সময় তার পরিবার দেশ ছেড়ে ইংল্যান্ডে চলে যায়। তিনি বলেন, “বিদেশে থাকাকালীন আমি মাকে মেকআপ করতে দেখতাম। মনে হতো, তিনি যেন নিজের শিকড়ের সঙ্গে সংযোগ রাখছেন।”

ঐতিহ্যগত কাজল রাখার পাত্রকে বলা হয় মাখালা, আর চোখে লাগানোর কাঠিটির নাম মেরওয়াদ—যা নিজেই এক ধরনের কারুশিল্প।

‘আইলাইনার: আ কালচারাল হিস্ট্রি’ বইয়ের লেখক হানকির মনে করেন, ইউনেস্কোর স্বীকৃতি কাজলকে নিছক ফ্যাশন ট্রেন্ড হিসেবে নয়, বরং একটি জীবন্ত সাংস্কৃতিক চর্চা হিসেবে তুলে ধরেছে।

প্রাচীন সভ্যতা থেকে আধুনিক যুগ
কাজলের শিকড় খুঁজে পাওয়া যায় প্রাচীন মিশর, মেসোপটেমিয়া ও পারস্য সভ্যতায়। হানকির জানান, প্রাচীন মিশরে লিঙ্গ বা শ্রেণিভেদ ছাড়াই সবাই কাজল ব্যবহার করত।এমনকি পরকালের জন্যও—মিশরীয়রা কবরের সঙ্গে কাজলের পাত্র রেখে দিতেন।

নেফারতিতি
১৯১২ সালে তার আবক্ষ মূর্তি আবিষ্কারের পর ধোঁয়াটে কালো কাজলে আঁকা চোখ গোটা বিশ্বের দৃষ্টি কেড়ে নেয়। হানকির লেখেন, “তার ভ্রু নিখুঁতভাবে বাঁকানো, চোখে কাজলের ছায়া—সব মিলিয়ে সৌন্দর্য ছিল সাবলীল অথচ শক্তিশালী।” এই ‘এক্সোটিক’ সৌন্দর্য জার্মানিসহ ইউরোপীয় নারীদের অনুপ্রাণিত করে, কাজল হয়ে ওঠে ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের প্রতীক। আজও ইউটিউব, টিকটক ও ইনস্টাগ্রামে নেফারতিতি লুকের অসংখ্য টিউটোরিয়াল দেখা যায়।

সুরমা-কাজল-আইলাইনার নিয়ে গবেষণার কাজে হানকির ঘুরেছেন কেরালা, সুদান, মেক্সিকো, জর্ডান, জাপানসহ বহু দেশে। অভিজ্ঞতায় দেখেছেন—অর্থ ভিন্ন হলেও, কাজলের মূল ভাবনা প্রায় সর্বত্রই সুরক্ষার সঙ্গে জড়িত।

  • শিশুদের চোখে কাজল—রক্ষা ও শুভ কামনার প্রতীক
  •  বাংলাদেশে শিশুর কপালে বা চোখে কাজল দেওয়ার রীতি
  •  জাপানের গেইশারা লাল আইলাইনার ব্যবহার করেন মন্দ আত্মা তাড়ানোর বিশ্বাসে
  •  মেক্সিকান-আমেরিকান চোলা সংস্কৃতিতে আইলাইনার পরিচয় ও প্রতিরোধের প্রতীক

‘চাদে ওয়াদাবি’ যাযাবর গোষ্ঠীর পুরুষরা সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে চোখে কাজল পরেন। জর্ডানের বেদুইন পুরুষদের কাছে এটি শুধু ধর্মীয় বা ব্যবহারিক নয়—পুরুষত্বে প্রবেশ ও অবিবাহিত থাকারও একটি চিহ্ন।

হানকির মতে, “এ চোখে কাজল বা সুরমা লাগানো প্রায় এক ধরনের আধ্যাত্মিক চর্চা। আপনি শুধু চোখে দাগ টানছেন না—আপনি ইতিহাস, সংস্কৃতি আর প্রজন্মের সঙ্গে সংযুক্ত হচ্ছেন।” হাজার বছর ধরে সেই কালো রেখা তাই আজও বহন করে চলেছে মানুষের স্মৃতি, বিশ্বাস আর শিকড়ের গল্প।

সূত্র: বিবিসি

ঢাকা/লিপি

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়