বুক রিভিউ
পিওনা আফরোজের ‘বিকেলের অনেক রং’ এর গল্পেরও অনেক রং
কাজী রাফি || রাইজিংবিডি.কম
‘বিকেলের অনেক রং’—পিওনা আফরোজের গল্পগ্রন্থের গল্পেরও অনেক রং। গল্পগুলোতে সম্পর্কের সংকট, সামাজিক পতন যেমন এসেছে, তেমনি এসেছে ভালোবাসা এবং প্রতারণার বিষয়ও। পিওনার ভাষা সহজ; জীবনকে দেখার যে দুই চোখ, তা মানবিক এবং মর্মস্পর্শী। মানবিকতার গভীর বোধকে ধারণ করে তিনি গল্প নির্মাণ করেছেন।
জীবন এক বহমান নিষ্ঠুর অভিযাত্রা। মানবিক সম্পর্কের মাঝে হিসাব আর হিস্যা নিয়ে যে টানাপোড়েন—তা তিনি তাঁর গল্পগ্রন্থে নিষ্ঠার সঙ্গে তুলে আনার চেষ্টা করেছেন। আমি মনে করি, তাঁর অনেক গল্পই পাঠকের মনে দাগ কাটবে।
শিরোনাম গল্পে আমরা পিয়া নামের এক কিশোরীকে পাই, যার বাবা হাসপাতালে। পিয়া তার ধনী আত্মীয়ের কাছে সাহায্য চাইতে গিয়ে জীবনের যে নিষ্ঠুর সত্য আবিষ্কার করে, তা তার কিশোরী হৃদয়কে এতটা ক্ষতবিক্ষত করে যে সে ভুলে যায় সময়–ক্ষণ–কাল। জীবনের প্রতি নিদারুণ অভিমান নিয়ে সে গভীর এক বোধশূন্যতায় তলিয়ে যায়। তার জীবনরেখা যেন মিলিয়ে যেতে থাকে রেললাইনের পথে—যে পথ ধরে বিকেলের কনে-দেখা আলোয় এগিয়ে আসে একটা ট্রেন। যন্ত্রদানবটা তবু শব্দহীন মনে হয় পিয়ার।
গল্পকারের বর্ণনায়— “পিয়া এমনভাবে হেঁটে চলে যেন তার সামনে কোনো গন্তব্য নেই, কোনো ঠিকানা নেই। বাবার হাসপাতাল কোথায়, চেনা কোন্ রাস্তার ধারে একটা কৃষ্ণচূড়ার গাছ ছিল—অনেক ভেবেও সেসবের কিছুই মনে পড়ে না তার। চোখের সামনে থেকে ঢাকা শহরের যানজট, মানুষের কোলাহল—সবকিছু কেমন করে যেন উধাও হয়ে গেছে! অথচ তাদের চোখগুলো যেন তার দিকে সকরুণ তাকিয়ে আছে। তার ক্ষুধার্ত, অপুষ্ট শরীরের বাঁকে বাঁকে অদ্ভুত এক ভয় আর লজ্জা জেগে ওঠে। মানুষের এইসব দৃষ্টি ক্রমশ তার কাছে ঠাট্টা আর বিদ্রুপ বলে মনে হয়। ভাবে, দরিদ্র পরিবারের বড় কন্যা হয়ে জন্মালে এভাবেই বুঝি জীবন তাদের সঙ্গে কথা বলে! তবে কি এরাও তাকে যাকাত দেবে কি না, সে কারণেই অমন করে তাকিয়ে থেকে যাচাই করে নিচ্ছে? সে পালাতে চায়। প্রেম নয়, স্বপ্ন নয়—কনে-দেখা বিকেলের আলোয় তার দুই চোখে সমান্তরাল এক পথ জেগে ওঠে, যেখানে দুটো পাত কোনো এক ধূসর দিগন্তে মিলিয়ে গেছে। পাশাপাশি দুটি জীবন যেন—একটি স্বপ্ন, অন্যটি প্রত্যাশা; কিন্তু যারা একে অন্যের কাছে কখনোই ধরা দেয় না। পিয়া সত্যি সত্যি যেন এক পথের খোঁজ পায়। জীবনের উদ্দেশ্যের সন্ধান পেয়ে তার ভেতরে এক গভীর স্থিরতা নেমে আসে। দিগন্তের দিকে হাঁটতে থাকে সে, যেখানে দুই সমান্তরাল পথ একসঙ্গে মিলেছে।”
পিওনা আফরোজের এই বর্ণনাশৈলী গল্পের গভীরে পাঠককে নিয়ে যায়। গল্পকার আমাদের সরাসরি জানান না, পিয়ার এরপর কী হয়। কিন্তু টিভির খবরে পাঠক জানতে পারেন যে মালিবাগ রেলক্রসিংয়ে একজন কিশোরীর পড়ে থাকা মৃতদেহের কথা। গল্পকারের বর্ণনা-কৌশলে আমাদের হৃদয় ভিজে ওঠে।
যারা এভাবে রেলক্রসিংয়ে আনমনা হাঁটতে হাঁটতে জীবন বিসর্জন দেন, তাদের সকলের জীবনের পেছনের গল্পগুলো কেমন অদৃশ্য হয়ে আমাদের চেতনাপটে হাহাকার জাগিয়ে তোলে—এখানেই গল্পকারের সার্থকতা।
এই গ্রন্থের অন্যান্য গল্পগুলোতেও পিওনা আফরোজ নিষ্ঠার সঙ্গে সময় ও সমাজকে তুলে আনার চেষ্টা করেছেন। পাঠক তার গল্পে জীবনের অনেক রং খুঁজে পাবেন—এই প্রত্যাশা।
গল্পগ্রন্থ: বিকেলের অনেক রং
প্রকাশক: বিদ্যাপ্রকাশ
প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ
ঢাকা/লিপি