ইরান আলোচনায় পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকার কথা জানালেন ট্রাম্প
আন্তর্জাতিক ডেস্ক || রাইজিংবিডি.কম
সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ইরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের পরমাণু আলোচনার দ্বিতীয় বৈঠকটিতে তিনি ‘পরোক্ষভাবে’ যুক্ত থাকবেন। বৈঠকটি আজ মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠিত হবে। খবর আল-জাজিরার।
স্থানীয় সময় সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) এয়ার ফোর্স ওয়ানে সংবাদিকদের এ তথ্য জানান ট্রাম্প। যখন ইরানের
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনার প্রস্তুতি নিতে ইরানের পররাষ্টমন্ত্রী পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ইতিমধ্যে জেনেভোয় পৌঁছেছেন।
এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা তুঙ্গে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের কাছে আরো একটি যুদ্ধবিমানবাহী রণতরী মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি সতর্ক করেছেন যে, ইরানের ওপর যেকোনো হামলার পরিণতি হবে একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ।
এয়ার ফোর ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই আলোচনাকে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ বলে অভিহিত করেন।
ট্রাম্প বলেন, “আমি এই আলোচনায় পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকব। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ হবে। ইরান খুবই কঠিন আলোচক।”
চুক্তির সম্ভাবনা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে ট্রাম্প বলেন, “গত জুনে ইরান তাদের কঠোর অবস্থানের পরিণতি দেখেছে।” গত বছরের জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে ১২ দিনের যুদ্ধে যোগ দিয়েছিল এবং দেশটির তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালিয়েছিল।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পরোক্ষ আলোচনার মধ্যেই ওই হামলাগুলো চালানো হয়েছিল, যার ফলে আলোচনা তখন ভেস্তে যায়।
তবে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, এবার তেহরান আলোচনার বিষয়ে আগ্রহী। তিনি বলেন, “আমার মনে হয় না তারা চুক্তি না করার পরিণতি ভোগ করতে চায়।”
চুক্তি নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ইতিবাচক মন্তব্যের পরেও এই আলোচনার পথে বড় ধরনের বাধা রয়েছে। ওয়াশিংটন দাবি করেছে, তেহরানকে তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রকল্প বন্ধ করতে হবে ও আলোচনার পরিধি বাড়িয়ে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র মজুদের মতো বিষয়গুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
কিন্তু ইরান বরাবরই তাদের পারমাণবিক কর্মসূচিকে শান্তিপূর্ণ বলে দাবি করে আসছে। তেহরান বলেছে, তারা কেবল মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিনিময়ে তাদের কর্মসূচিতে কিছু সীমাবদ্ধতা আনতে রাজি। তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ত্যাগ করার মার্কিন দাবি তারা মেনে নেবে না এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে কোনো আলোচনা হবে না।
‘ন্যায়সংগত ও সমতাপূর্ণ চুক্তি’ চায় ইরান
সোমবার ভোরে জেনেভায় পৌঁছানোর পর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি বলেন, তিনি ‘একটি ন্যায্য ও সমতাপূর্ণ চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য বাস্তবসম্মত ধারণা নিয়ে’ এসেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে তিনি আরো যোগ করেন, “যেটি আলোচনার টেবিলে নেই তা হলো: হুমকির কাছে আত্মসমর্পণ।”
ইরানি এই কূটনীতিক জেনেভায় জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) প্রধান রাফায়েল গ্রোসির সঙ্গেও প্রযুক্তিগত বিষয়ে আলোচনা করেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর তেহরান জাতিসংঘের এই নজরদারি সংস্থার সঙ্গে সহযোগিতা স্থগিত করেছিল।
ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর ইরানের ৪৪০ কেজি উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের কী হয়েছে, তা জানাতে এবং ক্ষতিগ্রস্ত তিনটি প্রধান পারমাণবিক স্থাপনা (নাতানজ, ফোর্ডো এবং ইসফাহান) সহ অন্যান্য স্থাপনাগুলোতে পরিদর্শকদের পূর্ণ প্রবেশাধিকার দিতে আইএইএ কয়েক মাস ধরে ইরানকে চাপ দিচ্ছে।
তেহরান ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি এমন স্থাপনাগুলোতে আইএইএ-কে কিছু প্রবেশাধিকার দিলেও, তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক স্থাপনাগুলো পরিদর্শনের অনুমতি দেয়নি।
আল জাজিরার তেহরান প্রতিনিধি রসুল সেরদারের মতে, আলোচনার আগে ইরানের রাজধানীতে এক ধরনের ‘আশাবাদ’ দেখা যাচ্ছে।
তিনি বলেন, “এখানকার কর্মকর্তারা বলছেন যে, জেনেভায় ইরানি প্রতিনিধি দলে পূর্ণ ক্ষমতাপ্রাপ্ত অর্থনৈতিক, আইনি, রাজনৈতিক ও প্রযুক্তিগত দল রয়েছে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে ইরানি পক্ষ তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে কিছু বড় ছাড় দিতে প্রস্তুত।”
তবে সেরদার এটাও জানান যে, এই আলোচনা এমন সময়ে হচ্ছে যখন মধ্যেপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সামরিক শক্তি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করছে। অন্যদিকে ইরানও পিছিয়ে নেই; সোমবার পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালীতে সামরিক মহড়া শুরু করেছে ইরানের শক্তিশালী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)।
ইরান দীর্ঘদিন থেকেই হুমকি দিয়েছে যে, দেশটির ওপর কোনো হামলা হলে তারা বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেলের রুট হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেবে। এই পদক্ষেপ নেওয়া হলে বিশ্বব্যাপী তেল প্রবাহের এক-পঞ্চমাংশ বন্ধ হয়ে যাবে এবং তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে।
এছাড়া ইরান মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে হামলারও হুমকি দিয়েছে, যা একটি বৃহত্তর যুদ্ধের শঙ্কা তৈরি করেছে।
সেরদার বলেন, “কূটনৈতিক তৎপরতার সমান্তরালে এই সামরিক উত্তেজনাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। আঞ্চলিক দেশগুলোও তাদের নিজস্ব উদ্বেগ ও ভয়ের কারণে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করছে।”
ঢাকা/ফিরোজ