শীর্ষ নেতাদের হারিয়েও ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো কেন ভাঙছে না
আলি লারিজানি, গোলাম রেজা সোলেইমানি
ইরানের নিরাপত্তা প্রধান আলি লারিজানিকে ইসরায়েল হত্যা করলেও তা দেশটির নেতৃত্বের জন্য কোনো মারাত্মক আঘাত হবে না বলে জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি।
বুধবার (১৮ মার্চ) ভোরে তেহরান লারিজানির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করার পর আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এখনো বুঝতে পারেনি যে ইরানের সরকার কোনো একক ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়।
আরাঘচি বলেন, “আমি জানি না কেন আমেরিকান এবং ইসরায়েলিরা এখনো এই বিষয়টি বুঝতে পারছে না- ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক কাঠামো রয়েছে যেখানে সুপ্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান।”
তিনি আরও বলেন, “কোনো একক ব্যক্তির উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি এই কাঠামোকে প্রভাবিত করে না। অবশ্যই ব্যক্তিরা প্রভাবশালী এবং প্রতিটি ব্যক্তি তাদের নিজস্ব ভূমিকা পালন করেন- কেউ ভালো, কেউ খারাপ, কেউ বা কিছুটা কম- তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা খুবই সুদৃঢ় একটি কাঠামো।”
আরাঘচি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার প্রথম দিনে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির হত্যাকাণ্ডের কথা উল্লেখ করে বলেন, এত বড় জাতীয় ক্ষতি সত্ত্বেও ‘ব্যবস্থাটি টিকে আছে’।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমাদের কাছে সর্বোচ্চ নেতার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেউ ছিল না এবং সেই নেতাই যখন শহীদ হলেন, তখনও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা তার কাজ চালিয়ে গেছে এবং অবিলম্বে তার স্থলাভিষিক্ত নিশ্চিত করেছে। অন্য কেউ শহীদ হলেও বিষয়টি একই থাকবে। এমনকি যদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীও শহীদ হন, তবে শেষ পর্যন্ত এই পদে বসার জন্য অন্য কেউ আসবে।”
৬৭ বছর বয়সী লারিজানি ছিলেন নিহত আলি খামেনি এবং তার পুত্র ও উত্তরসূরি মোজতবা খামেনির খুব ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত ব্যক্তি। গত সোমবার (১৬ মার্চ) রাতে তাকে হত্যার ঘটনাটি ১৯ দিন আগে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তেহরানের নেতৃত্বের ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত।
মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আরও নিশ্চিত করেছে যে, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) আধাসামরিক বাহিনী ‘বাসিজ’-এর প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল গোলাম রেজা সোলেইমানিও একটি ‘আমেরিকান-জায়নবাদী শত্রু (ইসরায়েলি)’ হামলায় নিহত হয়েছেন।
গত ছয় বছর ধরে দেশটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার সবচেয়ে শক্তিশালী বাহিনী বাসিজ-এর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সোলেইমানি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ লড়াইয়ে একজন মূল নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন।
আল-জাজিরার সিনিয়র রাজনৈতিক বিশ্লেষক মারওয়ান বিশারা বলেন, ইসরায়েল দীর্ঘকাল ধরে তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের হত্যার পথ বেছে নিয়েছে, যা যুদ্ধের কোনো স্বাভাবিক নিয়ম নয়।
তিনি বলেন, “যুদ্ধে আপনি রাজনৈতিক নেতাদের, এমনকি নির্বাচিত নেতাদের হত্যা করে শুরু করেন না। এই হত্যাকাণ্ডের কর্মসূচিটি গ্যাংস্টারদের মতো, এটি সন্ত্রাসবাদ, এটি যুদ্ধের রীতি নয়।”
বিশারা আরও বলেন, যদিও ‘ইরানের শাসন ব্যবস্থা শক্তিশালী এবং একজন নেতাকে হত্যা করলেই ব্যবস্থার পতন ঘটবে না’, তবে এ ধরনের লক্ষ্যবস্তু হত্যাকাণ্ডগুলো প্রভাব ফেলে কারণ ‘পরিমাণগত পরিবর্তন গুণগত পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যায়’।
আল-জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচি আবারও বলেন, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল ও এর বাইরে বাড়তে থাকা এই সংঘাত তেহরানের পছন্দ নয় এবং এর জন্য শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকেই দায়ী করতে হবে।
মন্ত্রী বলেন, “আমি আবারও বলছি: এই যুদ্ধ আমাদের যুদ্ধ নয়। আমরা এটি শুরু করিনি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এটি শুরু করেছে এবং এই যুদ্ধের সমস্ত পরিণতির জন্য- তা মানবিক হোক বা আর্থিক, ইরানের জন্য হোক, অঞ্চলের জন্য হোক বা পুরো বিশ্বের জন্য- তারাই দায়ী।”
তিনি আরো বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে।”
ঢাকা/ফিরোজ