ঢাকা     শুক্রবার   ১০ এপ্রিল ২০২৬ ||  চৈত্র ২৭ ১৪৩২ || ২১ শাওয়াল ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

‘মুসলিমদের বোকা বানানো খুব সহজ’

কলকাতা ব্যুরো || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২২:৩১, ৯ এপ্রিল ২০২৬  
‘মুসলিমদের বোকা বানানো খুব সহজ’

“মুসলিমদের বোকা বানানো খুব সহজ,বাবর কী করেছে তাতে আমার কিছু এসে যায় না।কিন্তু ‘বাবরি’ নামটা ইমোশন। মানুষের এই আবেগটাকেই আমি ধরেছি।” 

কোনো বিজেপি নেতা নয়, এমন কথা বলছেন খোদ বাবরি মসজিদ পুননির্মাণের মূল উদ্যোক্তা হুমায়ুন কবির ! 

বিধানসভা ভোটের মুখে হুমায়ুন কবিরের উপর চালানো এমন একটি বিস্ফোরক স্ট্রিং ভিডিও প্রকাশ করেছে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেস ! যেখানে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কে ক্ষমতা থেকে সরাতে এক হাজার কোটি টাকার বিনিময়ে হিন্দু মুসলিম ভোট ভাগাভাগির চুক্তি করতে দেখা গেছে। ভিডিওটির সত্যতা যাচাই করতে পারেনি রাইজিংবিডি।

ভিডিওটিতে যে তারিখ উল্লেখ রয়েছে তা গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর। ১৯ মিনিটের ওই ভিডিওতে বিজেপির সঙ্গে হুমায়ুনের ‘গোপন আঁতাঁত’-এর কথা উঠে এসেছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

ওই ভিডিওতে হুমায়ুনকে নিজের মুখেই বলতে শোনা গিয়েছে, যেকোনো মূল্যে তিনি মমতাকে হারাতে চান। সেজন্য বিজেপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে তার কথা হয়েছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের সঙ্গেও কথা হয়েছে। 

প্রকাশ্যে আসা ভিডিও-টি কোনো এক বিজেপি নেতার সঙ্গে হুমায়ুনের কথোপকথনের অংশ। ওই কথোপকথনে হুমায়ুন বলছেন,“আজকের দিনে যে বিষয়টা তুলেছি না বাবরি মসজিদে… সেটা হবে কি না হবে, তা পরের বিষয়। আজকের দিনে পুরো ভারতের মুসলিমেরা আমার সঙ্গে আছে। যে কোনো মূল্যে আমি মমতাকে সরাতে চাই। শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তিনি আমাকে বলেন দিল্লি নিয়ে গিয়ে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেবেন। আমার প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের সঙ্গেও কথা হয়েছে।”

আম জনতা উন্নয়ন পার্টির চেয়ারম্যান বলতে থাকেন, “প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকেই আমাকে বলা হয়, মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মোহন যাদবের সঙ্গে কথা বলতে। মোহন যাদবজির সঙ্গে আমার নিয়মিত কথা হচ্ছে।” হুমায়ুন ইঙ্গিত দিয়েছেন, অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার সঙ্গেও কথা হয়েছে তাঁর।

ভিডিওতে আমজনতা উন্নয়ন পার্টির চেয়ারম্যানকে বলতে শোনা গিয়েছে, রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে তার। ফেসটাইমে কথা হয় তাদের। ইচ্ছাকৃতই তারা একে অপরের বিরুদ্ধে ভাষণ দেন। এভাবেই তারা একটা হিন্দু-মুসলিম বিদ্বেষের বাতাবরণ তৈরি করেছেন। তারপরেও শুভেন্দু স্বীকার করে নিয়েছেন কোনোভাবেই বিজেপির পক্ষে ১০০-১২০ আসনের বেশি পাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু মমতার থেকে মুসলিম ভোট সরাতে পারলেই বিজেপি জিতবে। 

হুমায়ুন আরো বলতে থাকেন “মুসলিমদের বোকা বানানোর পরিকল্পনা ছেপে ফেলেছি। মুসলিমদের বোকা বানানো খুব সহজ। বাবর কি করেছে তাতে আমার কিছু এসে যায় না। কিন্তু বাবরি মসজিদ নিয়ে ওদের আবেগটাকে আমি ধরে ফেলেছি।”

হুমায়ুন বলেন, “আমি অন্তত ৭০-৮০টি মুসলিম অধ্যুষিত আসন পাব। সেটার জন্য আমার কিছু টাকার দরকার। প্রতিটি কেন্দ্রে ৩-৪ কোটি টাকা করে খরচ করতে হবে। সব মিলিয়ে হাজার কোটি টাকা দরকার। অ্যাডভান্স ২০০ কোটি। বাবরি ইস্যুটা তোলার পর মানুষের আবেগ যেভাবে আমার দিকে ঝুঁকেছে তাতে আমি নিশ্চিত ৮০-৯০ আসন পাবই।”

বৃহস্পতিবার দুপুরে সাংবাদিক বৈঠক ডেকে তৃণমূলের দাবি, বিজেপির কাছ থেকে এক হাজার কোটি টাকা চেয়েছেন হুমায়ুন। ওই ভিডিও প্রকাশ্যে আসতেই ফিরহাদ হাকিম, কুণাল ঘোষ, অরূপ বিশ্বাসরা একযোগে হুমায়ুনের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। 

তৃণমূলের বেলেঘাটার প্রার্থী কুণাল ঘোষের প্রশ্ন, “পিএমও বা প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের কোন কর্মকর্তা এই কোটি কোটি টাকার খেলায় মদত দিচ্ছেন? কেন ইডি এখন হাত গুটিয়ে বসে আছে? হুমায়ুন কবীরকে নোটিশ পাঠিয়ে জেরা করা হোক।”

কুনালের আর অভিযোগ, “পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে মেরুকরণের রাজনীতি করতে বিজেপি ১০০০ কোটি টাকার একটি  কেলেঙ্কারি চালাচ্ছে। বিজেপি টাকা দিয়ে ভোট কেনার খেলা খেলছে। আমরা এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত চাই।”

ফিরহাদ হাকিম রীতিমতো চড়া সুরে বলেন, “টাকার বিনিময়ে মুসলমানদের ভাবাবেগ নিয়ে এভাবে ছিনিমিনি খেলাটা অন্যায়। এটা পাপ। এর পরে ওই কুলাঙ্গার, কীট হুমায়ুনকে একটা ভোটও দেওয়া উচিত নয়। বাংলার মুসলমানরা কি এতটাই বোকা? আমাদের ইমান আপনি টাকার জন্য বিক্রি করে দিতে পারেন না। এটা পাপ, পাপ, পান। ওই কীটকে একটিও ভোট নয়।”

এদিকে তৃণমূলের ‘ফাঁস’ করা ভিডিও নিয়ে এ বার পাল্টা মুখ খুলেছেন হুমায়ুন কবীর। তার দাবি, কৃত্রিম মেধা (এআই) ব্যবহার করে ওই ভিডিওটি তৈরি করা হয়েছে। সরাসরি রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে না পেরেই এই পরিকল্পনা করেছে তৃণমূল। ১০০০ কোটি তো দূরের কথা, ১ কোটি টাকারও ডিল হয়েছে— এমন প্রমাণ যদি দেখাতে পারে, তা হলে তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াবেন।

ভিডিওর সত্যতা প্রমাণ করতে না পারলে হাই কোর্টে মামলা করারও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।

হুমায়ুন বলেন, “প্রমাণ করতে না-পারলে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা বদনাম দেওয়া এআই ভিডিয়ো করার জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিষেক, কুণাল ঘোষ, ববি হাকিমের বিরুদ্ধে হাই কোর্টে মামলা করব।”

নির্বাচনের মুখে এমন একটি স্পর্শকাতর ভিডিও প্রকাশ পাওয়ায় রাজ্য রাজনীতিতে মেরুকরণ এবং দুর্নীতির ইস্যু একযোগে মাথা চাড়া দিয়েছে। এর আগেও ভোটের আগে দুটি স্টিং অপারেশন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে হইচই ফেলে দিয়েছিল— ২০১৬ সালের নারদা ঘুষ কেলেঙ্কারি এবং ২০২৪ সালে সন্দেশখালি। এর পর আরো একটি স্টিং অপারেশন প্রকাশ্যে এল। 


 

ঢাকা/সুচরিতা/শাহেদ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়