ঢাকা     মঙ্গলবার   ১০ মার্চ ২০২৬ ||  ফাল্গুন ২৫ ১৪৩২ || ২০ রমজান ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

তেল পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা

নিজস্ব প্রতিবেদক || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১১:৪৩, ৯ মার্চ ২০২৬   আপডেট: ১১:৪৮, ৯ মার্চ ২০২৬
তেল পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা

রাজধানীর একটি পেট্রোল পাম্পের বাইরে গাড়ির সিরিয়াল। রবিবার তোলা ছবি।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সরকার জ্বালানি সাশ্রয়ে ‘রেশনিং পদ্ধতি’ চালু করেছে। এর ফলে পাম্পগুলোতে মোটরসাইকেলের পাশাপাশি দীর্ঘ হচ্ছে ব্যক্তিগত গাড়ির লাইন। ব্যক্তিগত গাড়ির মালিকরা বলছেন, চাহিদামতো তেল না পাওয়ায় কেবল তাদের যাতায়াতই ব্যাহত হচ্ছে না, বরং পাম্পের লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে গিয়ে নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান কর্মঘণ্টা। 

রবিবার (৮ মার্চ) রাজধানীর তেজগাঁও, শাহবাগ, নীলক্ষেতসহ গুরুত্বপূর্ণ পাম্পগুলোতে গিয়ে এমন চিত্র দেখা গেছে।

আরো পড়ুন:

রাজধানীর নীলক্ষেত মোড়ের পথের ‌বন্ধু ফিলিং স্টেশনে গাড়িতে তেল নিতে অপেক্ষা করছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী রাকিব হাসান সুমন। তিনি রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “আমার মেয়ে উদয় স্কুলে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। প্রতিদিন ওকে স্কুল দিয়ে তারপর আমি অফিসে যাই। তেল নিতে এসে আটকে পড়ে গিয়েছি। বাধ্য হয়ে আমার মেয়েকে রিকশায় স্কুলে পাঠিয়েছি। গাড়ির তেলের কাঁটা একদম লাল হয়ে আছে, এই লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই যেটুকু তেল ছিল তাও প্রায় শেষ।” 

তিনি বলেন, “সরকার রেশনিং করছে ভালো কথা, কিন্তু আমাদের মতো যারা প্রতিদিন গাড়ি নিয়ে বের হতে বাধ্য হয়, তাদের সময় আর কাজের যে ক্ষতি হচ্ছে সেটার দায় কে নেবে?”

রাজধানীর শাহবাগের মেঘনা মডেল সার্ভিস সেন্টার ফিলিং স্টেশনে তেলের জন্য লাইনে অপেক্ষা করছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী রিয়াল খান। তিনি বলেন, “দুই ঘণ্টা ধরে লাইনে আছি। অফিসের জরুরি মিটিং ছিল, সেটা তো মিস হলোই, এখন শুনছি, ২ হাজার টাকার বেশি তেল দেবে না। আমার গাড়ির তেলের কাঁটা একদম নিচে, এইটুকু তেলে কাল অফিস সেরে বাসায় ফিরতে পারব কি না সন্দেহ। নিজের গাড়ি থাকা সত্ত্বেও যদি তেলের জন্য এভাবে রাস্তার ওপর ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, তবে এর চেয়ে বড় বিড়ম্বনা আর কী হতে পারে? সরকার রেশনিং ব্যবস্থা করেছে। তারা তেল দেওয়ার পরিমাণটা আরো বেশি করতে পারত।” 

তিনি বলেন, “জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের জন্য জরুরি হলেও, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন গতিশীলতা বজায় রাখা সমান গুরুত্বপূর্ণ। তেলের এই কোটা পদ্ধতি কতদিন স্থায়ী হবে কিংবা ভবিষ্যতে আরো কঠোর হবে কি না সেটা চিন্তার বিষয়। এখনই সরকার যদি বাস্তবসম্মত কোনো বিকল্প বা সমন্বয় না করেন, তবে এই দীর্ঘ লাইন কেবল পাম্পের প্রবেশমুখেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা জাতীয় অর্থনীতির গতিতে প্রভাব ফেলবে।”

তেজগাঁওয়ের মেসার্স শিকদার ফিলিং স্টেশনের একজন ম্যানেজার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমাদের ওপর সরকারের কড়া নির্দেশনা আছে, রেশনিংয়ের বাইরে এক ফোঁটা তেলও বেশি দেওয়ার সুযোগ নেই। অনেক ব্যক্তিগত গাড়ির মালিক এটা বুঝতে চান না। তারা আমাদের কর্মীদের সঙ্গে তর্ক করছেন, অনেকে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করছেন। আমাদের সিস্টেমে তেলের সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে, ফলে চাইলেও আমরা কাউকে বেশি তেল দিতে পারছি না। এই লিমিটেশনের কারণে প্রতিটি গাড়ির পেছনে সময় বেশি লাগছে, যা পাম্পের শৃঙ্খলা রাখা এবং এই বিশাল লাইন সামলানো আমাদের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

শাহবাগের মেঘনা মডেল সার্ভিস সেন্টার ফিলিং স্টেশনের হিসাবরক্ষক এম এ মান্নান মজুমদার বলেন, “সকাল থেকে এক মিনিটও বসার সময় পাচ্ছি না। প্রতিটা গাড়ির চালকের সঙ্গে তেল দেওয়া নিয়ে ঝগড়া করতে হচ্ছে। কেউ বলছেন, জরুরি কাজে ঢাকার বাইরে যাবেন, কেউ বলছেন তেল না পেলে রাস্তায় গাড়ি থেমে যাবে সবাই ফুল ট্যাংক চান। কিন্তু আমরা তো নিরুপায়। রেশনিংয়ের নিয়ম মানতে গিয়ে বারবার মিটার চেক করতে হচ্ছে এবং গ্রাহকদের বোঝাতে হচ্ছে, যার কারণে প্রতিটি গাড়ির পেছনে অতিরিক্ত সময় নষ্ট হচ্ছে। কাস্টমারদের এই তীব্র বিরক্তি আর ক্ষোভের মুখে আমাদের কর্মীরাও মানসিকভাবে চাপে পড়ে যাচ্ছেন।”

সরকার জ্বালানি সাশ্রয়ে রেশনিং পদ্ধতিতে জ্বালানি তেল সরবরাহের জন্য বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গত ৬ মার্চ সরকারি সংস্থাটি জানায়, একটি মোটরসাইকেলে দিনে ২ লিটার পেট্রল বা অকটেন নিতে পারবে। ব্যক্তিগত গাড়ির ক্ষেত্রে নেওয়া যাবে ১০ লিটার তেল। স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিক্যাল বা এসইউভি (যা জিপ নামে পরিচিত) ও মাইক্রোবাস দিনে পাবে ২০ থেকে ২৫ লিটার তেল। পিকআপ বা লোকাল বাস দিনে ডিজেল নিতে পারবে ৭০ থেকে ৮০ লিটার। আর দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান বা কনটেইনার ট্রাক দৈনিক ২০০ থেকে ২২০ লিটার তেল নিতে পারবে।

ঢাকা/রায়হান/মাসুদ

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়