ঢাকা     শনিবার   ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ||  ফাল্গুন ১ ১৪৩২

Risingbd Online Bangla News Portal

ভালোবাসা কারে কয়

মোস্তফা মোরশেদ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১২:১২, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬  
ভালোবাসা কারে কয়

ভালোবাসা কী? বোধকরি জীবনের এ বয়সে (অর্ধেক জীবন) এসেও সংজ্ঞায়িত করতে পারিনি। একেক জনের কাছে ভালোবাসার স্বরূপ, এর প্রকাশভঙ্গি, অনুভূতি, বিশ্লেষণ ও লালন করার দৃষ্টিভঙ্গি একেক রকম। এর সঙ্গে মানুষের বেড়ে ওঠা, আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট, পাঠ গ্রহণ, শিক্ষা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানসমূহের ধরন ও প্রভাব, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিসহ অনেক প্রভাবক কাজ করে। 

ভালোবাসাকে সাধারণত একটি আবেগ বা অনুভূতির বিষয় হিসেবে ধরা হয়। প্রায়শই মানুষ ভাবে—ভালোবাসা হলো আকর্ষণ, আনন্দ, উত্তেজনা বা এক ধরনের আবেগপূর্ণ সংযোগ। তবে মনোবিজ্ঞান এবং সম্পর্কবিজ্ঞানের আলোকে দেখা যায়, ভালোবাসা একটি গভীর, কাঠামোবদ্ধ মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া। এটি কেবল অনুভূতির ব্যাপার নয়; এটি সম্পর্কের ধারা, আচরণ, প্রতিশ্রুতি এবং আত্মপরিচয়ের সংযোগ দ্বারা গঠিত। আমাদের দেশ বা দক্ষিণ এশীয় সমাজে, যেখানে পরিবার, ধর্ম এবং সামাজিক মানদণ্ড সম্পর্কের কাঠামোকে প্রভাবিত করে, ভালোবাসার মানসিক কাঠামো শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়, বরং সামাজিক অনুমোদন ও বিধিনিষেধের সঙ্গেও যুক্ত।

আরো পড়ুন:

ভালোবাসার অনুভূতি প্রকাশ কিংবা লালন দেশ ভেদে ভিন্ন হয়, এর সঙ্গে ব্যক্তিত্ব সম্পর্কিত। আবার অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল মানুষের প্রকাশভঙ্গি নিম্ন-আয়ের মানুষের সঙ্গে পার্থক্য তৈরি করবে। নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে একটি উদাহরণ দেই। ইউরোপে একজন মা তার বাচ্চাকে নিয়ে গণপরিবহনে যাতায়াত করতে গেলে দেখা যাবে বাচ্চাকে সামনের দিকে বসিয়ে তিনি পিছনে গিয়ে বসছেন। ঐ দৃশ্য যখন আমি প্রথম দেখি তখন আমি চমকে উঠেছিলাম। মনে হলো ঐ জায়গায় আমি হলে বাচ্চাকে সাথে নিয়েই বসতাম। পরক্ষণেই মনে প্রশ্ন জাগল—‘তাহলে কি ইউরোপিয়ানরা তাদের বাচ্চাদের কম ভালবাসে?’

সে উত্তর আজও পাইনি। মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ভালোবাসা মূলত তিনটি উপাদানের সমন্বয়— আবেগ, আসক্তি এবং প্রতিশ্রুতি। স্টার্নবার্গের Triangular Theory of Love অনুযায়ী এ তিনটির ভিন্ন ভিন্ন অনুপাত থেকেই ভালোবাসার ধরন তৈরি হয়। মানুষের basic instinct এর কারণে কেউ তার অনুভূতি বেশি (extrovert) আর কেউ কম (Introvert) প্রকাশ করে। এ দুদল মানুষের ভালোবাসার প্রকাশভঙ্গি ভিন্ন। প্রশ্ন আসতে পারে যারা বেশি প্রকাশ করে তারা কি বেশি ভালবাসে?

যৌক্তিকভাবে এমন নয়। কিন্তু ভালোবাসার প্রকাশভঙ্গি ভিন্ন হওয়ার কারণে মূল্যায়ন করতে গিয়ে মানুষ ভুল করতে পারে। Introvert মানুষ আপনার মনঃক্ষুণ্ণের কারণ হতে পারেন! ভালোবাসা প্রকাশ না করতে পারায় তাদের বিপক্ষে আপনার অনেক অভিযোগ থাকতে পারে। শেক্সপিয়ার বলেছিলেন, ‘ভালোবাসলে কিংবা না বাসলে ঠকে যেতে হতে পারে। দুটো জিনিস খুবই কষ্টদায়ক। একটি হচ্ছে, যখন তোমার ভালোবাসার মানুষ তোমাকে ভালোবাসে কিন্তু তা তোমাকে বলে না। অর্থাৎ যারা Introvert। আর অপরটি হচ্ছে, যখন তোমার ভালোবাসার মানুষ তোমাকে ভালোবাসে না এবং সেটা তোমাকে সরাসরি বলে দেয়।’

মনোবিজ্ঞানে ভালোবাসা কোনো এককালীন অনুভূতি নয়; এটি একটি গতিশীল প্রক্রিয়া। Bowlby (1969) এর Attachment Theory অনুযায়ী, মানুষের ভালোবাসার ধরন শৈশবের নিরাপত্তাবোধ ও সম্পর্কের অভিজ্ঞতা থেকে গড়ে ওঠে। নিরাপদ Attachment ভালোবাসাকে সহযোগিতা ও আস্থার দিকে নিয়ে যায়, আর Insecure Attachment ভালোবাসাকে উদ্বেগ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্ভরশীলতার দিকে ঠেলে দেয়। The Art of Loving এ Fromm (1956) বলেন, ভালোবাসা কোনো অনুভূতি নয়, এটি একটি skill; যার জন্য শৃঙ্খলা, দায়িত্ব, জ্ঞান ও পরিশ্রম দরকার। 

এ ধারণা জনপ্রিয় রোমান্টিক কল্পনার সম্পূর্ণ বিপরীত। দর্শনের ভাষায় ভালোবাসা প্রায়ই মানুষের অস্তিত্বগত সংকটের প্রতিক্রিয়া। প্লেটোর Symposium এ ভালোবাসা হলো অপূর্ণতা থেকে পূর্ণতার আকাঙ্ক্ষা। মানুষ ভালোবাসে, কারণ সে অসম্পূর্ণ; সে নিজের শূন্যতা অন্যের মাধ্যমে পূরণ করতে চায়। ভালোবাসা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হলেও, এটি গভীরভাবে সামাজিকভাবে নিয়ন্ত্রিত। Giddens (1992) দেখান, আধুনিক সমাজে Intimacy ব্যক্তিগত পছন্দের উপর দাঁড়ালেও, তার কাঠামো এখনও সামাজিক নিয়ম দ্বারা নির্ধারিত।

পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত এবং আলোচিত শব্দ ভালোবাসা। সাহিত্যে এটি মহিমান্বিত, ধর্মে এটি পবিত্র, দর্শনে এটি জিজ্ঞাস্য, আর দৈনন্দিন জীবনে এটি প্রায়ই বেদনাদায়ক। ভালোবাসা নিয়ে এ লেখাটি একান্ত নিজের অনুভূতিকে কেন্দ্র করে। দীর্ঘসময় ধরে ভালোবাসার অনুভূতি প্রকাশের স্বরূপ বিশ্লেষণ করে সম্পূর্ণ নিজের মতামতের ভিত্তিতে লেখা হয়েছে। পাঠকগণ সবাই আমার সাথে ভিন্নমত পোষণ করতে পারেন। মানুষের জীবনের কোনো এক পর্যায়ে ভালোবাসার এমন কেউ আসেন যিনি আপনার জীবনের দর্শন ও গতিপথ পরিবর্তন করে দিতে পারেন। বব মারলির ভাষায়, ‘Only once in your life, I truly believe, you find someone who can completely turn your world around.’

পৃথিবীজুড়ে মানুষের কষ্টের বিভিন্ন রকম বা মাত্রা রয়েছে। কষ্টের একটি তালিকা তৈরি করলে প্রথমে কী আসবে? অসুস্থতার কষ্ট, ক্ষুধার কষ্ট, প্রিয়জনকে হারানোর কষ্ট, পরীক্ষায় ফেল করার কষ্ট ইত্যাদি। আমার মনে হয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে কষ্টের অনুভূতি হলো ক্ষুধার্ত মানুষের কষ্ট। তবে যারা এ কষ্ট অনুভব করেননি তারা নিঃসন্দেহে দ্বিমত করতে পারেন। কষ্টের তালিকায় ভালোবাসার কষ্টের পরপরই ক্ষুধার কষ্ট স্থান করে নেবে। ব্যাখ্যা করি। দুর্ঘটনায় পতিত একজন মানুষের যে কষ্ট হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি কষ্ট হয় যখন প্রিয়জনের কাছ থেকে কেউ কষ্ট পায় কিংবা প্রিয়জন ছেড়ে চলে যায়। কারণ দুর্ঘটনাজনিত কারণে সে জানে যে তার কষ্ট একদিন শেষ হয়ে যাবে।

ভালোবাসাকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করব? চেষ্টা করে দেখা যাক। একটা Index তৈরি করতে হবে। ভালোবাসার সবচেয়ে বড় অংশ জুড়ে রয়েছে বিশ্বাস। জটিলভাবে বললে, হয়তো শতভাগই বিশ্বাস। আপনি যাকে ভালোবাসেন তাকে শতভাগ বিশ্বাস করবেন। বিশ্বাস না করলে ভালোবাসতে কষ্ট হবে; কার্যত পারবেন না। সামনে দেখে যেভাবে বিশ্বাস করবেন; যোজন-যোজন দূরে গেলেও সেভাবেই করবেন। বিশ্বাসের জায়গা ব্যাখ্যা করা বেশ কঠিন। প্রিয়জনকে আপত্তিকর বা অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো অবস্থায় দেখলেও আপনি বিশ্বাস করবেন। যদি বিশ্বাস করতে না পারেন তাহলে দুটি বিষয় বিবেচনায় নেওয়া যায়; এক তিনি আপনার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন; অথবা দুই আপনি তাকে আসলে বিশ্বাসই করেন না। কবিগুরু যদিও ক্ষমা করতে বলেছেন, ‘ক্ষমাই যদি করতে না পারো, তবে তাকে ভালোবাসো কেন?’ 
তবে একটি বিষয় না লিখলেই নয়। যাকে আপনি বিশ্বাস করেন না সেজন্য ঐ ব্যক্তিই দায়ী। আপনি বিশ্বাস না করার কারণে আপনি কোনোভাবেই দায়ী নন; কেননা ঐ ব্যক্তি নিজেকে বিশ্বাসযোগ্য অবস্থায় উন্নীত করতে পারেননি। তবে বিশ্বাস করতে না পারার কষ্ট অনেক ভয়ঙ্কর। 

ভালোবাসার স্বরূপ বড়ই বিচিত্র। পানি যেমন নিচের দিকে গড়ায় তেমনি ভালোবাসাও নিচের দিকে প্রবাহিত হয়। মানুষ তার ঔরসজাত সন্তানকে তার পিতা-মাতার চেয়ে বেশি ভালোবাসে; ব্যতিক্রম থাকতে পারে। বিষয়টি যৌক্তিকভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। পিতা-মাতার বয়স বিবেচনায় মানুষ তাদের চেয়ে কম বয়সীদের বেশি ভালোবাসেন। অথবা যেহেতু সন্তানরা তাদের উপর নির্ভরশীল; তাই তাদের দেখাশোনা করতে হয়, ভালোবাসতে হয়।

ভালোবাসার Index তৈরির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো অধিকার। যে যাকে ভালোবাসে তার উপর একটা অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এ অধিকার প্রতিষ্ঠায় দ্বিমত করলে দ্বন্দ্ব হতে পারে। এ দ্বন্দ্ব বা মতবিরোধ হওয়ার বিষয়টি অযাচিত নয়। আপনি কারও উপর অধিকার প্রয়োগ করলে তার স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হতে পারে। এখানে একটা trade-off রয়েছে। দুজন মানুষ ভালোবাসলে অধিকার ও স্বাধীনতার প্রশ্নে ভারসাম্য না-ও আসতে পারে। আমার অধিকার (কিংবা অতিরিক্ত অধিকার) প্রিয়জনের স্বাধীনতা খর্ব করতে পারে যদি সে বিষয়টি গ্রহণ না করে। ভারসাম্য না হলে শরৎচন্দ্রের ভাষায় বড় প্রেম শুধু কাছে না টেনে দূরেও ঠেলে দিতে পারে। 

ভালোবাসার Index এর আরেকটি উপাদান প্রিয়জনের ভালো লাগাকে সম্মান করা। তবে এখানেও মতবিরোধ হতে পারে। আপনি মাঝরাতে ঘুম ভাঙ্গলে বারান্দায় বসতে পছন্দ করেন। আপনার সঙ্গী ঘুম ভাঙলেও বিছানা ছেড়ে উঠতে চান না। এখানে একজনকে ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। প্রশ্ন হলো কে করবেন? সমাধান হিসেবে লিও টলস্টয় এর বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য: যখন তুমি কাউকে ভালোবাসো তখন তুমি পুরো মানুষটাকেই ভালোবাসো; ঠিক সে যেমন, তেমন ভাবে। ফলে যিনি অধিক ভালোবাসেন তিনি ত্যাগ স্বীকার করবেন। ভালোবাসা মানে কাউকে জয় করা নয় বরং নিজেই কারও জন্য হেরে যাওয়া। এখানে শিক্ষিত-মূর্খ, ধনী-গরিব কিংবা জাতের কোনো প্রসঙ্গ আসবে না। এটা জ্ঞানের গভীরতা দিয়েও হয় না; হয় হৃদয়ের পবিত্রতা ও ভাবনার একাত্মতা দিয়ে। কেউ আপনাকে পছন্দ করবে এ আশায় নিজেকে পরিবর্তন করা কাঙ্ক্ষিত নয়; আপনি যেমন আছেন তেমনই থাকার চেষ্টা করুন, যে আপনাকে সত্যিকার অর্থেই ভালোবাসবে সে সব কিছু সহ-ই ভালোবাসবে। আফ্রিকান প্রবাদেও যেভাবে বলা হয়েছে, ‘One who loves you, loves you with your dirt.’

ফের প্রশ্ন হতে পারে, কে অধিক ভালোবাসে? না কি দুজনের ভালোবাসা সমান হবে? সমান-সমান হওয়ার বিষয়টি সাধারণ বিবেচনায় অস্বাভাবিক হলেও অসম্ভব নয়। হাজারে ক’জন পাওয়া যাবে যে দুজন ভালোবাসাবাসিতে সমান সমান দাবি করতে পারেন? এরকম যুগল পাওয়া দুষ্কর! খুব ইচ্ছা করে এমন কোনো যুগলকে কাছে থেকে দেখতে; এদের প্রতি আমি ঈর্ষান্বিত! দুজনে সমান সমান ভালোবাসার একটি বৈশিষ্ট্য এমন হতে পারে যে আপনার প্রিয়জনের সাথে বিনিময় করা সকল অনুভূতি প্রায় একইরকম হবে। যেমন, তার হাত ধরলে, তার সাথে খেতে বসলে, তার সাথে ঘুরতে গেলে, এমনকি শয্যা সঙ্গী হিসেবে যে অনুভূতি; তা আপনাকে অন্যান্য সবকিছুর মতো সমানভাবে আন্দোলিত করবে। অধিক ভালোবেসেও আপনি হেরে যেতে পারেন। যদি আপনি তা প্রকাশে ব্যর্থ হন। আপনি অনেক ভালোবাসেন কিন্তু তা যদি আপনার প্রিয়জন ঠিক সেভাবে অনুভব করতে না পারে তবে এ ব্যর্থতা আপনারই। তবে অধিক ভালোবেসে ব্যর্থ না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

ভালোবাসা মানে শুধু ভালো থাকা নয়, খারাপ সময়ে পাশে থাকা। একজন মানুষের সাথে যখন আপনি জীবন কাটাতে শুরু করবেন তখন জীবনের ছোট ছোট অনুসর্গগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। যেমন, কেউ গোছল করে এসে ফ্যানের বাতাসে দাঁড়াতে পছন্দ করে কিংবা রাস্তায় হাঁটার সময় হাতে হাত ধরে হাঁটতে পছন্দ করে না। শান্তি ও স্বস্থিতে থাকার জন্য ছোট ছোট এসব উপাদানই মুখ্য। কারণ বছরে এক/দুইবার ঘটা করে জন্মদিন কিংবা বিবাহবার্ষিকী পালন আমরা সবাই করে থাকি। জীবন চলার পথে বড় উপাদানগুলো অনেকটা লোক দেখানো তাই এগুলো সমস্যা সৃষ্টি করে না। 

ভালোবাসার Index তৈরিতে মোট উপাদান ৩টি: বিশ্বাস, অধিকার ও ভালোলাগার সম্মান। এ আলোচনা পরিপূর্ণ নয়। যেমন, ভালোবাসতে গিয়ে কেউ তার প্রিয়জনকে সন্দেহও করতে পারে; যদিও কাঙ্ক্ষিত নয়। আবার এটাও হয়তো অধিক ভালোবাসার একটা বহিঃপ্রকাশ! ভালোবাসা নাকি মোহ – এটা নিয়েও বিতর্ক হতে পারে। অনেকে ভাবেন যে মোহ থেকেই সব আকর্ষণের সৃষ্টি। মোহ কেটে গেলে ভালোবাসা শেষ হয়ে যায়। অধিক ভালোবাসায় আচ্ছন্ন হয়ে কেউ কেউ আবার বলেন যে, তার মোহ কখনও কাটবে না। কারণ তিনি মনে করেন এটাই তার একমাত্র দুর্বলতা। পাঠককুলের কাছে আমার বিনীত নিবেদন আর কোন উপাদান এ আলোচনায় যুক্ত হতে পারে। 

বিষয় বিশ্লেষণে আরও অনেক কিছুই প্রাসঙ্গিক। ভালোবাসার স্বরূপ কি ভিন্ন ভিন্ন হয়? ধরা যাক, আপনার খুব পছন্দের পাঁচ জন মানুষ রয়েছেন। আপনি কি সবাইকে সমান ভালোবাসেন? আপনার মা, বাবা, স্ত্রী, ছেলে, মেয়েকে কি আপনি সমান ভালোবাসেন? সমস্যার বিষয় হচ্ছে, এরকম প্রশ্ন করলে আপনি বিব্রত হতে পারেন। আগে যেভাবে বলেছি, হয়তো বলবেন, সন্তানদের বেশি ভালোবাসেন; তারপর বাকিরা। জটিলভাবে উপস্থাপন করলে, কার্যত পৃথিবীর সকল ভালোবাসার অনুভূতি এক। প্রিয়জন খেলে নিজে না খেয়েও নিজের ক্ষুধা নিবারণ হবে। যদিও কতটুকু ক্ষুধা নিবারণ হবে তা অনুধাবন করা কষ্টকর। হয়তো শুধু মা-ই সন্তানকে খাইয়ে নিজের ক্ষুধা নিবৃত করতে পারেন। পৃথিবীজুড়ে মায়ের ভালোবাসাই সর্বশ্রেষ্ঠ আসন দখল করে আছে। 

আবারও একই প্রশ্ন দিয়ে শুরু করি– ভালোবাসা কী? ভালোবাসা হলো প্রিয়জনের অনুভূতিকে নিজের করে নেওয়া। প্রিয়জনের কেউ কষ্ট পেলে একইভাবে অনুভব করা। প্রিয়জন ক্ষুধার্ত থাকলে নিজেও সে কষ্ট অনুভব করা। প্রিয়জনের হাসিতে হাসা, দুঃখ পেলে আর অধিক দুঃখ পাওয়া। আর সে কারণেই প্রিয়জনের প্রতি মানুষের ভালোবাসার প্রকৃতি এক। আসলে মা-বাবার প্রতি, সহধর্মিণীর প্রতি, সন্তানদের প্রতি মানুষ যে ভালোবাসা লালন করে তা এক ও অভিন্ন। 

ভালোবাসলে সবসময়য়ই প্রিয় মানুষের সান্নিধ্য আপনি উপভোগ করবেন। প্রিয়জনের সাথে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত আপনার কাছে এক অসীম সুখের গল্প বলেই মনে হবে। মনে হবে প্রিয়জনের উপস্থিতিতে আপনার জীবন সম্পূর্ণ হয়েছে। তাকে চিরকাল পাশে রাখতে চাইবেন। অনেক ক্ষেত্রে তাকে আপনার নিজের মাঝে আটকে রাখতে চাইবেন। কবিতা, গল্প, গান, উপন্যাস, চলচ্চিত্রে এরকম করে বুকের/কলিজার মাঝে আটকে রাখার যে সংলাপ তা গভীর ভালোবাসারই বহিঃপ্রকাশ। বাস্তবে কেউ কাউকে কলিজার মধ্যে আটকে রাখতে পারে না কিন্তু অনুভূতিতে সম্ভব।

ভালোবাসা কি স্বার্থহীন হবে? এর দুরকম উত্তর হতে পারে। যাকে আমি ভালোবাসি সবসময়ই আমার মতো করে, আমার ভালোবাসার যে আকাঙ্ক্ষা সে মতো করে তাকে চাই। এ ক্ষেত্রে আমি অবশ্যই স্বার্থপর। স্বার্থপর ভালোবাসা প্রায় সকল ক্ষেত্রেই ভালোবাসার মানুষের স্বাধীনতা খর্ব করতে পারে। ফলে ভালোবাসা অনুভূতির চেয়ে বেশি আচরণগত বাধ্যবাধকতা হয়ে উঠে। দ্বিতীয়ত, আমার ভালোবাসা যদি নিঃস্বার্থ হয়; ভালোবাসার যদি কোনো দাবি না থাকে তাহলে স্বাধীনতা খর্ব হবে না। ভালোবাসা তখন স্বার্থহীন। এখানেও ভারসাম্য খোজা বেশ কষ্টকর। ভালোবাসা পরিপূর্ণ হতে হলে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে অনেকসময় ভারসাম্য সম্ভব। সফল বিবাহিত জীবন সম্পর্কে দার্শনিক Friedrich Nietzsche এর সাথে আমি পুরাপুরি একমত; ‘It is not a lack of love, but a lack of friendship that makes unhappy marriages.’ যদিও ভারসাম্য হওয়াটা জরুরি নয়। বরং যিনি অধিক ভালোবাসেন তিনি অধিক ত্যাগ স্বীকার করবেন। এটাই ভালোবাসার সৌন্দর্য। টমাস ফুলারের দর্শনে ‘ভালোবাসা পাওয়ার চাইতে ভালোবাসা দেওয়াতেই বেশি আনন্দ।’ 

প্রেম ও ভালোবাসাকে দুটি আলাদা ধারণা হিসেবে বিচার করা হয়। অনেকে এভাবে বলতে চান প্রেম হলো মোহ আর ভালোবাসা হলো মায়া। অনেকের কাছে আবার দুটি একই। প্রেম ও ভালোবাসাকে যদি একই আঙ্গিকে বিচার করি তবে প্রশ্ন আসতে পারে– এক জীবনে মানুষ কতগুলো প্রেম করবে? মানুষ তার বয়ঃসন্ধিকাল থেকে শুরু করে দীর্ঘ একটা সময় পর্যন্ত অনেকের প্রেমে পড়তে পারে। জীবনের প্রথম প্রেম রসায়নের প্রতিস্থাপন বিক্রিয়ার মতো হারিয়ে যায় এবং ২য় প্রেম টিকে যায়। এভাবে চলতে থাকে। তবে একজন পরিপূর্ণ মানুষের জীবনে এমন ঘটবে না। সত্যিকার ভালোলাগা, ভালোবাসা, প্রেম হয়তো একটিই, অথবা দুটি। আমার এ অনুভূতি হুমায়ূন আজাদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম প্রেম বলে কিছু নেই। মানুষ যখন প্রেমে পড়ে, তখন প্রতিটি প্রেমই প্রথম প্রেম। খুব তুচ্ছ কারণে যে কারও প্রতি ভালো লাগা তৈরি হতে পারে। তবে সেটি ভালোবাসা কি না তা সময়ই বলে দেবে। 

আমাদের সমাজে বিপরীত লিঙ্গের দুজনের পরস্পরের প্রতি যে আকর্ষণ তাকে ভালোবাসা বলে চালিয়ে দেওয়ার একটা প্রবণতা রয়েছে। এটিও সঠিক যে দুজনের এ আকর্ষণই ভালোবাসা, তবে তা শর্তসাপেক্ষ। শর্ত হচ্ছে তা শুধু এ দুজনের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকবে। এর সাথে যেন তৃতীয় কেউ যুক্ত হতে না পারে। 

ভালোবাসা প্রকাশের একটি শক্ত মাধ্যম হচ্ছে চোখ। গানের কলিতে যেভাবে এসেছে, চোখ যে মনের কথা বলে। আসলে চোখ মনের চেয়েও বেশি কথা বলে থাকে। চোখ দিয়ে অন্যকে আকর্ষণ করার যে পদ্ধতি তা মুখে বলার চেয়েও বেশি কার্যকর। এটি আমাদের সংস্কৃতির কারণে হয়েছে। নায়ক-নায়িকার ধাক্কা লেগে পড়ে যাওয়া, চোখাচোখি দিয়ে শুরু হওয়া; অতঃপর ভালোবাসা, প্রেম ইত্যাদি আমাদের এ উপমহাদেশে দেখা যায়। প্রাশ্চাত্য দেশগুলোতে এরকম কিছু ঘটবে না। বোধকরি, চোখের দৃষ্টি বিনিময়ে যে ভালোবাসা তৈরি হয় তা নাটক, সিনেমায় দেখা গেলেও তা দীর্ঘস্থায়ী নয়।

ভালোবাসার সঙ্গে দেশের সংস্কৃতি মুখ্য ভূমিকা পালন করে। ইংল্যান্ডে পড়ার সময় আমরা একদল শিক্ষার্থী ইউরোপের বিভিন্ন দেশে শিক্ষা সফরে গিয়েছিলাম। ফেরার পর ক্যাম্পাসে এক আফ্রিকান তরুণীর সঙ্গে দেখা। সে আমাকে যেভাবে জরিয়ে ধরে সফরের স্মৃতিচারণ করল তাতে আমি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করিনি। এটা হয়েছে আমার সংস্কৃতির কারণে। প্রশ্ন হিসেবে লিঙ্গ বৈষম্যের বিষয় চলে আসতে পারে। নারী ও পুরুষের ভালোবাসা কি একইরকম নাকি ভিন্ন হবে? আমার ধারণা ভালোবাসা একটি সর্বজনীন বিষয় তাই লিঙ্গভেদে আলাদা হওয়ার সুযোগ নাই। যদিও সমরেশ মজুমদার বলছেন ভিন্ন কথা। তিনি মনে করে, ছেলেরা ভালোবাসার অভিনয় করতে করতে যে কখন সত্যি সত্যি ভালোবেসে ফেলে তারা তা নিজেও জানে না। মেয়েরা সত্যিকার ভালোবাসতে বাসতে কখন যে অভিনয় শুরু করে তারা তা নিজেও জানে না।

প্রচলিত এক প্রবাদের সাথে নিজের ভিন্নমত পোষণ করি। প্রবাদে বলা হয়েছে, Nothing’s unfair in love and war (ইংরেজি Three Days Grace Song ব্যান্ডের Human এ্যালবাম এর গানের কলি)। সত্যিকার অর্থে, জীবনের কোনো পর্যায়েই unfair হওয়ার সুযোগ নাই। এখানেও অনেকে দ্বিমত করতে পারেন। কারণ ভালোবাসা কোনো নিয়ম- শৃঙ্খলা মানে না। তাই ভালোবাসাকে ঘিরে, ভালোবাসাকে নিয়ে মানুষ পাগলামি করতে পারে যা হিসাব-নিকাশের বাইরে। ভালোবাসা অনন্ত। ‘অনন্ত প্রেম’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘তোমারেই যেন ভালোবাসিয়াছি, শত রূপে শত বার, জনমে জনমে, যুগে যুগে অনিবার। চিরকাল ধরে মুগ্ধ হৃদয়, গাঁথিয়াছে গীতহার, কত রূপ ধরে পরেছ গলায়, নিয়েছ সে উপহার, জনমে জনমে, যুগে যুগে অনিবার।’ 

পরিশেষে, ভালোবাসা কোনো একরঙা অনুভূতি নয়; এটি একটি বহুস্তরবিশিষ্ট মানবিক অভিজ্ঞতা। এতে যেমন আবেগ আছে, তেমনি যুক্তি, যেমন আত্মত্যাগ আছে, তেমনি স্বার্থ, যেমন মুক্তি আছে, তেমনি ঝুঁকি। ভালোবাসাকে শুধু কবিতা দিয়ে বোঝা যায় না, আবার কেবল বিশ্লেষণ দিয়েও নয়। কিন্তু বিশ্লেষণ আমাদের একটি জিনিস শেখায়— ভালোবাসা আদর্শ নয়, অনুশীলন। পরিশেষে, লিও টলস্টয়ের একটি গল্পের শিরোনাম দিয়ে লেখাটি শেষ করি; ‘যেখানে ভালোবাসা আছে, ঈশ্বরও সেখানে আছেন।’ 

ঢাকা/তারা//

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ