অতিরিক্ত পিপাসা: কখন এটি স্বাভাবিক, আর কখন সতর্কবার্তা?
দেহঘড়ি ডেস্ক || রাইজিংবিডি.কম
ছবি: প্রতীকী
গরমে বাইরে কাজ করার পর, ব্যায়াম শেষে কিংবা ঝাল খাবার খাওয়ার পর পানি পিপাসা লাগা খুবই স্বাভাবিক। কারণ আমাদের শরীর তখন পানি চায়—এটাই শরীরের স্বাভাবিক সংকেত। কিন্তু যদি পিপাসা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, বারবার পানি পান করার পরও না কমে, কিংবা এর সঙ্গে ঝাপসা দৃষ্টি, ক্লান্তি বা অতিরিক্ত প্রস্রাবের মতো উপসর্গ দেখা দেয়—তাহলে সেটি শুধু সাধারণ পিপাসা নয়, বরং কোনো গুরুতর শারীরিক সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। তাই এই বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বোঝা এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
অতিরিক্ত পিপাসার সম্ভাব্য কারণ
অতিরিক্ত পিপাসা নানা কারণে হতে পারে। কিছু কারণ সাময়িক ও সাধারণ হলেও, কিছু কারণ গুরুতর রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত। দৈনন্দিন কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- অতিরিক্ত লবণযুক্ত বা ঝাল খাবার খাওয়া
- দীর্ঘ সময় ব্যায়াম বা কঠোর শারীরিক পরিশ্রম
- ডায়রিয়া বা বমি
- শরীর পুড়ে যাওয়া (বার্ন)
- অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ
- কিছু ওষুধ (যেমন ডাইইউরেটিক, লিথিয়াম, কিছু অ্যান্টিসাইকোটিক)
যেসব গুরুতর রোগের লক্ষণ হতে পারে
১. ডিহাইড্রেশন (পানিশূন্যতা): যখন শরীরে প্রয়োজনীয় পানি কমে যায়, তখন ডিহাইড্রেশন হয়। এটি মারাত্মক পর্যায়ে গেলে জীবনহানিও ঘটতে পারে, বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে।
২. ডায়াবেটিস মেলিটাস: রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে গেলে (হাইপারগ্লাইসেমিয়া) অতিরিক্ত তৃষ্ণা দেখা দেয়। এটি ডায়াবেটিসের অন্যতম প্রথম লক্ষণ।
৩. ডায়াবেটিস ইনসিপিডাস: এই অবস্থায় শরীর সঠিকভাবে পানি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, ফলে অতিরিক্ত প্রস্রাব ও তৃষ্ণা দেখা দেয়।
৪. ডিপসোজেনিক ডায়াবেটিস ইনসিপিডাস: এটি তৃষ্ণা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে হয়, ফলে ব্যক্তি অস্বাভাবিকভাবে বেশি পানি পান করে।
৫. হৃদযন্ত্র, লিভার বা কিডনির সমস্যা: এই অঙ্গগুলোর কার্যকারিতা কমে গেলে শরীরের তরল ভারসাম্য নষ্ট হয়, যা তৃষ্ণা বাড়িয়ে দেয়।
৬. সেপসিস: ব্যাকটেরিয়া বা অন্যান্য জীবাণুর সংক্রমণে সৃষ্ট মারাত্মক প্রদাহজনিত রোগ, যা জীবনহানিকর হতে পারে।
অতিরিক্ত তৃষ্ণার কারণ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসক প্রথমে রোগীর বিস্তারিত ইতিহাস নেন। যেমন—
- কতদিন ধরে এই সমস্যা হচ্ছে
- প্রস্রাবের পরিমাণ বেড়েছে কি না
- উপসর্গ হঠাৎ নাকি ধীরে শুরু হয়েছে
- ওজন কমেছে বা বেড়েছে কি না
- জ্বর, ঘাম বা অন্য কোনো সমস্যা আছে কি না
এরপর কিছু পরীক্ষা করা হতে পারে—
- রক্তে গ্লুকোজ পরীক্ষা
- রক্তের বিভিন্ন পরীক্ষা (ব্লাড কাউন্ট)
- ইউরিন পরীক্ষা
- ইলেক্ট্রোলাইট ও ওসমোলালিটি পরীক্ষা
শরীরের জন্য কতটুকু পানি প্রয়োজন: সুস্থ থাকতে সারাদিনে নিয়মিত পানি পান করা জরুরি। এছাড়া পানি-সমৃদ্ধ খাবার যেমন—তরমুজ, কমলা, টমেটো, শসা ইত্যাদি খেলে শরীরের পানির চাহিদা পূরণে সাহায্য করে।
আপনি পর্যাপ্ত পানি পান করছেন কিনা বোঝার সহজ উপায় হলো—
- প্রস্রাবের রং হালকা কিনা
- পরিমাণ স্বাভাবিক কিনা
- গন্ধ বেশি তীব্র নয় কিনা
পানি আমাদের শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের জন্য অপরিহার্য। শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে, জয়েন্টকে সুরক্ষা দেয়, মস্তিষ্ক ও স্পাইনাল কর্ড রক্ষা করে এবং ঘাম, প্রস্রাব ও মলত্যাগের মাধ্যমে বর্জ্য অপসারণ করে।
কখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন
অতিরিক্ত তৃষ্ণা সবসময় অবহেলা করা উচিত নয়। বিশেষ করে নিচের লক্ষণগুলো থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি—প্রচুর পানি পান করার পরও পিপাসা না কমা, ঝাপসা দৃষ্টি, অস্বাভাবিক ক্ষুধা, ক্ষত বা ঘা দেরিতে শুকানো, অতিরিক্ত ক্লান্তি এবং দিনে ২.৫ লিটারের বেশি প্রস্রাব হওয়া ।
পিপাসা আমাদের শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। সাধারণ কারণে পিপাসা লাগা স্বাভাবিক হলেও, এটি যদি অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে বা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে তা কোনো বড় সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। তাই নিজের শরীরের সংকেত বুঝে সচেতন থাকা এবং প্রয়োজনে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়াই সুস্থ থাকার সবচেয়ে ভালো উপায়।
সূত্র: হেলথ লাইন
ঢাকা/লিপি
নিখোঁজ পাইলটকে উদ্ধারে আসা মার্কিন বিমান ধ্বংসের দাবি ইরানের