ঢাকা, শুক্রবার, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

টার্গেট কেন হলি আর্টিজান?

মামুন খান : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১১-১৮ ১১:০৩:১৯ এএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১১-১৯ ২:৫৯:৪০ পিএম

২০১৬ সালের ১ জুলাই। রাজধানী ঢাকার অভিজাত এলাকা গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে ভয়ংকর ঘটনা ঘটে। জঙ্গিরা যেন রক্তের হলি খেলায় মেতে উঠেছিল সেদিন। তাদের হামলায় দুই পুলিশ সদস্য, ১৭ বিদেশি নাগরিকসহ নিহত হন ২২ জন। ঢাকার কূটনৈতিক এলাকায় এরকম একটি হামলা হবে তা কারও কল্পনাতেও ছিল না। সেদিনের ঘটনায় প্রথম দিকে তেমন প্রতিক্রিয়া হয়নি। সময় যত গড়াতে থাকে ততই প্রকাশ্যে আসে এর ভয়াবহতা। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। তৎপরতা বেড়ে যায় দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নিরাপত্তা বাহিনীর। দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমের মূল শিরোনামে পরিণত হয় হলি আর্টিজানের ঘটনা।

সে দিনের সেই ভয়ংকর হামলার চিত্র ফুটে ওঠে পুলিশের দেয়া চার্জশিটে। সেই চার্জশিটের আলোকে ঘটনার বিশদ রাইজিংবিডি পাঠকদের জন্য তুলে ধরছেন নিজস্ব প্রতিবেদক মামুন খান। ধারাবাহিক বর্ণনার আজ প্রথম পর্ব।

একসঙ্গে বেশিসংখ্যক বিদেশি নাগরিককে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল নব্য জেএমবির জঙ্গিরা। তারা এমন একটি জায়গা খুঁজছিল, যেখানে একই সময় একইসঙ্গে অনেক বিদেশি অবস্থান করেন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাও দুর্বল। হামলার দুইমাস আগে থেকেই রেকি করে এমন জায়গা খুঁজে পায় জঙ্গিরা। সেটি হলো গুলশানের কূটনৈতিক পাড়ার ‘হলি আর্টিজান বেকারি’। পরিকল্পনা অনুযায়ী, হামলার আগে তামিম চৌধুরীসহ শীর্ষ জঙ্গি নেতারা রেকি করে হলি আর্টিজান। সবকিছু দেখে শুনে ২০১৬ সালের ১ জুলাই হামলা চালায় তারা।

মামলার চার্জশিট থেকে জানা যায়, গুলশান-২ এর ৭৯ নম্বর সড়কের শেষ মাথায় গুলশান লেকের গা ঘেষে আনুমানিক ১৬ কাঠা জমির ওপর হলি আর্টিজান বেকারি। সামিরার স্বামী সাদাত ও তার এক বন্ধু মিলে ২০১৪ সালে এ বাড়িতে হলি আর্টিজান বেকারিটি গড়ে তুলেছিলেন।

১৯৭৯ সালে ‘আবাসিক ভবন কাম ক্লিনিক গড়ে তোলার জন্য’ ডা. সুরাইয়া জাবিনকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল বাড়িটি। ১৯৮২ সালে ওই প্লটের একপাশে গড়ে তোলা হয় লেকভিউ ক্লিনিক। সুরাইয়ার মৃত্যুর পর প্লটের মালিক হন তার দুই মেয়ে সামিরা ও সারা আহমেদ। তাদের দুটি প্লট এক করে উত্তর পাশের দোতলা ভবনে গড়ে তোলা হয় হলি আর্টিজান বেকারি, আর দক্ষিণপাশে ‘লেকভিউ ক্লিনিক’। ৭৯ নম্বর সড়কের শেষ মাথার বড় গেট খুলে সামনে এগোলেই প্রতিষ্ঠান দুটির গাড়ি পাকিং এরিয়া।

তদন্ত কর্মকর্তা চার্জশিটে বলেন,  হলি আর্টিসান বেকারি একটি দোতলা ভবন। এর নীচ তলায় একটি হল রুম, একটি কিচেন, একটি বেকারির শো-রুম, একটি কমন টয়লেট-কাম বাথরুম, একটি সার্ভেন্ট টয়লেট, একটি কুল রুম (চিলাররুম) এবং দ্বিতীয় তলায় একটি হল রুম ও তিনটি স্টোর রুম। এছাড়াও ছাদের ওপরে সিড়ির শেষ মাথায় দুটি ডিপ ফ্রিজ রাখার জায়গা ছিল। উপরন্তু হলি আর্টিজানের পেছন দিকে জেনারেটর রুম, ওভেন জেনারেটর রুম এবং গাড়ি পার্কিংয়ের কাছাকাছি একটি পিজা ঘর ছিল। গুলশান লেকপাড়ের গাঁ ঘেষে হলি আর্টিজান লনে টালিঘর (গিজাবো) অবস্থিত।   হলি আর্টিজান ও লেকভিউ ক্লিনিকের মেইন গেটের সন্নিকটে পাশাপাশি গার্ড রুম ও কফি ঘর। বিভিন্ন পর্যায়ে ৮৪ জন স্টাফ দায়িত্ব পালন করতেন ওই রেস্টুরেন্টে।

ঘটনার দিন প্রায় ৪৭ কর্মকর্তা/কর্মচারী কর্মরত ছিলেন। এদের মধ্যে ও কিচেন এর সেকেন্ড শেফ আর্জেন্টাইন নাগরিক দিয়াগো রজিন্নি এবং চিজ (খাবার) কনসালটেন্ট ইতালিয়ান নাগরিক গিয়ান গেলিজ্জা বসচিনি কাজে ব্যস্ত ছিলেন। গোলাগুলির আওয়াজ শোনা মাত্রই তারা পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। আর্জেন্টিনার নাগরিক গ্যাসটোন ফ্যালাসিয়ো ওই দিন ছুটিতে ছিলেন। গুলশান লেকপাড় ঘেষা এই রেস্টুরেন্টের সবুজ ঘাসের লনের মধ্যে লেক সাইডে সারিবদ্ধ গাছের মাঝখানে মাঝখানে সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য মৃৎপাত্র বসানো ছিল। এছাড়াও ছিল ফুলের গাছসহ বিভিন্ন ধরনের গাছ।

পিজা ঘরের সামনে দিয়ে পূর্ব-পশ্চিম লম্বালম্বি একটি কাটাতারের বেড়া দিয়ে ক্লিনিক থেকে ও বেকারিকে আলাদা করা হয়েছিল। এই বেড়া বা পার্টিশনের সাথেই গাড়ি পার্কিং এরিয়া। আর্টিজানের মেইন ভবনের সামনে দিয়ে ওয়াকওয়ে। সেখানেও অল্প সংখ্যক চেয়ার টেবিল রাখা ছিল। সবুজ ঘাস ও বাগান সদৃশ এই রেস্তোরাটি একেবারে কোলাহলমুক্ত। আগত অতিথিরা যেখানে খুশি সেখানে বসে খাবার খেতে পারতেন। বিদেশিসহ ঢাকার মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণি প্রায়ই খাবার খেতে, পার্টি করা উপলক্ষ্যে এসে ভিড় জমাতেন এই রেস্টুরেন্টে। ঘটনার দিনও দেশি-বিদেশি অতিথিরা এই আর্টিজানে এসেছিলেন প্রতিদিনের মত নির্বিঘেœ আনন্দময় সময় কাটাতে। তাদেও সে আনন্দ পরে নিরানন্দে পরিনত হয়।


ঢাকা/এনএ

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন