RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     শুক্রবার   ০৪ ডিসেম্বর ২০২০ ||  অগ্রাহায়ণ ২০ ১৪২৭ ||  ১৭ রবিউস সানি ১৪৪২

মুহুরী নদীতে ড্রেজার : বিপন্ন পরিযায়ী পাখিদের আশ্রয়স্থল

কেএমএ হাসনাত || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৫:৩৬, ১৩ জানুয়ারি ২০২০   আপডেট: ০৫:২২, ৩১ আগস্ট ২০২০
মুহুরী নদীতে ড্রেজার : বিপন্ন পরিযায়ী পাখিদের আশ্রয়স্থল

ফেনীর মুহুরী নদীর বুকে জেগে ওঠা চরে ড্রেজার বসিয়ে অবৈধভাবে কৃত্রিম বাঁধ তৈরি করছেন প্রভাবশালীরা। এতে একদিকে যেমন মুহুরী নদী হুমকির মুখে পড়ছে, অন্যদিকে এ এলাকায় আশ্রয় নেয়া পরিযায়ী ও স্থানীয় পাখিরা আশ্রয় হারাচ্ছে। যেন দেখার কেউ নেই।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালীরা মৎস্যচাষীদের কাছে ১০ কোটি টাকার বিনিময়ে এসব জায়গা বিক্রি করেছেন। তারাই এসব বাঁধ নির্মাণের জন্য ড্রেজার বসিয়েছেন।

জানা গেছে, গত ৯ জানুয়ারি প্রশাসনের উপস্থিতিতে কয়েকটি ড্রেজার সরিয়ে নিলেও এরপর দুই দিন না যেতেই তারা আবার ড্রেজার বসিয়ে নদী থেকে মাটি তুলে বাঁধ নির্মাণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

এ বিষয়ে রোববার সন্ধ্যায় সোনাগাজী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অজিত দেব বলেন, মুহুরী নদীতে ড্রেজার মেশিন দিয়ে মাটি ভরাট নিয়ে সমস্যা আছে। বিষয়টি সমাধানের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্রশাসন থেকে ড্রেজারগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। ড্রেজারগুলো আবার বসেছে, এমন তথ্য আমাদের কাছে ছিল না। খুব শিগগির অ্যাকশনে যাওয়া হবে। এরপর আপনাদের জানাব যে, আমরা কী করলাম। 

গত শনিবার বার্ড বাংলাদেশ, ন্যাশনাল ওয়াটার বার্ড সেন্সাস বাংলাদেশের (এনডব্লিউসিবি) একটি দল ফেনীর মুহুরী নদী এবং এর আশপাশের এলাকায় পরিযায়ী পাখি এবং স্থানীয় পাখির ওপর কাজ করতে গিয়ে মুহুরী নদীর বিবর্ণ অবস্থা দেখতে পায়। প্রায় শতাধিক ড্রেজারের বিকট শব্দ ও ভয়ে ওই এলাকায় আসা পরিযায়ী পাখি খাবার সংগ্রহ থেকে বিরত থেকে আশপাশের গ্রামের গাছে আশ্রয় নিয়েছে। সেখানেও তারা নিরাপত্তাহীন পাখিশিকারীদের পাতা ফাঁদের কারণে। এ অবস্থায় এলাকা ছাড়ছে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা নানা প্রজাতির পাখি।

এ বিষয়ে বার্ড বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ও এনডব্লিউসিবির সমন্বয়ক এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পাখি বিশেষজ্ঞ সাজাহান সর্দার রাইজিংবিডিকে বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। আমাদের দেশে প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক পরিযায়ী পাখি আশ্রয় নেয়। তারা কয়েক মাস এ দেশে অবস্থান করে আবার নিজ দেশে ফিরে যায়। এটা আমাদের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বিশেষ ভূমিকা রাখে।

তিনি বলেন, কয়েক বছর ধরে মুহুরী নদীকে ঘিরে বিভিন্ন প্রজাতির পাখির সমাগম বাড়ছিল। এবছরও নতুন নতুন পাখি আসা শুরু করেছিল। কিন্তু মুহুরী নদীর দখলদাররা সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে শতাধিক ড্রেজার বসিয়ে অবৈধভাবে বাঁধ নির্মাণ করছে। ড্রেজারের শব্দে পাখিদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। অনতিবিলম্বে এসব ড্রেজার প্রত্যাহার করা না হলে পুরো এলাকা পাখিশূন্য হয়ে পড়বে। আমরা কর্তৃপক্ষের আশু হস্তক্ষেপের দাবি জানাচ্ছি।

এ বিষয়ে বার্ড বাংলাদেশের মহাসচিব শামীম আলী চৌধুরী বলেন, আমরা গত ১১ জানুয়ারি পাখি গণনা এবং পাখির শ্রেণিবিন্যাস করতে মুহুরী নদীতে দিনব্যাপী পর্যবেক্ষণ করি। মুহুরী নদীর ওপর নির্মিত বাঁধ থেকে তিন কিলোমিটার যাওয়ার পরও কোনো পাখির দেখা পাইনি। কিছুদূর যাওয়ার পর থেকেই আমরা যান্ত্রিক শব্দ পাচ্ছিলাম। দেখা গেছে, নদীর বুকে জেগে ওঠা চরে মাটি ভরাট করে বাঁধ নির্মাণ করার জন্য একটু পর পর ড্রেজার চলছে।

তিনি বলেন, স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে আমরা জানতে পারি, প্রভাবশালীরা পার্শ্ববর্তী চট্টগ্রামের প্রভাবশালীদের কাছে কোটি কোটি টাকার বিনিময়ে নদী বিক্রি করে দিয়েছেন। তারা নদীতে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করবেন। আমরা জিজ্ঞেস করেছিলাম, স্থানীয় প্রশাসন বিষয়টি জানে কি না? এর জবাবে তারা বলেন, বিষয়টি প্রশাসন জানে কি না জানি না। তবে গত ৯ জানুয়ারি প্রশাসনের উপস্থিতিতে বেশকিছু ড্রেজার উঠিয়ে দেয়া হয়েছিল বলে শুনেছি। এর দুই দিন পর আগের মতোই ড্রেজার বসিয়ে নদী থেকে মাটি তুলে বাঁধ নির্মাণ করার কাজ পুরো দমে চালাচ্ছে। 

ফেসবুক স্ট্যাটাসে শামীম আলী চৌধুরী বলেছেন, আমাদের কিছুই করার ছিল না। কারণ, প্রতিপক্ষ এতই শক্তিশালী যে তাদের সাথে যুদ্ধ বা কাজে বাধা দেয়ার মতো শক্তি আমাদের নেই। কিন্তু সাহস ছিল। ছবিগুলো তাদের অগোচরে দূর থেকে তুলতে পেরেছিলাম। চোখের সামনে দেখলাম, কীভাবে একটা চলমান নদীতে কৃত্রিম চর তৈরি করে। কীভাবে সেখানে শীত মৌসুমে আসা পরিযায়ী পাখিগুলোকে অসহায় করে খাদ্য থেকে বঞ্চিত করছে। নদীটির এক পাড় চট্টগ্রাম জেলায়, অন্য পাড় ফেনী জেলায়। দুই পাড়ের প্রভাবশালী দুই জনপ্রতিনিধির সহায়তা অর্থলোভী ক্যাডার ও কর্মীরা কোটি কোটি টাকার বিনিময়ে নদীতে বালু ভরাট করে কৃত্রিম চর বানিয়ে মাছ ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করছে। আমরা জেনে অবাক হলাম, প্রশাসন নীরব। পরিবেশ রক্ষা করে পাখিদের বাঁচানো দরকার। এ অবস্থায় প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করছি। পরিবেশ না বাঁচলে আমরাও বাঁচব না।

রাইজিংবিডির ফেনী প্রতিনিধি সৌরভ পাটোয়ারী জানান, সোনাগাজীর মুহুরী সেচ প্রকল্পের রেগুলেটর থেকে সামান্য দূরে গড়ে উঠেছে অবৈধ বালুমহাল। এর ফলে হুমকির মুখে পড়েছে মুহুরী সেচ প্রকল্পের রেগুলেটর ও সোনাগাজী মুহুরী সেচ প্রকল্পে যাতায়াতের প্রধান সড়ক। এলাকাবাসীর অভিযোগ, ফেনী সদর উপজেলার ফাজিলপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রিপন সরকার দলীয় প্রভাব বিস্তার করে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছেন। এভাবে বালু উত্তোলনের ফলে বিলীন হয়ে যাচ্ছে সোনাগাজীতে নদী এলাকার ঘরবাড়ি ও জনপদ।

বালুঘাটের কর্মীরা জানান, ২০১৯ সালে এপ্রিলে বালু উত্তোলনের কাজ শুরু হয়। নদীতে ড্রেজার বসিয়ে প্রতিদিন ৫০ হাজার ঘনফুট বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। কোটি কোটি টাকা মূল্যের বালুর মজুদ রয়েছে মুহুরী সেচ প্রকল্পের পাশে।

প্রতিদিন গড়ে ৬০-৭০ ট্রাক বালু বিক্রি করা হচ্ছে এখান থেকে। আগে সোনাগাজীর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও নুসরাত হত্যা মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি রুহুল আমিনের তত্ত্ববধানে বালু উত্তোলন করা হতো। রুহুল আমিন জেলে বন্দি থাকায় তার বালুঘাট পাহারাদার দুজন সরে পড়েন। এরপর ফেনী সদর উপজেলার ফাজিলপুর ইউনিয়ন পরিষদের সরকার দলীয় চেয়ারম্যান প্রভাব বিস্তার করে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছেন।

বালুঘাটে দায়িত্বরত রানা রাইজিংবিডিকে জানান, ইউপি চেয়ারম্যান এ বালুঘাট ইজরা নিয়েছেন। তবে এর বিপরীতে তিনি কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেননি।

সরেজমিনের গিয়ে দেখা যায়, মুহুরী প্রকল্পের পাশে পাহাড় সমান বালুর স্তূপ। এর ফলে মুহুরী প্রকল্পে যাতায়াতের একমাত্র সড়কটিতে ভাঙন ধরেছে। হুমকির মুখে পড়েছে মুহুরী প্রজেক্ট রেগুলেটরটি। ফেনী নদীর সোনাগাজী ও ছাগলনাইয়া অংশে বিশাল এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। অনেকে ভিটেমাটি, সহায়-সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন। অনেক কৃষক হারিয়েছেন ফসলি জমি।

এ ব্যপারে ফাজিলপুর ইউপি চেয়ারম্যান রিপন বলেন, ‘আমার জায়গায় আমি বালু উত্তোলন করছি। এটি আমি লিজ নিয়েছি।’ তবে লিজের কোনো কাগজ দেখাতে পারেননি তিনি।


ঢাকা/হাসনাত/রফিক

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়