ঐতিহ্য এবং মৃত্যু যেখানে দুই সহোদর
পুরান ঢাকার শাঁখারী বাজার। সেখানে একটি জরাজীর্ণ ভবনের ব্যাপারে সিটি করপোরেশন থেকে বলা হয়েছে ‘এই ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ’। সেখানে বসবাস করা অনিরাপদ বিধায় সতর্কও করা হয়েছে। কিন্তু সেদিকে কোনো ভ্রূক্ষেপই নেই বসবাসকারীদের। মৃত্যুভয় জেনেও তারা দিনের পর দিন সেখানে দিব্যি বাস করছেন।
অন্যদিকে ভবনগুলো চাইলেই মেরামত করা বা ভাঙ্গা যাবে না, যেহেতু সেগুলো বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। এ যেন ঐতিহ্য এবং মৃত্যুর যুগলবন্দী। সেই ফাঁদেই যেন আটকা পড়ে আছেন শাঁখারী বাজারের অনেক বাসিন্দা। পুরান ঢাকার বিভিন্ন স্থানে এমন অনেক ঝুঁকিপূর্ণ ভবন রয়েছে। সেখানে বাস করছেন অনেকে, চলছে ব্যবসা-বাণিজ্য। প্রশাসনের সহযোগিতায় অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারাও এর ফায়দা লুটছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, পুরান ঢাকার সূত্রাপূর, ফরাশগঞ্জ, ওয়ারী, বাংলাবাজার, শাঁখারী বাজার, আহসান উল্লাহ রোড, তাঁতীবাজার, রায় সাহেব বাজার, কুলুটোলা, কাগজীটোলা, টিপু সুলতান রোড, নারিন্দা, নবাবগঞ্জ রোড, লালবাগ, চকবাজার, সাতরওজা, হাজারীবাগ, চকবাজার, বংশাল, কোতোয়ালি, শ্যামপুর, কামরাঙ্গীরচর কদমতলী এমনকি বাবুবাজার পুলিশফাঁড়ি এলাকায় জরাজীর্ণ ও পরিত্যক্ত ভবনগুলোয় মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে কয়েক লাখ মানুষ। তবে শাঁখারী বাজারে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন রয়েছে। এসব ভবনের বয়স ২০০ থেকে ২৫০ বছর।
শাঁখারী বাজারে দেখা গেছে, বেশ কয়েকটি বাড়ির দেয়াল ও ছাদে ফাটল। এর মধ্যেই গজিয়ে উঠেছে বৃক্ষলতা। এই এলাকা দিয়ে হাঁটলে চোখে পড়ে অনেক বাড়ির দেয়ালে চুন-সুরকির নতুন প্রলেপ। অর্থাৎ বাড়ির মালিক রং লাগিয়ে ‘মজবুত ভবন’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু এ ধরনের বাড়ির বাসিন্দারা অভিযোগ করে জানান, ঝড়ো বাতাসে ভবনগুলো কেঁপে ওঠে।
২০০৪ সালের ৯ জুলাই শাঁখারী বাজার এলাকায় একটি একতলা ভবন ধসে ১৯ জন নিহত হন। তখন বুয়েটের একটি প্রতিনিধি দল পুরান ঢাকা পরিদর্শন শেষে লালবাগ, শাঁখারী বাজার ও তাঁতীবাজার এলাকাকে বিপদাপন্ন ঘোষণা করে। তারা শতাধিক ভবন ভেঙে ফেলার পরামর্শ দেন। কিন্তু ১৮ বছর পরেও সেই পরামর্শ মোতাবেক কাজ হয়নি। ফলে যে কোনো সময় ঘটতে পারে অনাকাঙ্খিত দুর্ঘটানা।
রাজউক সূত্র জানায়, রাজধানীর পুরান ঢাকায় ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যা ৩২১টি। ৫ হাজার ভবন নির্মাণ বিধিমালার নিয়ম অমান্য করায় ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ১৪৫টিকে তাৎক্ষণিক ভেঙে ফেলার সুপারিশ করেছে তারা। এর মধ্যে ২১টি বাড়ি হাজারীবাগে, ৭৩টি লালবাগে ও ৯৩টি শাঁখারী বাজারে অবস্থিত।বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, শাঁখারী বাজারের ভবনগুলোসহ যে সব ভবন বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ ঘোষণা করা হয়েছে সেগুলো ভাঙ্গার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে যেসব ভবন মেরামতের জন্য নগর উন্নয়ন কমিটি থেকে অনুমতি দেওয়া হবে শুধু সেসব ভবন মেরামত করা যাবে। এদিকে অনেক বাসিন্দা অভিযোগ করেছেন বারবার নগর উন্নয়ন কমিটির অফিসে যোগাযোগ করলেও মেলে না ভবন মেরামতের অনুমতি।
কেন এমন ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে বাস করছেন জানতে চাইলে শাঁখারী বাজারের বাসিন্দা বিশ্বজিৎ দেব বলেন, আমাদের সাথে মালিকানা নিয়ে মামলা চলছে শাঁখারী বাজারের বেশ কিছু ভবন নিয়ে। ঢাকার জেলা প্রশাসক বিষয়টিকে একটু গুরুত্ব দিলেই বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়। আমরা ৪০ বছর থেকে এভাবে ঝুলে আছি। মামলা চালাতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছি। আসলে হিন্দু বলেই বিষয়টির সমাধান হচ্ছে না।
পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা আরেকজন প্রবীণ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ভাই এর আগে অনেক বড় বড় সাংবাদিক এসে ছবি তুলে নিয়ে গেছেন কিন্তু কোনো সমাধান হয়নি। আসলে এদেশে কোনো আইন নাই। আইন থাকলে এতো দিনে এটা সমাধান হয়ে যেতো।
স্থানীয় প্রবীণ শঙ্খ সুরের কণ্ঠে একই আক্ষেপ। তিনি বলেন, এসব আমাদের পূর্বপুরুষের ভিটা। এগুলো কীভাবে ঐতিহাসিক স্থাপনা হয় বুঝি না। সবাই বাসা-বাড়ি পুরাতন হলে ভেঙে নতুন করে নির্মাণ করতে পারে। কিন্তু আমরা এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাস করছি। উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকায় নির্মাণকাজ করতে পারছি না।
রাজধানীর ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ভাঙা নিয়ে আইনি জটিলতার পাশাপাশি রাজউক ও ডিএসসিসির মধ্যে দায়িত্ব নিয়ে দেখা দিয়েছে টানাপড়েন। রাজউক বলছে, পুরান ঢাকার ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ভাঙার দায়িত্ব ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের। অন্যদিকে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ বলছে, রাজউকই ঝুঁকিপূর্ণ ভবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেবে। ফলে কাজ এগুচ্ছে না। অন্যদিকে ঝুঁকিপূর্ণ বাড়িঘর ভেঙে ফেলার ব্যাপারে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের কড়া নির্দেশ এখনো ‘কাগুজে সিদ্ধান্ত’ হিসেবেই ফাইলবন্দী হয়ে আছে বলে জানা গেছে। সমন্বিত বৈঠকের অতি জরুরি নির্দেশ এক যুগেও আলোর মুখ দেখেনি।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নগর পরিকল্পনা বিভাগের প্রধান স্থপতি সিরাজুল ইসলাম বলেন, ইমারত নির্মাণ বিধিমালা-২০০৮ অনুযায়ী ভবন নির্মাণের অনুমোদন এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিতকরণ ও ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক)। তিনি আরো বলেন, শাঁখারী বাজারসহ যে চারটি অঞ্চলকে হেরিটেজ ঘোষণা করা হয়েছে এগুলো দেখার দায়িত্ব রাজউক ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের। এছাড়া সিটি কপোরেশনের যে ৯টি ভবন ঝুঁকিপূর্ণ আছে সেগুলোতে আমরা ভাঙ্গার কাজ শুরু করে দিয়েছি।
রাজউকের ডেভেলপমেন্ট কন্ট্রোল সদস্য মো. শফিউল হক বলেন, আমরা যেসব ভবন ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছি সেসব ভবনের জন্য এ বছরের শুরুতে একটি কমিটি গঠন করে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এরপর এ কমিটি সিদ্ধান্ত নেবে। হেরিটেজ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ২০০৯ সালে একটি গেজেটের মাধ্যমে ঢাকার ৯৩টি ভবন ও চারটি অঞ্চলকে ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এখন যদি এসব ভবনে কোনো সংস্কার করতে হয় তবে নগর উন্নয়ন কমটির কাছ থেকে অনুমতি নিয়েই কাজ করতে হবে।
রাজউকের চেয়ারম্যান এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী বলেন, পুরান ঢাকা বদলে ফেলা হচ্ছে। আধুনিক শহরে পরিণত হবে পুরান ঢাকা। এখানকার ঘিঞ্জি এলাকাকে বদলাতে আরবান রি-ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট নামে একটি কাজ হাতে নিয়েছে রাজউক। পরিকল্পিত একাধিক বহুতল ভবন নির্মাণ করে সেখানকার বাসিন্দাদের ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দেওয়া হবে। নকশা প্রস্তুত করা হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে পুরান ঢাকার বংশাল এলাকাকে এ জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
/তারা/