মুখে হাসি, বুক ভরা আত্মবিশ্বাস নিয়ে রিশাদের ফেরা
গত ৮ ডিসেম্বর রিশাদ যখন অস্ট্রেলিয়ার বিমান ধরছিলেন তখনই তিনি বুঝতে পারছিলেন, জীবনে কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে, ‘হয় বড় কিছু হবে। নয় তো কিছুই হবে না।’ এক পাশে রিকি পন্টিং ও আরেক পাশে স্টিভেন স্মিথকে নিয়ে তার অস্ট্রেলিয়া সফরের শেষটা হলো এভাবে, ‘‘মৌসুম শেষ হলো। যে সফরে ছিল স্মৃতিতে সমৃদ্ধ।’’
প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়ার ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে খেলতে যাওয়ার রোমাঞ্চ ছিল তার চোখে মুখে। জানতেন, প্রবল চ্যালেঞ্জিং সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বিশ ব্যাশ লিগ ও বিপিএল প্রায় একই সময়ে মাঠে গড়ায়। রিশাদ ঘরের একমাত্র ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট টুর্নামেন্টে না খেলে বিগ ব্যাশকে বেছে নেন।
তখন থেকেই স্বপ্নের আঁকিবুঁকি দিচ্ছিল তার মনের ক্যানভাসে। কত রঙ সেখানে। এটা হবে, ওটা হবে। ৩৯ দিন পর রিশাদ ফিরলেন দেশে। লেগ স্পিনারের ওই ক্যানভাস এখন পুরো রঙিন। হোবার্ট হ্যারিকেন্সের জার্সিতে অস্ট্রেলিয়ার টুর্নামেন্টে যে রং তিনি ছড়িয়েছেন তা এখন বর্ণিল। কবজির জাদুতে রিশাদ জয় করে নিয়েছেন পুরো অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটপ্রেমীদের মন।
এবারই প্রথম বিগ ব্যাশে খেলেছেন রিশাদ। হোবার্ট গতবারও তাকে পেতে চেয়েছিল। কিন্তু বিসিবি থেকে ছাড় পাননি। জাতীয় দলের হয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজ খেলায় ব্যস্ত ছিলেন। এবার বিসিবি তাকে বিশ ব্যাশে খেলার অনুমতি দেয় পুরো মৌসুমের জন্য। ১১ ইনিংসে ১৫ উইকেট নিয়ে রিশাদ আসরের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারিদের তালিকায় যৌথভাবে সপ্তম। বিদেশি স্পিনারদের মধ্যে সবার শীর্ষে রিশাদের অবস্থান।
রিশাদ ট্রফি পাননি কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনে একজন বাংলাদেশি লেগ স্পিনার যে নৈপুণ্য দেখিয়েছেন তা দেশের ক্রিকেটের জন্য বিরাট খবর। কিংবদন্তিরা তাকে প্রশংসায় ভাসিয়েছেন। হোবার্টের অধিনায়ক রিশাদের প্রশংসা করে বলেছিলেন, ‘‘আমাদের স্পিনারদের কৃতিত্ব দিতেই হবে। তারা (রিশাদ ও ইংল্যান্ডের রেহান আহমেদ) দুজনই এ বছর আমাদের জন্য অসাধারণ খেলছে। তারা দুজনই বিশ্বমানের। টুর্নামেন্টের শেষদিকে আমরা রেহানকে না পেলেও রিশাদকে পুরো সময়ের জন্য পাচ্ছি, যা আমাদের জন্য দারুণ খবর।’’
দেশ ছাড়ার আগে রিশাদ রিকি পন্টিংয়ের সঙ্গে কাজ করার কথা বলেছিলেন। রিশাদের দল হোবার্টের হেড অব স্ট্র্যাটেজি হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন পন্টিং। কিংবদন্তি পন্টিংয়ের সঙ্গে কাজ করে, তার সান্নিধ্য পেয়ে আপ্লুত রিশাদ, ‘‘ছোটবেলায় পন্টিং আমার প্রিয় খেলোয়াড়দের একজন ছিলেন। আমি তার খেলা দেখতাম। আমাদের দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। আমার বোলিংয়ের প্রশংসা করেছে। এটা আমার জন্য দারুণ কিছু।’’
শুধু তাই নয়, রিশাদের সঙ্গে দেখা হয়েছে বাংলাদেশের সাবেক কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহেরও। যিনি বাংলাদেশের লেগ স্পিনারদের নিয়ে বরাবরই বড় স্বপ্ন দেখতেন।
রিশাদের পথ চলা এবার বেশ মসৃণ ছিল বলা যাবে না। শুরুর ম্যাচে উইকেটশূন্য। পরের ম্যাচে ২ উইকেট। এরপর ১ উইকেট। পরের দুই ম্যাচে ৫ উইকেটের পর দুই ম্যাচ একেবারে নিষ্প্রভ ছিলেন। এরপর অবশ্য তাকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। নিয়মিত উইকেট পেয়েছেন। রান আটকে রেখেছেন। প্রতিপক্ষের জন্য হয়েছেন হুমকি। পাওয়ার প্লে’ কিংবা ডেথ ওভার অধিনায়ক যখন যেখানে কাজে লাগিয়েছেন সেখানেই নিজের শতভাগ নিবেদন দিয়ে খেলেছেন।
শেষ ম্যাচে স্টিভেন স্মিথকে বোল্ড করেছেন। নিশ্চিতভাবেই স্মিথের উইকেটই তার কাছে সবচেয়ে বড়। এছাড়া গুগলি, লেগ ব্রেক, ফ্লিপার বেশ ভালোভাবে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করেছেন রিশাদ।
সাকিব আল হাসানের পর প্রথম বাংলাদেশি ক্রিকেটার হিসেবে বিগ ব্যাশে খেললেন রিশাদ। ২০১৪ সালে অ্যাডিলেইড স্ট্রাইকার্সের হয়ে দুটি ও ২০১৫ সালে মেলবোর্ন রেনেগেডসের হয়ে চারটি ম্যাচ খেলেন সাকিব। প্রথমবার তিনি সুযোগ পান ইয়োহান বোথার বদলি হিসেবে আর পরের বার খেলেন আন্দ্রে রাসেলের বদলি হয়ে। ড্রাফট থেকে সরাসরি সুযোগ পাওয়া রিশাদই প্রথম। প্রথম সুযোগেই বাজিমাত করেছেন। সামনে আরো সুযোগ আসবে। সেগুলো রিশাদ দেদীপ্যমান হবেন এমনটাই প্রত্যাশা করা যায়।
ঢাকা/ইয়াসিন/আমিনুল