এবারের বিশ্বকাপে যা কিছু ব্যতিক্রম ও ‘আলোচিত প্রথম’
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দশম আসর শুরু হতে যাচ্ছে এমন এক বাস্তবতায়, যেখানে মাঠের ক্রিকেটের চেয়ে আলোচনায় বেশি রাজনীতি, নিরাপত্তা, বয়কট ও কাঠামোগত প্রশ্ন। ২০০৭ সালে যাত্রা শুরু করা এই টুর্নামেন্ট এত বছর পর এসে দাঁড়িয়েছে এমন এক সন্ধিক্ষণে, যেখানে “প্রথমবার” শব্দটি কেবল রেকর্ড বইয়ের জন্য নয়, ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ ছাড়া বিশ্বকাপ: ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ব্যতিক্রম
এই আসরের সবচেয়ে বড় অস্বাভাবিকতা বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের অনুপস্থিতি। ২০০৭ থেকে শুরু করে প্রতিটি টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া দলটি এবার নেই। নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে ভারতে খেলতে অস্বীকৃতি জানানোর পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল যে সিদ্ধান্ত নেয়, তা ক্রিকেট ইতিহাসে নজিরবিহীন।
এর মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো কোনো পূর্ণ সদস্য দেশ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত কারণে পুরো বিশ্বকাপ থেকেই বাদ পড়ল এবং তাও আয়োজক দেশের মাটিতে খেলতে না চাওয়ার কারণে।
হাইব্রিড বিশ্বকাপ: ক্রিকেটে নতুন কিন্তু বিতর্কিত মডেল
যৌথ আয়োজনে বিশ্বকাপ নতুন নয়। তবে দুই দেশের দ্বন্দ্ব সামলাতে তৈরি করা ‘হাইব্রিড মডেল’ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে এই প্রথম। ভারত-পাকিস্তান রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে পাকিস্তানের ম্যাচগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়েছে শ্রীলঙ্কায়। ফলে এক টুর্নামেন্ট, এক সূচি; কিন্তু দুই ভৌগোলিক বাস্তবতা।
এই মডেল ক্রিকেট প্রশাসনে নতুন প্রশ্ন তুলেছে ভবিষ্যতে কি রাজনৈতিক চাপেই শুধুমাত্র ভেন্যু বদলে যাবে? নাকি পুরো টুর্নামেন্টের কাঠামোই বদলে যাবে?
স্কটল্যান্ডের প্রবেশ: যোগ্যতা নয়, বাস্তবতা?
এই বিশ্বকাপে আরেকটি “প্রথম” স্কটল্যান্ড ক্রিকেট দলের অংশগ্রহণ। কিন্তু এটি কোনো বাছাইপর্ব জয়ের গল্প নয়। বরং বাংলাদেশের জায়গা শূন্য হওয়ায়, র্যাঙ্কিং ও প্রস্তুতির যুক্তিতে স্কটল্যান্ডকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
ক্রিকেট ইতিহাসে এই প্রথম কোনো দল বাছাইপর্বে ব্যর্থ হয়েও বিশ্বকাপ খেলছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে বিশ্বকাপ কি এখন যোগ্যতার মঞ্চ, নাকি প্রশাসনিক সমাধানের টুর্নামেন্ট?
পাকিস্তানের অবস্থান: ক্রিকেটে সরাসরি রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ
বাংলাদেশ-ভারত ইস্যুতে সবচেয়ে সরব সমর্থন আসে পাকিস্তান ক্রিকেট দলের পক্ষ থেকে। এখানেই ঘটে আরেকটি নজিরবিহীন ঘটনা। পাকিস্তান সরকার ঘোষণা দেয়, প্রয়োজনে তারা ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বয়কট করবে। এটি কেবল ক্রিকেটীয় সিদ্ধান্ত নয়; এটি আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে রাষ্ট্রীয় অবস্থানের সরাসরি হস্তক্ষেপ। ফলে আলোচনায় আসে আইসিসির ক্ষমতা, ভারতের প্রভাব এবং ক্রিকেটের তথাকথিত নিরপেক্ষতা।
যদি টুর্নামেন্টের ভাগ্যে পাকিস্তান-ভারত ফাইনাল আসে তবে কী হবে? আইসিসি ও আয়োজকেরা এ বিষয়ে এখনো পরিষ্কার কোনো অবস্থান জানায়নি।
ইতালি ও নতুন বিশ্বমানচিত্র:
এই আসরের সবচেয়ে ইতিবাচক “প্রথম” ইতালি ক্রিকেট দলের বিশ্বকাপ অভিষেক। ফুটবল ও হকির পর এবার ক্রিকেট বিশ্বকাপেও নাম লেখাল ইতালি। এটি ক্রিকেটের বৈশ্বিক বিস্তারের একটি বাস্তব উদাহরণ।
বিশেষ করে আলোচনায় আছেন ওয়েইন মেডসন। ৪২ বছর বয়সী এই ক্রীড়াবিদ ইতোমধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে হকি বিশ্বকাপ খেলেছেন। আর এবার ক্রিকেট বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছেন। দুই ভিন্ন খেলায় বিশ্বকাপ খেলার এই কীর্তি আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে বিরল।
২০ দলের বিশ্বকাপ: বড় হলেও কি সত্যিই বৈশ্বিক?
এই প্রথম টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলছে ২০টি দল। এখন পর্যন্ত মোট ২৪টি দেশ টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছে। সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে- ক্রিকেট কি সত্যিই বৈশ্বিক হচ্ছে, নাকি কেবল বিস্তার ঘটছে নির্দিষ্ট অঞ্চলে? বিশ্বকাপ বড় হচ্ছে, কিন্তু সমানভাবে গ্রহণযোগ্য হচ্ছে কি না তা নিয়েই এবার সবচেয়ে বেশি বিতর্ক।
টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দশম আসর হয়তো রান-উইকেটের চেয়েও বেশি পরিচিত হবে সিদ্ধান্ত, অবস্থান আর বিতর্কের জন্য। বাংলাদেশের অনুপস্থিতি, হাইব্রিড আয়োজন, রাষ্ট্রীয় বয়কটের হুমকি, যোগ্যতা বহির্ভূত অংশগ্রহণ; সব মিলিয়ে এটি কেবল একটি টুর্নামেন্ট নয়, বরং আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলোর একটি।
এই বিশ্বকাপ শেষে প্রশ্ন একটাই থাকবে- ক্রিকেট কি খেলাই থাকবে, নাকি ক্রমেই রাজনীতির প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠবে?
ঢাকা/আমিনুল