শেরপুরের তিনটি আসনেই মনোনয়ন লাভের প্রতিযোগিতা
শামটি || রাইজিংবিডি.কম
শেরপুরের তিন আসনের সম্ভাব্য প্রার্থীরা
শাকিল আহমেদ
শেরপুর, ২৩ নভেম্বর: শেরপুরের তিন আসনের সবগুলোতে সম্ভাব্য প্রার্থীরা ব্যস্ত এখন গণসংযোগে। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিন আসনেই বিএনপির জোটের প্রার্থীদের পরাজিত করেন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। আসন্ন নির্বাচনে দুই বড় দলেই সম্ভাব্য প্রার্থীরা মনোনয়ন লাভে রীতিমত প্রতিযোগিতায় নেমেছেন।
শেরপুর-১ (সদর) : কেন্দ্রীয় জামায়াত নেতা কামারুজ্জামানকে পরাজিত করে মহাজোটের প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আতিউর রহমান আতিক গতবার জয়লাভ করেন। এর আগে ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনেও তিনি বিজয়ী হন।
মানবতাবিরোধী অপরাধে কামারুজ্জামানের ফাঁসির আদেশ হওয়ায় এখন আওয়ামী লীগ অনেকটাই ভারমুক্ত এবং এখন পর্যন্ত আতিকই একক প্রার্থী। তবে তাঁর বিরোধী একটি গ্রুপ এবার নতুন মুখের পক্ষে।
গুঞ্জন রয়েছে, তারা জেপির প্রেসিডিয়াম সদস্য সাবেক এমপি শাহ রফিকুল বারী চৌধুরী অথবা জাকের পার্টির চেয়ারম্যান পীরজাদা মোস্তফা আমীর ফয়সলকে মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে আসনটিতে পেতে চাইছে।
এদিকে জাতীয় পার্টি (এরশাদ) জেলা শাখার সভাপতি ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান ইলিয়াস উদ্দিনের সঙ্গে সংসদ সদস্য আতিকের গত নির্বাচনের সময় থেকেই দ্বন্দ্ব চলে আসছে।
জাপা এককভাবে নির্বাচনে গেলে তিনি আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য আতিকের বিরুদ্ধে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন। জাপা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এ আসনে দলীয় প্রার্থী হিসেবে ইলিয়াস উদ্দিনের নাম ঘোষণা করেছেন এবং ইলিয়াস ইতিমধ্যে জনসংযোগেও নেমে গেছেন।
গণসংযোগে না থাকলেও এ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে দলীয় মনোনয়ন চাইবেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পিপি অ্যাডভোকেট চন্দন কুমার পাল, সাবেক এমপি মরহুম নিজামউদ্দিন আহম্মদের ছেলে পৌরসভার সাবেক মেয়র ও চেম্বার সভাপতি গোলাম মোহাম্মদ কিবরিয়া লিটন, জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও জেলা বাস-কোচ মালিক সমিতির সভাপতি সানোয়ার হোসেন ছানু, সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ভাতশালা ইউপি চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম, জেলা আওয়ামী মহিলা লীগের সভাপতি বেগম শামসুন্নাহার কামাল এবং যুব মহিলালীগের যুগ্ম-আহ্বায়ক ফাতেমাতুজ্জোহুরা।
মহাজোটের আরেক শরিক জাসদের জেলা সভাপতি সাংবাদিক মনিরুল ইসলমি লিটন এ আসনে দলীয় মনোনয়ন চাইবেন বলে দলীয় নেতা-কর্মীরা জানিয়েছেন।
অপরদিকে কেন্দ্রীয় প্রজন্ম-৭১ এর সভাপতি ও শহীদ পরিবারের সদস্য, তরুন শিল্পপতি মো. আব্দুল আজিজ এবার আদাজল খেয়ে নেমেছেন আওয়ামীলীগ থেকে এ আসনে মনোনয়ন পেতে। স্থানীয়ভাবে দলে তার কোন অবস্থান না থাকলেও হাইকমান্ডে এবং আওয়ামীলীগের শীর্ষ পর্যায়ে তার বেশ প্রভাব রয়েছে। ইতিমধ্যে তিনি ঢাকায় আওয়ামীলীগের দলীয় কার্যালয়ের সামনে ব্যাপক শো-ডাউন করে মনোনয়নপত্র কিনে জমা দিয়েছেন। এছাড়া ঢাকায় তিনি দীর্ঘ দিন থেকে গণসংযোগ ও মুক্তিযুদ্ধের সপেক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচী চালিয়ে আসছেন।
শেরপুরে একসময় বিএনপির শক্ত অবস্থান থাকলেও বর্তমানে কোন্দলে দুর্বল হয়ে পড়েছে। তবে ভোটের মাঠে এখনও ধানের শীষের প্রচুর ভোট রয়েছে। কয়েক মাস আগে জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট এ কে এম সাইফুল ইসলাম কালাম মারা যাওয়ার পর বিএনপি ভারপ্রাপ্ত জেলা সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক আশীষ ও জেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হক রুবেল গ্রুপ এবং সহ-সভাপতি সাইফুল ইসলাম স্বপন ও কালামের ছেলে পলাশ নেতৃত্বাধিন স্বপন গ্রুপ নামে দু’টি গ্রুপে ভাগ হয়েছে। এই দুই গ্রুপে ইতিমধ্যে বহিস্কার ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে।
স্বপন গ্রুপ জেলা বিএনপি’র সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট তৌহিদুর রহমানকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে। এ ব্যাপারে আব্দুর রাজ্জাক আশীষ জানিয়েছেন, ‘বিএনপিতে সম্প্রতি যোগদানকারী বিশিষ্ট শিল্পপতি হযরত আলীকে দলের সদস্য পদ দেওয়া হয়েছে। আমিসহ দলের অনেকেই আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন চাইবেন। দল যাঁকে মনোনয়ন দেবে, তাঁর পক্ষেই সবাই কাজ করবে।’
তবে সবার মধ্যে হযরত আলী প্রচারণা ও গণসংযোগেও এগিয়ে আছেন বলে দলীয় একাধিক সূত্র জানান। এ আসনে এবার কামারুজ্জামান প্রার্থী হতে পারবেন না বিধায় বিএনপিতে নবাগত হযরত আলীকেই সম্ভাব্য জোরালো প্রার্থী ভাবা হচ্ছে।
দলের অন্য সম্ভাব্য প্রার্থী আলহাজ অ্যাডভোকেট তৌহিদুর রহমান সাবেক জাপা নেতা এবং তিনি জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক। তিনিও দীর্ঘ দিন থেকে চরাঞ্চলে গণসংযোগ করে আসছে।
এছাড়া জেলা বিএনপি’র প্রয়াত সাবেক সভাপতি সাইফুল ইসলামের কালামের ছেলে মামুনুর রশিদ পলাশ সম্প্রতি ঢাকায় বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার সাথে দেখা করে এসে পোষ্টার ছড়িয়েছেন দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশি হিসেবে।
এদিকে বিএনপির মনোনয়ন পেতে গণসংযোগে নেমে পড়েছেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ। তিনি সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সুপ্রিম কোর্টের সাবেক অ্যাসিস্ট্যান্ট এটর্নি জেনারেল। শহরের বিভিন্ন দেয়ালে দেয়ালে তার পোষ্টার দেয়া হয়েছে। এদিকে মনোনয়ন পেতে কেন্দ্রীয় জামায়াত নেতা কামারুজ্জামানের ছেলে ইকবাল হাসান জামানের নামও কমবেশি আলোচনায় চলে আসছে।
শেরপুর-২ (নকলা-নালিতাবাড়ী) : আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী বর্তমান এমপি। ১৯৯৬ নির্বাচনেও মতিয়া এ আসন থেকে নির্বাচিত হন। তবে ২০০১ সালে অল্প ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছিলেন।
মতিয়া চৌধুরী নালিতাবাড়ী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোকছেদুর রহমান লেবুর প্রতি একক নির্ভরশীলতা ও আস্থা রাখায় এবারও বেঁকে বসেছেন উপজেলা চেয়ারম্যান বদিউজ্জামান বাদশাসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের একাংশ।
কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় নেতা কৃষিবিদ বাদশা ইতিমধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে দল থেকে মনোনয়নপত্র না কিনে এলাকায় ব্যাপক শো-ডাউন ও গণসংযোগ শুরু করেছেন। এ ব্যপারে উপজেলা চেয়ারম্যান বদিউজ্জামান বাদশা বলেন, দল নয় তৃণমূলের সমর্থনই তাঁর বড় শক্তি।
দলীয় হাইকমান্ডের নীতি নির্ধারক পর্যায়ের নেত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরীর বিকল্প কোন প্রার্থীর এ আসন থেকে মনোনয়ন পওয়ার সম্ভাবনা নেই। মতিয়া মনোনয়ন পেলে এবং বাদশা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে থাকলে বাদশা মতিয়ার গলার কাঁটা হয়ে ফুঁটতে পারেন।
বিএনপি নেতা সাবেক হুইপ আলহাজ জাহেদ আলী চৌধুরী মৃত্যুবরণ করায় প্রার্থী হতে তৎপর হয়েছেন তাঁর ছেলে ফাহিম চৌধুরী। অন্যদিকে সাবেক সচিব ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ব্যারিস্টার এম হায়দার আলী এ আসন থেকে মনোনয়ন পেতে বেশ আগে থেকেই তৎপর। যোগ্যতার দিক দিয়ে ব্যারিস্টার হায়দার আলী এগিয়ে থাকলেও সাধারণ মানুষের মনে সাবেক হুইপ পিতৃহারা ফাহিম চৌধুরীর অবস্থান অনেক বেশী।
মনোনয়ন দ্বন্দ্ব নিয়ে দীর্ঘদিন থেকেই ব্যারিস্টার হায়দার আলী ও ফাহিম চৌধুরী গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ ও মামলার ঘটনাও ঘটে আসছে।
এছাড়া বিএনপি’র দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশি হয়ে দোয়া চেয়ে গোলাম মাসুম নামে স্থানীয় কলেজের এক প্রভাষক পোষ্টার লাগিয়েছেন।
জাতীয় পার্টির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে কেন্দ্রীয় নেত্রী রুবি সিদ্দিকীও গণসংযোগ করছেন বলে এলাকাবাসী সূত্রে জানাগেছে।
শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) : এ আসনে আওয়ামী লীগের দলীয় কোন্দল মিটলোই না। গত নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে সাবেক জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও সাবেক এমপি খন্দকার মো. খুররম বিদ্রোহী প্রার্থী হন। তবে মহাজোট প্রার্থী আওয়ামী লীগের প্রকৌশলী এ কে এম ফজলুল হক চাঁন আপন ভাতিজা জোটের প্রার্থী মাহমুদুল হক রুবেলকে পরাজিত করে এমপি নির্বাচিত হন।
দীর্ঘদিন এলাকা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার পর সম্প্রতি তিনি বিভিন্ন পর্যায়ে খোঁজ-খবর নেওয়ার চেষ্টা করছেন। গত নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী খন্দকার মো. খুররমের প্রতি মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীসহ অনেক সাধারণ মানুষের আস্থা বেড়েছে বলে শোনা যায়।
অন্যদিকে ঝিনাইগাতী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এস এম আব্দুল্লাহেল ওয়ারেজ নাঈম এবার বেশ জোরেসোরেই তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। এ ছাড়া সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতা কৃষিবিদ ফররুখ আহমেদ ফারুকও এলাকায় গণসংযোগে নেমেছেন।
এদিকে প্রয়াত সাবেক এমপি এম এ বারীর ছেলে মহসিনুল বারী রুমী ও জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি আব্দুল্লাহেল কাফী জুবেরী দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশায় মাঠ পর্যায়ে গণসংযোগ করে যাচ্ছেন। এছাড়া নতুন মুখের মধ্যে আওয়ামীলীগের দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব প্রফেসর ডা. মো. ওয়ালিউজ্জামান আশরাফি লতা মাঠে নেমেছেন।
এ আসনে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হক রুবেল একবারের পূর্ণাঙ্গ মেয়াদসহ তিনবার এমপি ছিলেন। বাবা সাবেক এমপি ডা. সেরাজুল হকের গড়া ইমেজ আর নিজের দলীয় অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে এবারও মনোনয়ন নিয়ে বিজয়ের স্বপ্ন দেখছেন তিনি। এছাড়া দীর্ঘদিন থেকেই এলকায় সার্বক্ষনিক যোগাযোগ থাকায় তার প্রচুর জনসমর্থন রয়েছে।
অন্যদিকে তৃণমূল থেকে ওঠে আসা (ইউপি সদস্য, ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা চেয়ারম্যান) ঝিনাইগাতী উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম বাদশা আঞ্চলিকতার টান তুলে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি দল থেকে মনোনয়ন না পেলেও স্বতন্ত্র হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করবেন বলে জানিয়েছেন।
ঝিনাইগাতীর হাসলিগাঁও এলাকার সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর (অব.) হাসান লিফলেট পোষ্টার লাগিয়ে বিএনপির দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী হয়েছেন। এছাড়া একেএম আমিনুল ইসলাম নামে এক চার্টাট একাউন্ট্যান্ট দীর্ঘদিন থেকে মাঠে থেকে দলীয় মনোনয়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন।
এখানে জাতীয় পাটির (এরশাদ) সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে কিছুটা তৎপর রয়েছেন শ্রীবরদী উপজেলা চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম ফর্সা। এ ছাড়া খালেদ হাসান তালুকদার কাজল ও আবু নাসের বাদলের নামও শোনা যাচ্ছে।
রাইজিংবিডি / শামটি
রাইজিংবিডি.কম
আড়াই ঘণ্টা পর নিয়ন্ত্রণে কদমতলীর ফোম কারখানার আগুন