ঢাকা, রবিবার, ২ পৌষ ১৪২৫, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

তিন রক্তদাতার গল্প

জুনাইদ আল হাবিব : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৮-০১ ৬:৪৯:৩৯ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৮-০১ ৭:১২:২৭ পিএম
ইউনুস সোহাগ, সালাহ উদ্দিন রিগ্যান, মো. আনোয়ার হোসেন

জুনাইদ আল হাবিব : মুমূর্ষু রোগী, প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা, আগুন ও অ্যাসিডে পুড়ে দগ্ধ, হৃদরোগ, ব্লাড ক্যানসারে আক্রান্ত, প্রসবকালীন রক্তশূন্যতায় আক্রান্ত মা, অস্ত্রোপচার, কিডনি প্রতিস্থাপন, রক্তে অ্যানিমিয়া, থ্যালাসেমিয়া, রক্ত বমি, ডেঙ্গু জ্বরসহ নানা কারণে রক্তের প্রয়োজন হয়ে থাকে। সময় মতো রক্তের যোগান না হলে রক্তপ্রত্যাশী রোগী মারা যেতে পারে। এমন সংকটময় মুহূর্তে মুহুর্তে রক্তদাতারা ছুটে যান রক্ত নিয়ে। রক্তদান করেন স্বেচ্ছায়, বাঁচে মানুষের জীবন।

রক্তদাতারা মনে করেন, একের রক্তে অন্যের জীবন বাঁচে। তাতে মন্দ কী? কাউকে রক্ত দিতে পারলে একটা মানসিক প্রশান্তি ও আত্মতৃপ্তি অনুভব করা যায়।

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের দাবি, রক্তদানে হৃদরোগ ও হার্ট অ্যার্টাকের ঝুঁকি কমে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে ও নিয়মিত সুস্থ থাকা যায়, জটিল ও দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে মুক্তি, শরীরে রক্ত প্রবাহিত মারাত্মক রোগ যেমন- হেপাটাইটিস-বি, এইডস, সিফিলিয়া, জন্ডিস ইত্যাদির জীবাণু আছে কি-না নিশ্চিত হওয়া যায়।

প্রতিদিন হাসপাতাল, ক্লিনিকে রক্তের জন্য হাহাকার চলে। রক্তদাতারা ওইসব মানুষের পাশে দাঁড়ান। শুধু শহর নয়, গ্রামেও বেড়েছে সচেতনতা। তার একটা উদাহরণ- গ্রাম অধুষ্যিত জনপদ লক্ষ্মীপুর। এই প্রান্তিক অঞ্চলে অনেকেই রক্ত সহায়তায় কাজ করছেন। তাদের মধ্যে থেকে তিন রক্তদাতার গল্প তুলে ধরছি পাঠকদের কাছে।

৪০ বার রক্ত দিয়েছি : সোহাগ
পুরো নাম ইউনুস সোহাগ। বয়স ২৬। গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুর সদরের টুমচরে। ঢাকা কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের মার্স্টাস শেষ বর্ষের  শিক্ষার্থী তিনি। রক্তের গ্রুপ ‘বি পজেটিভ’। এ পর্যন্ত ৪০ বার রক্ত দিয়েছেন। সর্বশেষ রক্ত দিয়েছেন এ বছরের রমজান মাসে একজন মুমূর্ষু সিজারের রোগীকে। রক্তদানের শুরুর গল্প সম্পর্কে জানতে চাইলে রাইজিংবিডিকে তিনি বলেন, ‘২০১০ সালে ভার্সিটি অ্যাডমিশন কোচিং সেন্টারে রেটিনা ব্লাড ব্যাংকের মাধ্যমে প্রথম রক্তদান করেছি। যখন রেটিনা ব্লাড ব্যাংক বুঝিয়ে দিল যে, ৩ মাস পরপর রক্তদান করলে শরীরের রক্তের কণিকা দ্রুত বাড়ে এবং একজন মুমূর্ষু রোগীর উপকার হয়। তখন থেকেই নিয়মিত তিন মাস পর পর মুমূর্ষু রোগী বা অসহায় রোগীকে রক্ত দিয়ে থাকি। সর্বশেষ একজন সিজারের রোগীকে লক্ষ্মীপুর নিউ আধুনিক হাসপাতালে রমজান মাসে ৪০তম রক্ত দিয়েছি। শুরুতে রক্তদানকালে একটু খারাপ লেগেছিল কিন্তু এখন না। তিন মাস পরপর রক্ত না দিলে শরীর ভালো থাকে না লাগে।’

সোহাগ শুধু নিজে রক্ত দেন না, অন্যকেও উৎসাহ দেন রক্তদানে। তাই ‘প্রিয় লক্ষ্মীপুর জেলা’ নামের একটি অনলাইন স্বেচ্ছাসেবী গঠনের মাধ্যমে বিভিন্ন স্থানে ফ্রি ব্লাড গ্রুপিং ক্যাম্পে অংশ নিয়ে থাকেন। তরুণদের যুক্ত করছেন এই সংগঠনে। তারাও রক্তের দরকার হলে এগিয়ে আসে। তার এ কাজের স্বীকৃতি মিলেছে সংগঠন থেকেও। পেয়েছেন সেরা রক্তদাতার সম্মাননা। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘রক্তদান কর্মসূচি ও সামাজিক কাজ করে অসহায় মানুষের উপকার করার চেষ্টা করবো। রক্তদান করলে নিজের শরীরের দূষিত রক্ত বের হয়ে যায়, রক্তের কণিকা বাড়ে। রক্তদান করলে অসহায় মানুষ উপকৃত হয়, দোয়াও পাওয়া যায়।’

৩৩ বার রক্ত দিয়েছি, ১০০ বার দিতে চাই: অ্যাডভোকেট রিগ্যান
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সালাহ উদ্দিন রিগ্যান। জেলার রায়পুরের শিবপুর গ্রামে বাড়ি। বয়স ঠিক ৩২ পার হয়েছে। এরই মধ্যে রক্ত দিয়েছেন ৩৩ বার। রক্তের গ্রুপ ‘এবি পজেটিভ’। শুরুর গল্প সম্পর্কে তিনি বলেন, কোয়ান্টাম স্বেচ্ছায় রক্তদান কার্যক্রম থেকে রক্তদানে অনুপ্রেরণা লাভ করি। প্রথম রক্ত দেই ২০০৭ সালে এপ্রিলের ১৪ তারিখে। মাঝে মাঝে অন্যদের রক্তদানে উৎসাহ দেই। তবে নিজে নিয়মিত রক্ত দিই। ২৫ বার দান করে কোয়ান্টাম থেকে গোল্ড মেম্বার সার্টিফিকেট অর্জন করি, পরে ওই সংগঠন থেকেই সেরা রক্তদাতার পুরস্কার অর্জন করি। কোয়ান্টাম বছরে এক লাখ ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ করে ও প্রদান করে। ওখানে বিশুদ্ধ রক্ত সংঞ্চালন করে সেবাদাতা ও গ্রহীতা উভয়ই বিশুদ্ধ রক্ত আদান-প্রদান করে। আমি চার মাস পর পর গিয়ে রক্ত দিয়ে আসি।’

এ নিয়ে ভবিষ্যত ইচ্ছা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমি সবার কাছে দোয়া চাই, যেন আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই ১০০ বার রক্তদান করতে পারি। এছাড়াও রক্তদান সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বাড়াবো।’

মানবিকতার চিন্তা থেকে রক্ত দেই: আনোয়ার
লক্ষ্মীপুর শহরের মারকাজুল কোরআন ইসলামিক একাডেমির প্রধান শিক্ষক মো. আনোয়ার হোসেন। বয়স ৩৭ বছর। গ্রামের বাড়ি জেলার কমলনগরের চর লরেন্স মেঘনাপাড়ে। রক্তের গ্রুপ ‘এ পজেটিভ’। এখন পর্যন্ত রক্ত দিয়েছেন মোট ২৮ বার। রক্তদান শুরুর গল্প জানতে চাইলে তিনি বলেন, ২০০৪ সালে আমার বড় ভাইয়ের ছেলেকে (ভাতিজা) লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে রক্ত দেই। তা নিজের বিবেক থেকেই অনুপ্রাণিত হয়েছি। দেখলাম, রক্ত দিলেই স্বজনের জীবন বাঁচে। তাহলে আমার রক্তের বিনিময়ে অন্যের জীবন বাঁচালে অসুবিধা কোথায়? এর গুরুত্ব অনুভব করে এলাকার বন্ধুদেরকে রক্ত দিতে সব সময় উৎসাহ দিয়ে থাকি।

ভবিষ্যত পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘ওভাবে কোনো রক্তদাতা সংগঠনের সঙ্গে আমি যুক্ত নই। তবে প্রত্যন্ত অঞ্চলে একটি ব্লাড ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করে মানবতার উপকার করার দিকে প্রচেষ্টা থাকবে।’



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১ আগস্ট ২০১৮/ফিরোজ

Walton Laptop
 
     
Marcel
Walton AC